ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৪ বছর

প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২০, ১০:২১

রায়হান আহমেদ তপাদার

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে থেকেই নানা কারণে বিতর্কিত ছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরও বিতর্ক তার পিছু ছাড়েনি। বরং নিত্যনতুন বিতর্কে জড়িয়েছেন তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং বৈশ্বিক গতিপ্রকৃতির সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক পদের জন্য লড়াইতে নেমেছেন জো বাইডেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প। একজন দীর্ঘদিনের সিনেটর আর আট বছরের ভাইস প্রেসিডেন্ট। অন্যজন রীতিমতো ব্যবসায়ী থেকে প্রেসিডেন্টের আসনে। দুজনের রাজনৈতিক দর্শনে তাই বিস্তর ফারাক। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কেমন হবেন, তা কিছুটা আঁচ করা যায়, বারাক ওবামার সঙ্গে তার সম্পর্ক আর ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার মার্কিন নীতি দেখে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প সেদিক থেকে রীতিমতো দুর্বোধ্য। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই রীতিমতো চমকের পর চমক দিয়ে গিয়েছেন ট্রাম্প।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কেবল সেদেশের নেতা নন, তিনি সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তিনি যেসব কাজ করেন তার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর অনেক কিছুই বদলে যায়। কমবেশি সবার জীবনে প্রভাব পড়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও তার ব্যতিক্রম নন। প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প তার সময়ে ঠিক কীভাবে বিশ্ব প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছেন? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার দাবি করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দেশ।

কিন্তু সম্প্রতি পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১৩ দেশের ভোটের জরিপে বলা হচ্ছে, ট্রাম্প বিদেশে ভাবমূর্তি রক্ষার মতো তেমন কিছু করতে পারেননি। অনেক ইউরোপীয় দেশে ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গত ২০ বছরে মধ্যে সর্বনিম্ন চলে গেছে। জরিপে দেখা যায়, এসব দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্যের মনোভাব সর্বোচ্চ ছিল ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে ফ্রান্সে ছিল ৩১ শতাংশ, যা ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন এবং জার্মানিতে মাত্র ২৬ শতাংশ। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আমেরিকার ভূমিকা সম্পর্কে উত্তরদাতাদের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ মনে করেন, জুলাই ও আগস্টে ভাইরাস মোকাবিলায় কিছুটা ভালো পদক্ষেপ নিতে পেরেছে। এরপর পরিস্থিতি অনুকূলে ছিল না। যার ফলে ভাইরাসের শীর্ষস্থান দখল করে যুক্তরাষ্ট্র। এর জন্য প্রধানত দায়ী মনে করা হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে সম্ভবত ট্রাম্পই প্রথম সংবাদমাধ্যমের প্রতি প্রতিনিয়ত বিষোদগার করে গেছেন। এমনকি ট্রাম্প প্রায়ই ফেক নিউজ টার্ম ব্যবহারের মাধ্যমে সংবাদমাধ্যমের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়েছেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ট্রাম্প অন্তত ২ হাজার বার ‘ফেক নিউজ’ টার্মটা ব্যবহার করেছেন বলে এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জরিপে উঠে এসেছে। সংবাদমাধ্যমে তার এ ধরনের বিষোদগার বিশ্ব গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, সৌদি আরব, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমে ‘ফেক নিউজ’ আসছে বলে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ-অনুযোগ আসে ও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। এমনকি সিভিল সোসাইটিগুলো বলছে যে, বিশ্বাস যোগ্য প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে রাজনীতিবিদদের এই টার্মটির ব্যবহার গণতন্ত্রের পরিবেশ ক্ষুণ্ণ করে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনরোধে পদক্ষেপ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশ্বাস কী, তা অনুধাবন করা কঠিন। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে পদক্ষেপকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বের ২০০ দেশের স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তিকে তিনি ‘ব্যয়বহুল ফাঁকিবাজি’ বলে অভিহিত করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেই চুক্তিতে অসমর্থনের কথা ঘোষণা দেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ছয় মাসের মাথায় তিনি প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহার করে নেন। যা সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের হতাশ করে। প্যারিস চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পক্ষে ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, এটি মার্কিন স্বার্থবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষাকারী একটি পরিবেশ চুক্তি করতে তিনি আগ্রহী ছিলেন; অপরদিকে সর্বাধিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রথম চীন। আর তারপরই দ্বিতীয় অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, ট্রাম্প যদি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তবে বৈশ্বিক উষ্ণতারোধ অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। তবে জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে এই চুক্তিতে পুনরায় যোগদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বিধিনিষেধ ও সীমান্ত বন্ধ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে সিরিয়া থেকে শরণার্থী আগমন এবং সাতটি মুসলিম দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে নির্বাহী আদেশ জারি করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং এরপরই শুরু হয় নানা বিশৃঙ্খলা। আকাশপথে যুক্তরাষ্ট্রগামী বহু যাত্রীকে বাইরের বিমানবন্দরেই আটকে দেওয়া হয়। মুসলিম প্রধান সাতটি দেশের যাত্রীদের জন্য সীমানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে ১৩টি দেশ কঠোর ভ্রমণ বিধিনিষেধের শিকার যুক্তরাষ্ট্রে। যদিও ট্রাম্প এটাকে ভুল সংবাদ হিসেবে প্রচার করেন। তবে ২০১৯ সালের শেষের দিকে কঠোর অভিবাসননীতি ট্রাম্পকে বিশ্ববাসীর কাছে আরেক ধাপ নেতিবাচক লোকে পরিণত করে। বরাবরই অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর কথা বলেছেন ট্রাম্প। তাদের বিপজ্জনক ও হিংস্র অপরাধীও বলেছেন। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপকে তিনি আমেরিকাকে শক্তিশালী করার পথ হিসেবে ব্যাখা করেছেন। তিনি এই পথে মহান আমেরিকা গঠনের স্লোগান দিয়েছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে তুলতে দেশকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান ট্রাম্প। এই নমুনা তার অনেক সিদ্ধান্তে মিলেছে। ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হ্রাস পায়। ২০১৬ অর্থবছরে ৮৫ হাজার শরণার্থী নিয়েছিল দেশটি; যা পরের বছর ৫৪ হাজারে নিচে নেমে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ হাজার হয়ে যাবে; যা ১৯৮০ সালের পর সবচেয়ে কম। এদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ একাবিংশ শতাব্দীর আলোচিত ঘটনা। তীব্র বাক্যবাণে পরস্পরকে জর্জরিত করা, চরম উত্তেজনা কিংবা পিছু হটে ‘যুদ্ধবিরতি’র নরম সুর এসব কিছুই দেখা গেছে দুই বছরের আমেরিকা-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে।

