মুন্সীগঞ্জ

ইটভাটায় বেড়েছে শিশুশ্রম

দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ টাকার বিনিময়ে এসব ইটভাটায় ১০-১২ বছরের শিশুরা কাজ করছে

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

হোসনে হাসানুল কবির, মুন্সীগঞ্জ

আইনে শিশুশ্রম নিষেধ থাকলেও মুন্সীগঞ্জের ইটভাটাগুলোতে এর বালাই নেই। ইট শুকানো, ভাটা এবং পৌঁছানোসহ সব ধরনের কাছ করছে ৮ থেকে ১২ বছরের শিশুরা। জেলার সিরাজদিখান উপজেলার বালুরচার এলাকার একাধিক ইটভাটায় ফারুক, কবির, মিথিলা, শান্তিসহ অর্ধশতাধিক শিশুশ্রমিক দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চলে এসেছে বাবা-মায়ের সঙ্গে। প্রতি বছর এই সময়ে তারা ইটভাটাগুলোর কাছের ঝুপড়ি ঘরে আশ্রয় নেয়। তিন থেকে চার মাস তারা এখানে থাকবে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজও করবে। প্রতিদিন ভাটার শুকানো ইট ঠেলাগাড়িতে তুলে চুল্লির কাছে পৌঁছে দিয়ে সারা দিনে একজন শিশুশ্রমিক আয় করে মাত্র ১০০ টাকা। 

ফারুখ নামের আট বছরের শিশুটি জানায়, সারা দিন বোঝা টানলে ২০০ টাকা পায়। বরগুনা থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে এসেছে সে। শুধু সিরাজদিখানের ইটভাটাগুলোতে পেটের দায়ে প্রায় দুই শতাধিক শিশু শ্রমিক এরই মধ্যে চলে এসছে। অনেকে কাজে যোগ দিয়েছে আবার অনেক শিশু অপেক্ষায় আছে কবে ভাটা চালু হবে। যে বয়সে তাদের হাতে কলম থাকার কথা তখন তাদের হাতে শক্ত ইট। পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যমতে জেলায় ছোট-বড় সব মিলিয়ে রয়েছে ৫৭টি ইটভাটা রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে এসব ইটভাটার প্রতিটিতেই রয়েছে ১০ থেকে ১৫ জনের অধিক শিশুশ্রমিক।

সরেজমিন জেলার ২০টির বেশি ইটভাটায় ঘুরে দেখা যায়, প্রাপ্ত বয়স্ক শ্রমিকদের সঙ্গে ইটভাটার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে ৮ থেকে শুরু করে ১২ বছরের শিশুরা। ইট বিছানো, সাজানো, ঠেলাগাড়িতে অথবা মাথায় করে চুল্লিতে পৌঁছানো, পোড়া ইট মাথায় বহন করে এক স্থানে মজুদ করার কাজ করছে শিশুরা। অথচ এসব কাজ শিশুদের দিয়ে করানো নিষিদ্ধ। ছেলে শিশুশ্রমিকের পাশাপাশি মেয়ে শিশুশ্রমিকও কাজ করছে। এমনি এক মেয়ে শিশুশ্রমিক শান্তিকে (৮) দেখা গেল পাঁচটি কাঁচা ইট মাথায় করে এক স্থান হতে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। কথা বলে জানা যায়, তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ। পেটের দায়ে মায়ের সঙ্গে তাকেও ইটভাটায় কাজ করতে হচ্ছে। ধুলা-বালু-ময়লায় সারা দিন কষ্ট হলেও কাজ করতে হয় তাকে।

আরেক শিশুশ্রমিক ফারুক (১১) জানায়, তার মা কুলসুম ভাটার চুল্লিতে কাজ করে, গ্রামের বাড়ি বরগুনায়। সে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল তবে করোনার কারণে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ। বাড়িতে একা ভালো লাগবে না তাই সে চলে আসছে। শান্তি, ফারুক, মিথিলার বাবা মায়েরা ইটভাটার মালিক থেকে দাদন নিয়েছে সেই টাকা পরিশোধ তারা বাবা-মাকে সাহায্য করছে। এ বিষয়ে একাধিক ভাটার মালিক দাদনের বিষয়টি অস্বীকার করে জানায়, দরিদ্র শিশুদের বাবা-মায়ের অনুরোধেই কাজে রাখা হচ্ছে, কাউকে জোর করার অভিযোগ পাবেন না। শিশুরা তাদের বাবা-মাকে সাহায্য করে এটা তাদের বিষয়। শিশুদের দিয়ে কোনো কাজ মালিকপক্ষ করায় না।

ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান বলেন, শিশুরা তাদের বাবা-মাকে দেখে কাজ শিখে। তারা নিম্নআয়ের মানুষ। তারা জানে বড় হয়ে তাদের এই কাজই করতে হবে। শিশুশ্রম আইনে নিষিদ্ধ। কখনো শিশুশ্রমকে সমর্থন করি না। আমার জানা মতে কোনো ভাটায় শিশুশ্রমিক নেই। যারা আছে তারা বাবা-মায়ের সঙ্গে এসেছে। এখনো ভাটাগুলো পুরোপুরি চালু হয়নি। শিশুশ্রমের বিষয়টি খতিয়ে দেখব। 

মুন্সীগঞ্জ কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের উপ-মহাপরিদর্শক মোসা. জুলিয়া জেসমিন জানান, শিশুশ্রম বন্ধ করার জন্য কার্যক্রম চলমান আছে। দুজন পরিদর্শককে ইটভাটা পরিদর্শনের জন্য নিয়োজিত করা হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিবেদন দিবে। ইটভাটাগুলো থেকে দ্রুত শিশুশ্রম বিলুপ্ত করা হবে।

 

"