যুদ্ধ জয়ের গল্প

প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:০৮ | আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:২৬

আহাদ আদনান, মাতুয়াইল (ঢাকা)

মাধ্যমিকের শিক্ষকদের সাথে জিপি প্র্যাকটিস করা ডাক্তারদের একটা মিল আছে। আমাদের নাজমা আপার কথাই ধরুন। বাংলা ক্লাস শেষ করে পরের ক্লাসে হয়তো সামাজিক বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন। তারপরে ইংরেজি। আর শেষে গার্হস্থ অর্থনীতি। মফস্বলের যে বাসাটায় তিনি ভাড়া থাকেন, বাড়িওয়ালার ছেলে ডা. অপু। তার স্কুলেরই ছাত্র ছিল একসময়। বেশ ভালো ছাত্রই ছিল। কয়েকবছর হল এমবিবিএস শেষ করে এখন বিসিএসের জন্য চেষ্টা করছে। আর সন্ধ্যায় করছে জিপি প্র্যাকটিস। মেডিসিন, শিশু, চর্ম সবই দেখে ছেলেটা। গাইনি দেখে কি? কিংবা সার্জারি? নাজমা আপা একটা অস্বস্তি নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন ইদানিং। একটা সমস্যা। শারীরিক সমস্যা। আশপাশে কোন মহিলা ডাক্তার নেই। অপুর সাথে কথা বলবেন? ও কি এসব সমস্যা দেখে? ছেলের বয়সি একটা ডাক্তার, নিজের ছাত্র, তার কাছে এসব সমস্যা বলবেন, কী লজ্জার কথা!

মাঝবয়সে আমাদের দেশের মহিলারা হঠাৎ করে একলা হয়ে পড়েন। শরীরে একটা পরিবর্তনের ঝড় বয়ে যায়। এই প্রচণ্ড বিপদের সময় দেখেন পাশে কোনো বন্ধু নেই। স্বামীকে মনে হয় স্কুলের হেডমাস্টারের মত বদমেজাজি সহকর্মী। তার কাছে সময় নেই, কোন গুরুত্ব নেই। একটু বেড়াতে যাব, সময় নেই। শরীর খারাপ করছে, ডাক্তার দেখাতে হবে, মনোযোগ নেই। নাজমা আপা প্রতিদিন ভাবেন আজ বলব, এই, আমার বুকের বাম দিকটায় একটা গুটির মতো, ব্যথা করে, খারাপ কিছু নয়ত, নিয়ে যাবে শহরে মহিলা ডাক্তারের কাছে, কিন্তু পারেন না। ব্যাংক থেকে তিনি ফেরেন রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে। কথা বলতেই ভয় লাগে।

স্কুলে আর দুই একজনসহ শিক্ষিকার সাথে কথা বলেছেন, আচ্ছা স্তন ক্যান্সার সম্বন্ধে কিছু জানেন। কী এটা? কেমন করে হয়? চিকিৎসা আছে? মরে যায় মানুষ, মহিলা মানুষ? অবাক হয়ে দেখেন, সেই আপারা পাশের দেশের টিভির সব সিরিয়াল মুখস্ত গিলে খেয়েছেন, কোন শাড়ি কত দাম তার বিশেষজ্ঞ হয়েছেন, কার সাথে কার সম্পর্ক সে ব্যাপারে গবেষণা করে ফেলেছেন, কিন্তু এসব ‘অদরকারি’ বিষয় তাদের কাছে নেহাতই ঘোলাটে। বাকি থাকে আর একটাই বন্ধু।

সেই বন্ধুর নাম ‘গুগল’। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। নাজমা আপা এখনো বয়ে বেড়ান সাবেকি আমলের ফিচার ফোন। স্কুলের লিপি আপা অবসরে ট্যাবে ইউটিউব থেকে ভারতীয় বাংলা সিরিয়াল দেখেন। তিনি একবার দেখিয়েছিলেন এটাকে ইউটিউব বলে। আর এটা ফেসবুক। এই যে গুগল। এই মাস্টার মশায়কে যত ইচ্ছা প্রশ্ন কর, বিরক্ত হন না। বছর খানেক আগের কথা। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া ছেলের স্মার্ট ফোন থেকে তিনি গুগলে খুঁজতে গিয়েছিলেন, সাকিব আল হাসান’স ডটার। কি অবাক, সন্ধ্যায় ছেলে জিজ্ঞেস করে, আম্মু তুমি সাকিবের মেয়ের ছবি দেখছিলে। ‘আনস্মার্ট’ মা চমকে উঠেছিলেন। তিনি আর কখনো গুগলে যাননি কখনো।

কয়েকদিন ধরে নাজমা আপা ঘুমুতে পারছেন না। কয়েকদিন ধরে গোসলের সময় আয়নায় খেয়াল করছেন, দুইটা স্তন একই রেখায় নেই, কেমন যেন উঁচু নিচু। ব্যথাও বাড়ছে দিনদিন। ছেলেকে টাকা দিলেন, আমাকে কালকের মধ্যে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিবি। কোন প্রশ্ন নয়। কয়েকটা দিন চলল তার গুগল ভ্রমণ। স্তন ক্যান্সার নিয়ে অনেক পড়ালেখা হয়ে গেল। নিজের চোখকে বিশ্বাস হচ্ছে না। কি লিখেছে এইসব। গুটি হওয়া, ব্যথা, কমলার খোসার মত কুঁচকে যাওয়া চামড়া, স্তন একটা থেকে আরেকটা উঁচু নিচু, কী ভয়ংকর সব ব্যপার। একটা অলীক লজ্জা আঁকড়ে আঁকড়ে কি একটা কর্কটকে বাসা বাঁধতে দিয়েছেন নিজের শরীরে। একটা ডাক্তার দেখানোর সময়ও হয়নি। কি অসহায় একেকটা মহিলা এই সমাজে। তার নিজেরও কি ভুল ছিল না? স্বামীকে একটিবার বলে দেখতে পারতেন। দুইটা তলা উপরে অপুদের বাসা। পুরুষ কিংবা মহিলা, ডাক্তার তো ডাক্তারই, তাই না!

নাজমা আপা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছেন। পাশে স্বামী। চেহারায় মোটেও রাগ নেই আজ। বরং একটা লজ্জা। এই লজ্জা স্ত্রীর রোগের জন্য নয়। এই লজ্জা নিজের অবহেলার, অসচেতনটার, বিলম্বের। এই লজ্জাকে জয় করতেই হবে। অপুদের বাসায় কলিং বেলটা বাজিয়ে দুইজন দাঁড়িয়ে আছেন। 
স্বামীর শক্ত মুঠির ভেতর নিজের নরম হাতটা পরম নির্ভরতায় পেয়ে নাজমা আপা ভাবেন, তিনি এখন একা নন। একটা বিশ্বস্ত বন্ধু পেলে মানুষ পৃথিবী জয় করতে পারে। এই স্তন ক্যান্সার তো তিনি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবেন।   

পিডিএসও/হেলাল