ব্রেকিং নিউজ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

করোনাকালে বেড়েছে পশু-পাখির আনাগোনা

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২০, ১৭:৪৭

তহিদুল ইসলাম, জাবি
ছবি তুলেছেন অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি মানব সভ্যতার জন্য এক মহাবিপর্যয় বয়ে এনেছে। ইতোমধ্যে এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছে চার কোটিরও বেশি মানুষ। আর মৃতের সংখ্যাও ১১ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ভাইরাস ছড়ানোর ১০ মাস পার হলেও মহামারি কমার কোন লক্ষণ নেই। বরং অনেক দেশে সংক্রমণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তবে জীবনযাত্রাকে থমকে দিলেও করোনাভাইরাস প্রাণ-প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। মানুষ যেখানে ঘরমুখী হয়েছে, সেখানে পশুপাখিরা দখলে নিয়েছে লোকালয়। স্যোশাল মিডিয়ায় চোখ রাখলেই শহরের ব্যস্ততম সড়কে হরিণের অবাধ বিচরণ, পর্যটকশুন্য সৈকতে ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিনের খেলাধুলা, জনশুন্য রাস্তায় নীলগাইয়ের লাফালাফির মত দুর্লভ দৃশ্য চোখে পড়ে। 

প্রায় একই চিত্র প্রাণ-প্রকৃতির জন্য বিখ্যাত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের। অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনের মত প্রায় সাতমাস ধরে বন্ধ রয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে সীমিত পরিসরে দাপ্তরিক কাজ চললেও আবাসিক হল বন্ধ থাকায় ক্যাম্পাসে সেভাবে লোকসমাগম নেই। তাছাড়া আগের মত যানবাহনের হর্ণ নেই, নেই কোলাহল আর ভ্রমণপিপাসুদের উৎপাত। এই সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পশু-পাখিদের বিচরণ বেড়েছে। রাস্তাঘাট সহ বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণিদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় দেখা মিলছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, করোনা পূর্বে রাতে শিয়ালের ডাক শোনা গেলেও দেখা পাওয়া বেশ দুষ্কর ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হবার পর দিনের আলোতেও হরহামেশা এই নিশাচর প্রাণিটি দেখা যাচ্ছে। এমনকি করোনা পূর্ব ব্যস্ততম সড়কের ওপরও শিয়ালের দলের ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য নিত্য দেখা যায়। এছাড়া হারিয়ে যেতে বসা বিশালদেহী সব গুঁইসাপও এখন অবাধে লোকালয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। স্থলে যেমন নিশাচর বনবিড়াল, মেছোবাঘ, গন্ধগকুল, বাগডাশের মত প্রাণিদের দেখা মিলছে, বাচ্চা সমেত জল মোরগ, ছোট সরালির দেখা মিলছে লেকগুলোতে।

নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাজ্জাদুল আলম বলেন, “লকডাউনের সময় বিকালে সাইকেল নিয়ে বের হলেই শিয়ালের দেখা মিলত। প্রায়ই দেখতাম রাস্তার ওপর দলবেঁধে বিচরণ করছে। লোকজন সেভাবে না থাকায় ওরা খুব সাহসী হয়ে উঠেছিল। দেখা যেত, ওদের দিকে যাচ্ছি অথচ সেদিকে ওদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এছাড়া বাসার সামনে বিশালদেহী গুঁইসাপ দেখতাম। এতবড় গুঁইসাপ কখনো আমার চোখে পড়েনি।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান জানান, প্রতিবছরই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট সরালি আসে ও বাচ্চা উৎপাদন করে। তবে এ বছর এদের বাসা তৈরি করা ও আনাগোনা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এত বেশি বাচ্চা দেয়ার ঘটনা অতীতে দেখা যায়নি। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত মার্চে বন্ধ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় এক জন-মানবহীন এলাকায় পরিণত হয়। এটিই আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয় বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে চাপে থাকা বুনো পশু-পাখিদের জন্য। ঝোঁপ-ঝাড় ছেড়ে লোকালয়ে আসতে শুরু করে প্রাণিরা। এমনকি যেসব প্রাণিদের গত কয়েক বছরে দেখা যায়নি, সেসব প্রাণিদের বিচরণ করতে দেখা গেছে। অনুকূল পরিবেশ থাকায় প্রাণিদের বংশবৃদ্ধিও লক্ষণীয় হারে বেড়েছে।

অধ্যাপক মো. কামরুল হাসান বলেন, পশু-পাখিদের সংখ্যা যে হুট করে বেড়ে গেছে এটা বলা যাবে না। এরা আগে থেকেই ছিল তবে লোকজন কম থাকায় দৃষ্টিগোচর বেশি হচ্ছে। খোলা জায়গায় এদের বিচরণ বেশি হচ্ছে, এ কারণে চোখে পড়ছে। যেহেতু কোলাহল কম, লোকজনের চলাচল কমে গেছে, ফলে এদের আবাসস্থলের পরমিাণ বেড়ে গেছে। এরফলে এরা খুব স্বচ্ছন্দে চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জীববৈচিত্রের দিক দিয়ে এটা জাহাঙ্গীরনগরের জন্য আশাব্যঞ্জক।

তবে ক্যাম্পাস খোলার পর যেন আবার পশু-পাখিদের আবাস্থল হুমকির মুখে না পড়ে সেদিকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বন্যপ্রাণি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কামরুল হাসান। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে যখন লোকজন বাড়বে, প্রাণচাঞ্চল্য বাড়বে তখন আমরা যেন ক্যাম্পাসের ঝোঁপঝাড়গুলো নষ্ট না করি, অকারণে পরিষ্কার না করি। এসব জায়গাগুলোতে নিশাচর প্রাণিরা দিনের বেলা আশ্রয় নিয়ে থাকে, পাখিরা প্রজননের কাজে ব্যবহার করে। ফলে যতটুকু জায়গা আমরা বুনো হিসেবে রেখে দিয়েছি, সেসব জায়গা যেন প্রাণিদের বসবাসের অনুকূলে থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সবাই যদি বন্য প্রাণিদের প্রতি সদয় হয় তাহলে এখন যেসব প্রাণি দেখা যাচ্ছে, আগেও যারা ছিল, করোনার পরেও তারা টিকে থাকবে।

পিডিএসও/এসএম শামীম