ব্রেকিং নিউজ

তপন বাগচীর ‘যাত্রাগান’ প্রসঙ্গ

ড. অনুপম হাসান

প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম বিনোদন উপকরণ যাত্রাগান। উনিশ শতকে ব্যাপক বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের কারণে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জনপদের বিনোদনে লেগেছিল নতুন হাওয়া। এর আগে গ্রামবাংলার প্রান্তিক মানুষের বিনোদনের উপকরণ ছিল হাতেগোনা গুটিকয়েক। এর মধ্যে পালাগান, কবিগান, হাস্তর, পুথিপাঠের আসর, যাত্রাগান বা যাত্রাপালা অন্যতম। গ্রামের মানুষ সারা দিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাতভর এসব বিনোদন উপভোগ করত। এখানে উল্লেখ্য, বাংলা জনপদের মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্য এবং প্রাচীন যুগের চর্যাপদও আসরে গীত হতো। অর্থাৎ আমাদের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের বিনোদনের উপকরণ হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। আঠারো শতকে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর বাংলা জনপদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সূচিত হয়। এরপর বাংলা জনপদে বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারের প্রভাব পড়ে। বিজ্ঞানের কল্যাণে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের বিনোদন প্রক্রিয়াতেও আসে পরিবর্তন, নতুনত্ব। এখন জঙ্গলাকীর্ণ কুঁড়েঘরেও বিদ্যুৎ বাতির ঝলকানি। প্রায় ঘরেই দেখা যায়, রেডিও, টেলিভিশন, ক্যাসেট প্লেয়ার, ভিসিডি প্রভৃতি যান্ত্রিক বিনোদন অনুষঙ্গ। ফলে আজ গ্রামের মানুষও আনন্দ পায় না পুরোনো দিনের বিনোদন মাধ্যম-যাত্রা, পালাগান, কবিগান, হাস্তর কিংবা পুথিপাঠের মাধ্যমে। অথচ এসবই ছিল এক দিন গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ।

বলাবাহুল্য, যাত্রাশিল্প একালে লুপ্তপ্রায় শিল্পমাধ্যম নানাভাবে বাঙালির এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা করা হলেও তা প্রকৃত-প্রস্তাবে আকাশ-সংস্কৃতির এই যুগে পাল্লা দিয়ে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এসব প্রয়াসের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ লুপ্তপ্রায় যাত্রাশিল্প নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করা এবং এর প্রায়োগিক দিক খুঁজে বের করা। অতিসম্প্রতি প্রাবন্ধিক-গবেষক তপন বাগচী অপাঙেক্তয় যাত্রাশিল্প নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণা অভিসন্দর্ভের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশের যাত্রা : গণমাধ্যম হিসেবে এর সামাজিক প্রভাব’ (১৮৬০-২০০০ খ্রি.) এই অভিসন্দর্ভ রচনা করে তিনি ইসলামি বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। অভিসন্দর্ভটি পরে তিনি ঈষৎ পরিমার্জন ও পুনর্লিখন করে বাংলা একাডেমিতে প্রকাশের জন্য উপস্থাপন করেন। যথাসময়ে তপন বাগচী-কৃত যাত্রাশিল্পের ওপর অমূল্য একক গবেষণাগ্রন্থখানি একাডেমি কর্তৃপক্ষ পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছে ঝকঝকে দুই মলাটের বন্ধনে। নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায়, লুপ্তপ্রায় যাত্রাগান নিয়ে এ ধরনের গ্রন্থ প্রণয়ন বাঙালি সংস্কৃতির সমৃদ্ধির ভা-ার জনসমক্ষে প্রকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

গবেষণাগ্রন্থটি তপন বাগচী যাত্রাশিল্পের সূচনাকাল থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় দেড় শ বছরের ইতিবৃত্ত এবং এই শিল্প-মাধ্যমের সামাজিক প্রভাব-গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটি মোট ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ের আলোচনায় তপন বাগচী এ গ্রন্থে সন্নিবেশিত গবেষণা সম্পর্কে এবং তার রূপরেখা নিয়ে একটি মৌলিক আলোচনা শুরু করেছেন। গবেষক দ্বিতীয় অধ্যায় থেকে।

অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে লুপ্তপ্রায় যাত্রাশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ইলেকট্রনিকস মাধ্যম ব্যবহার করে নাট্যকার-পরিচালক মামুনুর রশীদ নাট্যাঙ্গিকে যাত্রার রসায়নে যান্ত্রিক মাধ্যমে ‘সবুজ অপেরা’ শীর্ষক যাত্রার অনুকরণে টেলিভিশন নাটক প্রচার করছেন। তার এই মহৎ উদ্যোগ সাফল্য লাভ করবে কি না তা ভবিষ্যতে নির্ধারিত হবে। তার এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে যাত্রাশিল্পের বেঁচে থাকার একটি উপায়।

বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত (বাংলা একাডেমি, ২০০৭, মূল্য : ১৩০, পৃষ্ঠা : ২৪২) শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থটি ছয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত। গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে গবেষক বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। গবেষক গ্রন্থের মূল বিষয়ে প্রবেশ করেছেন দ্বিতীয় অধ্যায়ে; এ অধ্যায়ের নাম ‘বাংলায় যাত্রাগানের উদ্ভব’। এখানে তিনি যাত্রাগানের সূত্রপাতের ইতিহাস আলোচনা করেছেন। বাংলায় যাত্রার উদ্ভব নিয়ে গবেষকের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি এবং যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেন, শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব এবং তার সমকালে শ্রীকৃষ্ণের জন্মানুষ্ঠান উপলক্ষে যে গান-বাজনার আয়োজন করা হতো, তার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল যাত্রার প্রাথমিক উপকরণ। গবেষক মনে করেন, শ্রীচৈতন্যদেবের নিজস্ব চিন্তাচেতনায় এক ধরনের গীতাভিনয়ের সূচনা হয়েছিল। এই যুক্তির দ্বারা প্রতীয়মান হয়, যাত্রাগানের সূচনা ইউরোপীয় প্রভাবজাত নয়; বরং সম্পূর্ণ এ দেশীয়। কেননা এ দেশে থিয়েটার এবং নাটকের আবির্ভাব ঘটেছিল মূলত ইংরেজ আমলে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপীয় সাহিত্যের সরাসরি প্রভাবে। গবেষক উল্লেখ করেছেন, ‘১৮৬০ সালে ঢাকায় কৃষ্ণকমল গোস্বামী (১৮১১-১৮১৮ কৃষ্ণবিষয় ঢপ কীর্তন পরিবেশনের পাশাপাশি পৌরাণিক পালা রচনা ও মঞ্চায়নের মাধ্যমে যাত্রার যে গতিসঞ্চার করে, চারণকবি বরিশালের মুকুন্দ দাসের (১৮৮৭-১৯৩৪) হাতে তা হয়ে ওঠে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জাগরণী মন্ত্র।’ (তপন বাগচী, বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত, ঢাকা : বাংলা একাডেমি, ২০০৭, পৃষ্ঠা : ১)

তবে এ প্রসঙ্গে একটি কথা মনে রাখা দরকার, গবেষক এই প্রাথমিক উপকরণ থেকেই যাত্রার বিকাশ ঘটেছে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি। এ কথা তিনি তৃতীয় অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে যাত্রার ক্রমবিকাশ (১৮৬০-২০০০)’ যাত্রার বিকাশকাল হিসেবে আঠারো শতক উল্লেখ করেছেন। এই ঐতিহাসিক তথ্য গবেষক নিরপেক্ষ-নির্মোহ-নির্বেদ যুক্তির আলোকে উপস্থাপন করেছেন।

‘বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত’ অভিসন্দর্ভ একটি সামাজিক গবেষণা; যদিও তপন বাগচী যাত্রার সাহিত্য-তাত্ত্বিক দিকের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, তথাপি এটি নিরেট সামাজিক গবেষণা হিসেবেই বিবেচ্য। সামাজিক গবেষণার ক্ষেত্রে ক্ষেত্র-সমীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। গবেষক এ গ্রন্থের চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায়ে সে বিষয়ের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। এ অধ্যায় দুটো যথাক্রমে ‘বাংলাদেশের যাত্রাপালা ও পালাকার’ এবং ‘বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পের বর্তমান অবস্থা’। গ্রন্থের ষষ্ঠ অধ্যায়ে গবেষক নিষ্ঠার সঙ্গে একজন সামাজিক গবেষকের দায়বদ্ধতা থেকেই ‘যাত্রাগান’-এর প্রায়োগিক দিকের মূল্যায়ন করেছেন ষষ্ঠ অধ্যায়ে; ‘জনমাধ্যম হিসেবে যাত্রার সামাজিক প্রভাব’ যেকোনো অংশেই অন্যান্য বিনোদনমূলক জনমাধ্যমের চেয়ে কম নয়, তা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

তপন বাগচী বাংলাদেশের যাত্রাশিল্পের আদ্যোপান্ত বিষয়াদি তুলে ধরার মাধ্যমে লুপ্তপ্রায় বাঙালি সংস্কৃতির অনেক তথ্যই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। এ ধরনের মৌলিক গবেষণা গ্রন্থ রচনার জন্য যাত্রাশিল্পীদের কাছ থেকে তো বটেই, তপন বাগচী পণ্ডিত গবেষক মহলেও নন্দিত হবেন। কারণ, গবেষণা সব সময়ই মৌলিক ও নতুন জ্ঞানের বাহক। তপন বাগচী গবেষণার বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন, ফলে বাঙালি সংস্কৃতির লুপ্তপ্রায় একটি বিনোদনশিল্পকে নতুনভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে দেশ-জাতির ঐতিহ্যের ঝা-াবাহী কা-ারির ভূমিকা পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। গবেষক বাগচীর কাছ থেকে এ ধরনের মৌলিক গবেষণার আগ্রহ পাঠকের নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে।

 

 

"