লে. কর্নেল নাজমুল হুদা খান

  ১৪ নভেম্বর, ২০২১

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা  

সারা বিশ্বে ২০১৯ সালের শেষ দিক থেকে অদ্যাবধি কোভিড-১৯ যুদ্ধে এ পর্যন্ত আক্রান্ত ২৫ কোটির ওপর, মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ৫১ লাখ। স্বাস্থ্যবিধি, ভ্যাকসিন এবং অন্যান্য প্রতিরোধ ব্যবস্থায় করোনাকে রুখে দিতে সচেষ্ট বিশ্বের সব দেশ। কোভিড-১৯-এর এ পরিস্থিতিতে আজ পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস-২০২১। ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী ওষুধ ইনসুলিন আবিষ্কারের জনক মি. ফ্রেডারিক ব্যান্টিংয়ের জন্মদিন স্মরণে প্রতি বছর এ দিবসটি পালিত হয়। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (IDF) ডাকে ২০২১-২৩ সালের ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে, ‘ডায়াবেটিস সেবা নিতে আর দেরি নয়’ বা ইংরেজিতে Access to Diabetes Care : If not how, When? ডায়াবেটিস চিকিৎসার আধুনিক অস্ত্র ইনসুলিন আবিষ্কারের প্রায় ১০০ বছর হতে চললেও এখনো বিশ্বের ৫০ ভাগ মানুষ জানে না, তারা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত কি না। বেশির ভাগ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত দেশের মানুষ এখনো ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনায় অসচেতন; তাদের হাতের নাগালে পৌঁছায়নি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৮০ সালে পৃথিবীব্যাপী ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ১১ কোটি হলেও, মাত্র তিন দশকের ব্যবধান অর্থাৎ ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় চার গুণ অর্থাৎ প্রায় ৪৩ কোটিতে; বর্তমানে সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ কোটিরও বেশি। ২০১৯ সালেই এ নীরব ঘাতক মৃত্যু ঘটিয়েছে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের। ডায়াবেটিস যুদ্ধে আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৯৬৬ বিলিয়ন ডলার। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৬৫ কোটি, ২০৪৫ সালে যার সংখ্যা ৮০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। মৃত্যুর হার হিসাবে প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে প্রাণ হারাচ্ছে একজন, বছরে প্রায় ৬৭ লাখ আক্রান্ত ব্যক্তি। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৩৩ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৯ কোটির মধ্যে প্রি-ডায়াবেটিসের লক্ষণ রয়েছে। আনুপাতিক হারে এর সংখ্যা প্রায় ৩ : ১; অথচ এখানকার ৮০ শতাংশ মানুষই জানে না যে এক নীরব ঘাতক বাসা বাঁধতে যাচ্ছে তাদের দেহে। বাংলাদেশে ২০১৯ সালের জরিপে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ছিল ৮৫ লাখ; সে হিসাবে ২০৪৮ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াবে দেড় কোটি। এরই মধ্যে অর্ধেক ডায়াবেটিস রোগী চিকিৎসা সুবিধা পায় না। ফলে ডায়াবেটিস জটিলতায় ভুগছে প্রায় ৬০ শতাংশ রোগী এবং এ রোগের চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে আয়ের ১০ ভাগ।

মানবদেহে অগ্ন্যাশয় থেকে নিসৃত ইনসুলিন হরমোন শরীরের সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কোনো কারণে ইনসুলিন উৎপাদন কমে গেলে বা ত্রুটিপূর্ণ ইনসুলিন তৈরি হলে কিংবা শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনে সাড়া না দিলেই বিপত্তি; রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়, খালি পেটে এ মাত্রা যদি ৭ মিলিমোল/লি. বা তার বেশি থাকে, ধরে নিতে হবে শরীর ডায়াবেটিসের দিকে ঝুঁকছে। রোগীর ঘন ঘন পিপাসা, অতিরিক্ত ক্ষুদা মন্দা, ঘন ঘন প্রস্রাব এবং শরীরের ওজন কমে যেতে পারে। চোখে ঝাপসা দেখা, কাটা-ছেঁড়া সহজে না শুকানো বা অবস বোধ করাও এ রোগের অন্যতম লক্ষণ। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ জন্মসূত্রে প্রাপ্ত হতে পারে। বাকি ৯০ ভাগই অসচেতন জীবনযাত্রার প্রভাবেই হয়ে থাকে। শুধু স্থূলতা, শরীর চর্চার অভাব, খাবার-দাবারে নিয়ন্ত্রণহীনতা, মানসিক দুশ্চিন্তা বা চাপই এ রোগের প্রধান কারণ। জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই এ রোগের ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যথা-হৃৎপিণ্ড, চোখ, কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র এবং রক্তনালিগুলোর প্রভূত ক্ষতি সাধন করে থাকে। ডায়াবেটিসের কারণে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এবং স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করে। রক্ত চলাচল এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শরীরের নিম্নাঙ্গে পচন রোগের সৃষ্টি আক্রান্ত হয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পা কেটে পঙ্গুত্ব বরণ করতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন চোখের রক্তনালিতে ক্ষত সৃষ্টি হয়ে রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রোগীকে অন্ধত্ব বরণ করে থাকে। কিডনির কর্মহীনতার অন্যতম কারণও ডায়াবেটিস।

ঐতিহাসিকভাবে ডায়াবেটিস পৃথিবীর অন্যতম পুরাতন ব্যাধি। খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০ সালে মিসরে এ রোগের বর্ণনা পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালে ভারতীয় উপমহাদেশের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে, ২০০ খ্রিস্টাব্দে গ্রিক সভ্যতায় ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র শব্দগুলো ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ৬০০ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘মধুমেহ’ নামে যে ব্যাধির বর্ণনা পাওয়া যায়, তা ডায়াবেটিসেরই নামান্তর। ১০০০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বখ্যাত চিকিৎসক আবিসিনিয়া ডায়াবেটিস রোগ ও ব্যবস্থাপনার ওপর বিশদ গবেষণা ও নির্দেশনা প্রণয়নে সাফল্য দেখান। ১৫০০ সালে সুইস চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা, ১৬০০ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসা শাস্ত্রে, ১৮০০ সালে ফ্রান্সে এ রোগের প্রকৃতি ও ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়। ১৮ শতকের শেষ দিকে, ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি বিজ্ঞানী অগ্ন্যাশয়ের যে অংশ ইনসুলিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে তা আবিষ্কার করেন এবং তার নামানুসারে অগ্ন্যাশয়ের সে অংশের নামকরণ করা হয় আইলেটস এব ল্যাংগারহেনস। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। দ্রুতই ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসার আধুনিক সব ওষুধ, ইনজেকশন ও রোগ নির্ণয়ের সহজলভ্য যন্ত্রের আবিষ্কার ও চালু হয়।

ডায়াবেটিস চিকিৎসার সবচেয়ে আধুনিক ইনসুলিনও আবিষ্কার হয় আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মি. ফ্রেডারিক ব্যান্টিং তিন বছরের একনিষ্ঠ অধ্যাবসায় শেষে ১৯২৩ সালের অক্টোবর মাসে ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসায় বিস্ময়কর সাফল্য ইনসুলিন আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

এত কিছুর পরও বিশ্বের ৫০ কোটি মানুষ ডায়াবেটিস রোগী, প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে একজন মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছে। ডায়াবেটিস রোগীর পেছনে ব্যয় হচ্ছে বছরে ৯৬৬ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাণ্ডই নয় কোভিড মহামারিতে ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯-এ মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ৪০ ভাগই ডায়াবেটিস রোগী। আমেরিকার হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ চিত্র আরো ভয়াবহ। তাদের মধ্যে কোভিডে আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীদের ৫০ ভাগই মৃত্যুবরণ করে। আফ্রিকায় ২০ শতাংশ, ইউরোপে ২০-৩০ শতাংশ, চীনে ৪০ শতাংশ মৃত্যুবরণকারী করোনার রোগীই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিল। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত করোনা রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার প্রায় চার গুণ বেশি। বাংলাদেশে করোনায় ৭৫ ভাগ মৃত্যুর জন্য ডায়াবেটিস অনুঘটক হিসেবে কাজ করে বলে প্রমাণ মেলে।

এ ছাড়া করোনা আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীদের উপসর্গে তীব্রতা, হাসপাতালমুখিতা, আইসিইউ ব্যবহার, সংক্রমণ বৃদ্ধি, আক্রমণে তীব্রতা এবং সর্বোপরি মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর করতে করোনা অতিমারির সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখেছে ডায়াবেটিস। এই ঘাতক রোগ করোনা রোগীর শর্করা পরিপাক, প্রদাহ, প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস ও ইলেকট্রোলাইটসগুলোর ভারসাম্য বিনষ্ট করে শরীরের বিভিন্ন তন্ত্রকে অকার্যকর করে তোলে। এ ছাড়া ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের অতিরিক্ত সুগার করোনা সংক্রমণের গতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। করোনা আক্রান্ত ডায়াবেটিস রোগীর দেহে সাইটোকাইন ঝড় সৃষ্টি এবং শরীরের প্রতিরোধী কোষগুলোর কার্যক্ষমতা হ্রাস করে রোগীর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে।

তাই ডায়াবেটিস অতিমারি রুখতে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে। জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে, স্থূলতা কমাতে হবে, শরীর চর্চা বৃদ্ধিসহ মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকার সব প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ, নিয়মিত রক্তের সুগার পরিমাপ ও মনিটরিং, খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ, নিয়মানুবর্তিতা এবং মানসিক চিন্তামুক্ত থাকার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে হবে। ডায়াবেটিস ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তবেই বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের প্রতিপাদ্য সফলতায় পর্যবসিত হবে।

লেখক : সহকারী পরিচালক,

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুর্মিটোলা, ঢাকা।

[email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ডায়াবেটিস,মহামারি,করোনাভাইরাস
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close