কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম

  ০৩ ডিসেম্বর, ২০২০

উন্নয়ন মহাসড়কে চট্টগ্রাম

উন্নয়নের মহাসড়কে এখন চট্টগ্রাম। সত্যিকার অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে রূপ নিতে যাচ্ছে। গত ১০ বছরে চট্টগ্রামের জন্য যেসব মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার সেগুলো বাস্তবায়িত হলে পাল্টে যাবে দেশের অর্থনীতির চালচিত্র। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর সরকার নজর দিয়েছে সবচেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম বন্দরকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির গতি বদলাতে চায় সরকার। সে লক্ষ্যে তোড়জোড় চলছে জাপানের সাহায্যে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দরসহ চট্টগ্রামে বিশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল ‘বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর’ প্রতিষ্ঠার।

জানা গেছে, চট্টগ্রামে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বৃহৎ শিল্প জোন করা হচ্ছে। প্রায় ৩০ হাজার একর জায়গার ওপর ‘বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর’ নামে গড়ে উঠতে যাওয়া এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১৬ হাজার একর ভূমি এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকু-ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ফেনীর সোনাগাজীকেও। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এ অর্থনৈতিক জোনে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ছয় হাজার একর জমি বরাদ্দ হয়ে গেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। জাপানের বিখ্যাত নিপ্পন স্টিল, সজিত করপোরেশন, ভারতের এশিয়ান পেইন্টস, যুক্তরাজ্যের বার্জার পেইন্টস, চীনের জিনদুন গ্রুপ তাদের আগ্রহ চূড়ান্ত করেছে। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের শীর্ষপর্যায়ের শিল্প গ্রুপগুলো। দেশের খ্যাতনামা প্রায় সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে শিল্প স্থাপনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নে আন্তরিক বলেই এ চট্টগ্রামকে ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সেবা সংস্থাগুলো যাতে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে এবং তাদের অসমন্বয়ের কারণে চট্টগ্রামের উন্নয়ন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সে ব্যাপারে নজর রাখা হচ্ছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম শীর্ষে থাকবে। সবাই মিলে চট্টগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে বিনিয়োগের জন্য দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এরই মধ্যে প্রায় ৪০ বিলিয়ন (৪,০০০ কোটি) ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। প্রায় ১ হাজার ২০০ একর জায়গার ওপর এখানে একটি ইপিজেড হবে।’

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক অঞ্চল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে চলছে উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ। কর্ণফুলী টানেলের সাহায্যে চট্টগ্রামের মূল শহরের সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের যাতায়াত সহজ করা হবে। মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস করে সহজে অর্থনৈতিক অঞ্চলে পৌঁছানোর সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়তাকিয়া থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সড়কটির নাম হবে ‘শেখ হাসিনা সড়ক।’ এছাড়া শিল্পনগরীর প্রবেশদ্বার বড়তাকিয়া রেলস্টেশনটিও আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশ্বমানের বন্দর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পে ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপান। বাকি অর্থের মধ্যে সরকার দিচ্ছে ২ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা, পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জোগান দেবে ২ হাজার ২১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে জাপানি কনসালটেন্ট ‘নিপ্পন কোয়ে’। ২০২৬ সাল নাগাদ এখানে জাহাজ ভেড়ার আশা আছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর এ অঞ্চলের রিজিওনাল ‘হাব’ এ রূপান্তরিত হবে।

সিঙ্গাপুরের মতো বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সমুদ্রপথে সরাসরি যোগাযোগের পথ উন্মোচন হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় দ্বিগুণ হবে। ভারতের সেভেন সিস্টার বলে খ্যাত রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি, পারস্পরিক সম্পর্ক বহুলাংশে বেড়ে যাবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বন্দর থেকে সাগর পাড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে সিটি আউটার রিং রোড। এ রোড দিয়ে পণ্য সহজে অর্থনৈতিক জোনে নেওয়া যাবে। এটা শহররক্ষা বাঁধ হিসেবেও কাজ করবে। সিটি আউটার রিং রোডের উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। এর ৯০ শতাংশ কাজ শেষ। নির্মাণ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা।

অপরদিকে দেশের ওয়ালস্ট্রিট বলে খ্যাত চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই থেকে সহজে পণ্য বের করার জন্য কর্ণফুলী নদীর তীর বরাবর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত একটি সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। এ সড়ক হলে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ জোয়ারের পানি থেকে রক্ষা পাবে। চট্টগ্রাম শহর থেকে সারা দেশে যোগাযোগ যাতায়াত সহজ হবে। এর জন্য ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে বিমানবন্দরের বর্তমান যাতায়াত বেশ সময়সাপেক্ষ। পথে বন্দর ও ইপিজেড থাকার কারণে যানজটে সময় অপচয় হয়। বিনিয়োগকারীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

চট্টগ্রামে পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুসহ অনেক আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দরের সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে এসব বিনিয়োগ কাজে আসছে না। এ অবস্থায় ৩,২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে। বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রাম যাতে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত থাকে তার জন্য একটি মেগা প্রকল্পের কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ৫,৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন, খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়নের আওতাভুক্ত। এরই মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী বছরের মধ্যে এটি শেষ হলে চট্টগ্রামবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে।

চট্টগ্রামে এখন পানির সমস্যা নেই। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ করতে চট্টগ্রাম ওয়াসা বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২ জন্য ব্যয় হচ্ছে ৪৪৯১ কোটি টাকা। ভান্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। ১৯৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পে রয়েছে পাইপলাইন, জলাধার নির্মাণসহ অনেক কাজ। চট্টগ্রামে কোনো পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নেই। এর জন্যও প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ৩,৮০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ কোটি লিটার পরিশোধন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সুয়েরেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের অনন্যা আবাসিক এলাকার ৪১৮ একর জমির ওপর ২৮২৫টি আবাসিক প্লট এবং ১১০টি বাণিজ্যিক প্লট নির্মাণ করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২,৮৩২ কোটি টাকা। এখানে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। একই বছরে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও চট্টগ্রামের উন্নয়নে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর চট্টগ্রামের উন্নয়নের ধারা সূচিত হয়। পরে সরকার বদলে সেই ধারা থমকে দাঁড়ায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের বঞ্চনার বিষয়টি উপলব্ধি করে আসছিলেন। তিনি প্রথম মহাজোট সরকার গঠনের আগে লালদীঘির জনসভায় চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিজের হাতে তুলে নেবেন বলে ঘোষণা দেন। ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি তার কথা রেখেছেন।

পিডিএসও/হেলাল

চট্টগ্রাম,উন্নয়ন,মহাসড়ক
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়