প্রয়োজন কারিগরি পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২০, ১১:১০

প্রকৌশলী রিপন কুমার দাস

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাঠ্যবই তৈরির উদ্দেশ্য সামনে রেখে ‘পূর্ববঙ্গ স্কুল টেক্সটবুক কমিটি’ গঠিত হয়। পরে ১৯৫৪ সালে টেক্সটবুক আইন পাস হয় এবং সেই আইন অনুযায়ী ‘স্কুল টেক্সটবুক বোর্ড’ নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। পরে ১৯৫৬, ১৯৬১ এবং ১৯৬৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্নভাবে পুনর্গঠিত হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ স্কুল টেক্সটবুক বোর্ড’ কর্তৃক প্রথম থেকে ১০ম শ্রেণির সব বিষয়ের সব পাঠ্যপুস্তক নবজাত রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন, পরিমার্জন ও পুনঃলিখন কাজ করে। ১৯৭৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমের ওপর ভিত্তি করে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজ শুরু করে। ১৯৮১ সালে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের জন্য ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কেন্দ্র (NCDC)’ নামে পৃথক একটি প্রতিষ্ঠান শিক্ষাক্রম উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের কাজে সমন্বয় সাধনের জন্য পরে ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ স্কুল টেক্সটবুক বোর্ড এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কেন্দ্রকে একীভূতকরণের মাধ্যমে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড’ গঠিত হয়।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, যা এনসিটিবি নামে পরিচিত। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম উন্নয়ন এবং পরিমার্জনের জন্য শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এবং যা জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসারে পাঠ্যপুস্তক ও অন্যান্য শিখন উপকরণের উন্নয়ন ও পরিমার্জনের কাজ করে থাকে। এ ছাড়া এনসিটিবি প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, ইবতেদায়ি, দাখিল ও ভোকেশনাল স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করে থাকে। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের সংখ্যা অনুসারে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। অধিকন্তু এটিই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধনস্ত সবচেয়ে বড় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। জাতীয় শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ড অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ অনুযায়ী NCDC-এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এরমধ্যে প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সিলেবাস ও শিক্ষাক্রম পরীক্ষা এবং সেখানে পুনর্বিবেচনা প্রস্তাব। শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যপুস্তকগুলোর কার্যকারিতা প্রাক পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন। পাঠ্যপুস্তকগুলোর পান্ডুলিপির প্রস্তুতির ব্যবস্থা করা। পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ, বিতরণ ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা। পাঠ্যপুস্তক, পুরস্কারের বই, লাইব্রেরি এবং রেফারেন্স বই অনুমোদন। গ্রান্ট এবং অনুদান প্রদান করে বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কাজকে উৎসাহিত করা । দরিদ্র ও যোগ্য ছাত্রদের বই দান। এ ছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড হতে সরবরাহকৃত পান্ডুলিপির সাহায্যে পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ ও বিতরণ করে আসছে।

অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা পরিচালনা ও সনদপত্র প্রদানের জন্য ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন বাণিজ্য ও শিল্প বিভাগ-এর Vide Resolution No. ১৮৮-Ind. Dated ২৭-০১-৫৪ মোতাবেক ‘ইস্ট পাকিস্তান বোর্ড অব এক্সামিনেশন ফর টেকনিক্যাল এডুকেশন’ নামে একটি বোর্ড স্থাপিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সংগঠন পরিচালন, তদারিক, নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নের দায়িত্ব পালন, পরীক্ষা পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও বোর্ড কর্তৃক গৃহীত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ব্যক্তিবর্গকে ডিপ্লোমা/সার্টিফিকেট প্রদান। অতঃপর ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে এবং ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং ও ট্রেড পর্যায়ের পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ, সনদপত্র প্রদান, পরিদর্শন ও মূল্যায়নের জন্য একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হওয়ার ফলে ১৯৬৭ সালের ৭ মার্চ গেজেট নং-১৭৫ এলএ প্রকাশিত এবং ১নং সংসদীয় আইনের বলে ‘ইস্ট পাকিস্তান টেকনিক্যাল এডুকেশন বোর্ড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়, যার বর্তমান নাম বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও কার্যক্রম হলো- সিলেবাস ও শিক্ষাক্রম পরীক্ষা ও সেখানে পুনর্বিবেচনা প্রস্তাব এবং পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করা। পাঠ্যপুস্তকগুলোর পান্ডুলিপির প্রস্তুতির ব্যবস্থা করা। পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ, বিতরণ ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা। শেখার উপকরণগুলোর বিকাশের ব্যবস্থা করা। আওতাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহের অধিভুক্ত প্রদান করা। শিক্ষার্থীদের ভর্তীকরণ এবং স্থানান্তর করার নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে কাজ করা। পাঠদান ও শেখার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শিক্ষাক্রমে নিবন্ধনকরণ ও নিবন্ধন কার্ড প্রদানকরণ। পরীক্ষা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা এবং এর ফলাফল প্রকাশ করা। ফলাফল প্রকাশের পর অ্যাকাডেমিক প্রতিলিপি, প্রশংসাপত্র তৈরি ও বিতরণ করা। পাস করার পর গ্র্যাজুয়েটদের ডিপ্লোমা/সার্টিফিকেট সনদ প্রদান। বিটিইবির পদ সৃষ্টি ও বিলুপ্তকরণসহ সব প্রশাসনিক বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। সুন্দরভাবে পরিচালিত ইনস্টিটিউটসমূহকে বৃত্তি, পদক ও পুরস্কার প্রদান করা।

বর্তমানে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ, বিতরণ ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করেছে। সরকার বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কার্যক্রম জোরদারকরণে মাঠপর্যায়ে শাখা অফিস স্থাপন করার পাশাপাশি ২০২৫ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষা ক্ষেত্রে সুষ্ঠু অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এনরোলমেন্ট বৃদ্ধি বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে সব বিভাগীয় পর্যায় স্বতন্ত্র কারিগরি শিক্ষা বোর্ড স্থাপন করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

যেহেতু সব বিভাগেই স্বতন্ত্র কারিগরি শিক্ষা বোর্ড গঠন করা হবে ও ভবিষ্যতে পৃথক বাংলাদেশ ভোকেশনাল শিক্ষা বোর্ড গঠন করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে সিলেবাস প্রণয়ন, শিক্ষাক্রম পরীক্ষা, সেখানে পুনর্বিবেচনা প্রস্তাব। শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যপুস্তকগুলোর কার্যকারিতা প্রাক পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন। পাঠ্যপুস্তকগুলোর পান্ডুলিপির প্রস্তুতি, পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ, বিতরণ ও বিক্রয়ের দায়িত্ব কোন শিক্ষা বোর্ডের অধীনে থাকবে, তা নিয়ে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাক্রমের কারিকুলাম ও পাঠ্যবই প্রণয়নের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)-এর ন্যায় জাতীয় কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NTVCTB) গঠন করা প্রয়োজন।

প্রস্তাবিত জাতীয় কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NTVCTB) বাংলাদেশ সব স্বতন্ত্র কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও ভোকেশনাল শিক্ষা বোর্ডের বেসিক ট্রেড, স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, ডিপ্লোমা পর্যায়ের সিলেবাস ও শিক্ষাক্রম পরীক্ষা এবং সেখানে পুনর্বিবেচনা প্রস্তাব। শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যপুস্তকগুলোর কার্যকারিতা প্রাক পরীক্ষা এবং মূল্যায়ন। পাঠ্যপুস্তকগুলোর পান্ডুলিপির প্রস্তুতির ব্যবস্থা করবে। পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ, বিতরণ ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করবে। পাঠ্যপুস্তক, পুরস্কারের বই, লাইব্রেরি এবং রেফারেন্স বই অনুমোদন। গ্রান্ট এবং অনুদান প্রদান করে বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কাজকে উৎসাহিত করবে। দরিদ্র ও যোগ্য ছাত্রদের বিনামুল্যে বই দান করবে।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত জাতীয় কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাক্রম এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NTVCTB) কারিগরি শিক্ষাক্ষেত্রে যুগোপযোগী কারিকুলাম প্রণয়নে TVET কারিকুলাম ডেভেলপমেন্ট পুল গঠন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কারিগরি শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী নির্দেশিকা ও আইবুক প্রণয়ন করবে। জাতীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক যোগ্যতা কাঠামো (NTVQF)-এর জাতীয় প্রাক-বৃত্তিমূলক সনদ (NPVC) ও জাতীয় সক্ষমতা সনদ (NSC) স্তরের জন্য কম্পিট্যান্সি বেইজড লার্নিং ম্যাটেরিয়ালস (CBLM) ও যোগ্যতা এবং দক্ষতা উন্নয়নের লগ বই (CLSB) ভিত্তিক বইসমূহ প্রণয়ন করবে। আর এভাবে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে এ দেশে দক্ষ কারিগরের জন্ম হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

লেখক : ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর
ডোনাভান মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পটুয়াখালী
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল