মিজান রহমান, পঞ্চগড় থেকে ফিরে

  ১৭ জুলাই, ২০২৩

পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা পঞ্চগড়

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এ দুটি স্থান সবার কাছে ব্যাপক পরিচিত। এ দুই সীমান্ত নিয়ে ভ্রমণ পিপাসুদের রয়েছে বেশ আগ্রহ। এই দুটি এলাকা ভ্রমণ করলেই অর্ধেক বাংলাদেশ ভ্রমণ হয়ে যায় এমন বিশ্বাস তাদের। তাই প্রতিবছর টেকনাফের জিরোপয়েন্ট আর তেঁতুলিয়া জিরোপয়েন্ট দেখতে আসেন হাজার হাজার পর্যটক। এরই ধারাবিকতায় পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল এখন দেশের উত্তরের হিমালয়কন্যা খ্যাত পঞ্চগড়। এ জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি তেঁতুলিয়া। চা, পাথর আর কাঞ্চনজঙ্ঘার কারণে পর্যটকের কাছে মোহ হয়ে উঠেছে এ জেলা।

আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে গত ১৫ বছরে বদলে গেছে বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। এক সময় পিছিয়ে থাকা এই জনপদের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। দেশের প্রথম ভূমি ও গৃহহীন এই জেলার অজোপাড়াগাঁয়ে বিদ্যুতের আশীর্বাদে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগায় ক্যাশলেস সুবিধা পাচ্ছেন নাগরিকরা। সরকারের পরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও অবকাঠামো খাতে অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাবান্ধা এখন আমদানি-রপ্তানি ‘হাবে’ পরিণত হয়েছে। থমকে থাকা ছিটমহলেও গতির সঞ্চার হয়েছে। স্থানীয়রা বলেছেন, পর্যটনের শিল্পের ব্যাপক উন্নয়ণ হয়েছে এই জেলায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীন ও মধ্য যুগে এ অঞ্চলের পাশেই ছিল মগধ, মিথিলা, গৌর, ভূটান, নেপাল ও ভারতের আসাম রাজ্যের সীমান্ত। এ জেলার ভূ-খন্ডটি পর্যায়ক্রমে প্রার্গ- জ্যোতিষ, কামরুপ, কামতা, কুচবিহার, গৌর রাজাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। খ্রিস্টাব্দ ২য়-৩য় শতকের মধ্যে রাজা শালিবাহন, রাজা পৃথু এবং রাজা জল্লেশ এই পঞ্চগড়ের শালবাহান ও ভিতরগর এলাকায় তাদের সামাজ্য অঞ্চল গড়ে তুলেছিলেন।

জেলার তিনদিকে ১৮৩ মাইল বেষ্টিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চল রয়েছে। উত্তরে ভারতের দার্জিলিং জলপাইগুড়ি জেলা, উত্তর পূর্ব ও পূর্বে জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পূর্ণিয়া উত্তর দিনাজপুর জেলা অবস্থিত। করোতোয়া, মহানন্দা, ডাহুক, বেরং, তালমা, ভাঙ্গা এবং চাওয়াই নদীসহ ৩২টি ছোট বড় নদী বিধৌত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি পঞ্চগড়ে রয়েছে সমতলের চা বাগান।

দক্ষিণে সৌন্দর্যের লীলাভূমিকে সমৃদ্ধ করেছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, সুন্দরবনের দর্শনীয় স্থানগুলো। তেমনি উত্তরের তেঁতুলিয়ার নিবিড় শান্ত প্রকৃতির বুকে অবস্থান নিয়েই অতি কাছ থেকে দর্শন মিলে আকাশচুম্বী হিমালয় পর্বত, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর ভারতের বাণিজ্যনগরী দার্জিলিং।

এ উপজেলাতেই রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার দেশের অন্যতম বৃহত্তর স্থলবন্দর। বন্দরে ইমিগ্রেশন সুবিধা থাকায় অল্প সময়ে ভ্রমণ করা যায় ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের মতো দেশগুলো। ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি চার দেশের নানাশ্রেণির পর্যটকদের আসা-যাওয়ার সুযোগ থাকায় পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এছাড়া এখানকার হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভৌগলিক অবস্থানের চমকপ্রদ ইতিহাস, পাথর ও চা শিল্প এবং জেলার প্রত্নতত্ননগরী, মহারাজা দিঘী, রক্স মিউজিয়াম, বার আউলিয়া মাজার, শাহী মসজিদ, গোলকধাম মন্দির ও নদ-নদীসহ নানান দর্শনীয় স্থান সমৃদ্ধ করেছে এ পর্যটন অঞ্চলকে।

প্রায় ৩০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গাছপালা কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এ স্থান। রয়েছে ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য। শরৎ হেমন্ত ও শীতকালে এখান থেকেই দেখা মেলে হিমালয় পর্বত চূড়া, কাঞ্চনজঙ্ঘা ও দার্জিলিংয়ের অপরূপ সৌন্দর্য। টিলার ওপর দাঁড়িয়ে দেখা যাবে ২০ কিলোমিটার জুড়ে মহানন্দা নদীতে দলবাঁধা হাজার হাজার পাথর শ্রমিকের নদীতে পাথর তোলার কর্মব্যস্ততা। বিশ্বখ্যাত অর্গানিক চা এখন পঞ্চগড়ে। এলাকা জুড়ে তিনশ’র বেশি বড় এবং ক্ষুদ্র চা বাগান। পাথর ও চা শিল্পে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটালেও অবকাঠামোর অভাবে বিকশিত হচ্ছে না পর্যটন শিল্প।

অন্যদিকে মানচিত্রের সবার ওপরে তেঁতুলিয়ার বাংলাবান্ধা। দেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর এখানে। প্রায় ১০ একর জমিতে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। এ বন্দরে এখন বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের একমাত্র সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জিরোপয়েন্ট দেখতে ভিড় করেন পর্যটকরা। কারণ এ স্থলবন্দরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অপার পর্যটন শিল্প। এ স্থান হতে নেপালের দূরত্ব মাত্র ৬১ কিলোমিটার, এভারেস্ট শৃঙ্গ ৭৫ কিলোমিটার, ভুটান ৬৪ কিলোমিটার, চীন ২০০ কিলোমিটার, ভারতের দার্জিলিং ৫৪ কিলোমিটার ও শিলিগুড়ি ৮ কিলোমিটার।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন চালুর পর দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এ রুটে ভারতের দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়িসহ নেপাল, ভুটান ও চীনে ভ্রমণে যান। সম্প্রতি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে তেঁতুলিয়া উপজেলায় জাতীয় মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন ম্যুরাল ভাস্কর্য।

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার দুর্লভ দৃশ্য। অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসে শীতের সকালে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোতে দাঁড়িয়ে উত্তরের মেঘমুক্ত আকাশে তাকালেই দেখা যায় সোনা রোদে ঝলমলে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এই মায়াবী দৃশ্য দেখতে প্রতিবছরই হাজারো পর্যটক তেঁতুলিয়ায় আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মহসিন আলী বলেন, ‘কয়েক বছর আগে এই এলাকা এত উন্নত ছিল না। আমাদের অনেক দুঃখ ছিল সেই সময়। আমাদের কাছেই ভারত অথচ এদিক দিয়ে আমরা যেতে পারব না। এখন আমরা যেতে পারছি, এটা হওয়ায় আমাদের জন্য ভালো হয়েছে।’

পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘পঞ্চগড় এখন পর্যটনে অপার সম্ভাবনা। পর্যটনকে আরো আধুনিক এবং অন্য দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’ (চলবে)

পিডিএসও/এমএ

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
পর্যটন শিল্প,পঞ্চগড়
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়