তবে দুই দেশের নেতারা এই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে চুক্তিকে বলেছেন, মার্কিন অর্থনীতিতে ‘পরিবর্তন ঘটানোর’ চুক্তি। কিন্তু দুদেশের এই সম্পর্ক বেশি দিন টিকেনি। করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়লে তার জন্য চীনকে সরাসরি দায়ী করেন ট্রাম্প। করোনাভাইরাসকে চীনা ভাইরাস বলে প্রচারণা চালান তিনি এবং সরাসরি চীনকে আক্রমণ করেন। কথার বাণে বিদ্ধ করেন। আমেরিকায় চলমান বিভিন্ন চীনা অ্যাপস যেমন টিকটক ও উইচ্যাটের বিরুদ্ধে তথ্য চুরির অভিযোগ এনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং আরোপ করা হয় নানা শর্ত। শুধু এখানেই থেমে নেই। ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের ভাষণেও অভিযোগ আনেন। আর প্রতিপক্ষ জো বাইডেনকে চীনা লিডার বলে কটাক্ষ করেন। আমেরিকার অন্তহীন যুদ্ধনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যে চুক্তি ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন যে, ‘মহান জাতি অন্তহীন যুদ্ধে লিপ্ত থাকে না’। তিনি সিরিয়ার তেল খনি রক্ষার জন্য শুধু ৫০০ সেনা রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়াও আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তালেবেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করেন। যদিও সেনাবাহিনী ছাড়াই তিনি মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারে পথ বেছে নিয়েছেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রাম্প তেলআবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরিত করেন এবং অধিকৃত শহরটিকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

এখানেই থেমে থাকেননি ট্রাম্প, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভোর বলে প্রশংসা করেন। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ইরানকে বড় রকমের মূল্য দিতে হবে বলে হুমকির পরপরই ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের সর্বাধিক শক্তিশালী জেনারেল কাসেম সুলাইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ইরানও পাল্টা হামলা চালায়। ইরাকে অবস্থিত আমেরিকান দুটি সেনা ঘাঁটিতে ২২টি ব্যালিস্টিক মিজাইল নিক্ষেপ করে। এতে ১০০-এর বেশি মার্কিন সেনা আহত হয়। দুদেশের মধ্যে প্রায়ই ভয়াবহ যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করেছে সেসময়। এরপর ট্রাম্প বলেন, কোনো রকম যুদ্ধ চায় না আমেরিকা। কিন্তু ইরাকে সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পর বোঝা যাচ্ছে যে, ইরান তার অবস্থান থেকে সরে আসছে। ইরানের হামলায় কোনো মার্কিনি হতাহত হয়নি। ট্রাম্প বলেন, আমরা বিশ্বের শীর্ষ এক সন্ত্রাসীকে সরিয়ে দিয়েছি। আমরা চাই ইরান সংঘাতের পথ পরিহার করে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নজর দেবে। যদি তারা শান্তির পথ বেছে না নেয়, তাহলে দেশটির ওপর আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের শত্রুতা নতুন নয়। ১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লবের পর থেকে তার শুরু। সেসময় ইরানে মার্কিন সমর্থিত শাহকে সরিয়ে নতুন সরকার আসে ইরানে। এরপর থেকে শত্রুতা শুধু বেড়েছে।

এরমধ্যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ শুরু করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার হুমকি দিয়েছে ইরানকে। অর্থনৈতিক অবরোধও জারি রেখেছে। কিন্তু ইরান নিজেদের পথ থেকে সরে দাঁড়ায়নি। তবে করোনাভাইরাস আঘাত করার পর উভয় দেশের রাজনৈতিক হুমকি-ধমকি হ্রাস পেয়েছে।

এখন উভয় দেশই করোনার হুমকি সামলাতে ব্যস্ত। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জেতার লড়াইয়ে মরিয়া। কিন্তু এই জেতার লড়াইয়ে হেরে গেলেন ট্রাম্প। তার এই সূচনীয় পরাজয়ের জন্য তার চার বছরের ক্ষমতার অপব্যবহার দায়ী বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত। পাশাপাশি এখন দেখার বিষয় জো বাইডেনের ঐতিহাসিক বিজয় আগামীর বিশ্ব প্রেক্ষাপট কোন পথে মোড় নেয়।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল