ভাষান্তর : মিরন মহিউদ্দীন

  ০৩ ডিসেম্বর, ২০২১

ভৌতিক যাত্রা

মূল : রাস্কিন বন্ড

একসময় আমি শাহগঞ্জ থেকে মাইল-পাঁচেক দূরের এক গ্রামে থাকতাম। শাহগঞ্জ হলো উত্তর প্রদেশের পূর্ব এলাকার একটি জেলা। সেখানে যাতায়াতের একমাত্র উপায় ছিল একটা বাইসাইকেল। অবশ্য শাহগঞ্জ যাওয়ার জন্য কোনো না কোনো কৃষকের গরুর গাড়িতে চাইলেই চড়তে পারতাম। কিন্তু একটাই কথা যে, যদিও যাওয়া-আসার রাস্তা খারাপ ছিল, আর আমিও ‘সাইকেল-চালিয়ে’ হিসেবে তেমন পটু ছিলাম না, তবু এটা ঠিক যে, সাইকেলে গেলে আরামে অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাওয়া যেত।

প্রায় রোজই শাহগঞ্জে যেতাম। পোস্ট অফিস থেকে নিজের চিঠিপত্র নিতাম। কিংবা খবরের কাগজ কিনতাম। কখনো স্রেফ ভাঁড়ের পর ভাঁড় চা খেয়ে দোকানিদের সঙ্গে আড্ডা মারতাম। সাইকেল চালিয়ে গ্রামে ফিরতে সন্ধ্যা ছটা বেজে যেত। পথটা ছিল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে, বেশ নির্জন আর নিস্তব্ধ। শীতকালে ছটার মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসত। তখন সাইকেলে আটকানো আলোটার দরকার পড়ত।

এক দিন সন্ধেবেলায় গ্রামে ফিরছি। যখন প্রায় অর্ধেক রাস্তা চলে এসেছি, হঠাৎ সাইকেল থামাতে হলো। দেখি, একটা বাচ্চা ছেলে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এ রকম সময়ে এ পথে কোনো বাচ্চার থাকার কথা নয়। নেকড়ে বা হায়নার আনাগোনা আছে এসব অঞ্চলে। আমি সাইকেল থেকে নেমে তার কাছে গেলাম। মনে হলো, সে যেন আমাকে তেমন লক্ষই করল না।

‘এখানে একলা দাঁড়িয়ে কী করছো তুমি?’ - আমি জিজ্ঞেস করলাম।

আমার দিকে না তাকিয়েই সে জবাব দিল, ‘আমি অপেক্ষা করছি।’

‘তোমার বাবা-মা কারোর জন্যে?’

‘না, আমার দিদির জন্যে।’

‘আমি তো এই রাস্তা দিয়েই এলাম। কাউকে দেখিনি। মনে হচ্ছে, ও সামনে এগিয়ে গেছে। তুমি বরং আমার সঙ্গে এসো। একটু এগোলেই নিশ্চয় ওকে পেয়ে যাব।’

ছেলেটা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে, চুপচাপ আমার সাইকেলের সামনে ক্রস্বারে উঠে পড়ল। তার মুখ দেখতে পেলাম না। একে তো অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর ছেলেটা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছিল। সামনে থেকে হাওয়া দিচ্ছিল। সাইকেল চালাতে চালাতে ঠা-ায় আমি কেঁপে উঠছিলাম। কিন্তু ছেলেটার যেন কোনো হেলদোল নেই।

একটুখানি পথ যেতেই আমার সাইকেলের ল্যাম্পের আলোয় দেখি একটা বাচ্চা মেয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। এই ছেলেটার চেয়ে একটু বড়। তার লম্বা চুল হাওয়ার দাপটে এলোমেলো হয়ে তার মুখখানা ঢেকে দিয়েছে।

‘ওই তো তোমার দিদি। চলো ওকে আমাদের সঙ্গে নিয়ে নিই।’ আমি বললাম। মেয়েটা কিন্তু আমাকে পাত্তাও দিল না। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে একবার মাথা নেড়ে, আমার সাইকেলের পেছন দিকে, ক্যারিয়ারে উঠে বসল। আমি আবার চালাতে শুরু করলাম।

আমি বেশ বন্ধুত্ব করার ধরনে তাদের কিছু প্রশ্ন করছিলাম, কিন্তু উত্তরে তারা ‘হ্যাঁ’ ‘হু’র বেশি সাড়া দেয়নি। মনে হলো, আমি তাদের অচেনা মানুষ বলেই হয়তো একটু সাবধান হচ্ছে।

যাক গে বাবা, গ্রামে পৌঁছে, মোড়লের হাতে এদের তুলে দিয়েই আমার দায়িত্ব শেষ! সে নিশ্চয় এদের বাবা-মায়ের খোঁজ দিতে পারবে।

রাস্তা একেবারে সমতল, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যেন পাহাড়ি চড়াইয়ের পথে যাচ্ছি। তখন আমি খেয়াল করলাম, সামনে ছেলেটার মাথা যেন আগের চেয়ে আমার মুখের অনেক কাছে। আর পেছন থেকে মেয়েটার নিঃশ্বাসের আওয়াজ আসছে। এত জোর আর ভারী যেন মনে হচ্ছে, সাইকেলটা বুঝি তাকেই চালাতে হচ্ছে। ঠা-া হাওয়া বইছিল যদিও, তবু আমার গরম লাগছিল। কেমন একটা দমবন্ধ ভাব।

‘একটু থামা যাক এবার।’ - আমি বলে উঠলাম।

‘না না, থামলে হবে না।’ - দুজনে একই সঙ্গে যেন আর্তনাদ করে উঠল।

আর কী আশ্চর্য আমিও কোনো রকম তর্কাতর্কি না করে সাইকেল চালাতে লাগলাম। অবশ্য তারপরেই আমার মনে হলো, এদের কথায় পাত্তা না দিয়ে একটু থামি। আর ঠিক তখনই আমার নজর পড়ল ছেলেটার হাত দুটোর দিকে। সে হ্যান্ডল বারে হাত রেখে বসেছিল। দেখলাম সে দুটো এখন অনেক বেড়ে গেছে। হয়ে উঠেছে কালো আর লোমশ।

আমার হাত কেঁপে গেল। সাইকেলটা টলমল করতে লাগল পথের মাঝখানে।

‘সাবধান। দেখে চালাও!’ - সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল দুজনে। যেন আমাকে হুমকি দিচ্ছে। তাদের গলার স্বর আর বাচ্চাদের মতো শোনাচ্ছিল না। আমি চট করে একবার পেছন দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকালাম। জীবনে কখনো অমন ভয় পাইনি। মেয়েটার মুখখানা এখন ফুলে প্রকাণ্ড হয়ে উঠেছে। পাগুলো কালো আর লোমে ছাওয়া। মাটি পর্যন্ত নেমে এসেছে।

‘ওই নালাটার কাছে গিয়ে থামো।’ - সেই ভয়ংকর বাচ্চা দুটো এবার হুকুমের ভঙ্গিতে বলল।

কিন্তু কিছু করার আগেই, আমার সাইকেলের সামনের চাকা একটা পাথরে ধাক্কা খেয়ে টাল সামলাতে পারল না। আমি ছিটকে মাটিতে পড়লাম। বুঝতে পারলাম, কোনো জন্তুর খুরের মতো শক্ত কিছু আমার মাথার পেছনে আঘাত করল। তারপরেই ভীষণ অন্ধকার ঘিরে ফেলল আমার সমস্ত চেতনাকে।

কতক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরল। তখন চাঁদ উঠেছে। তার আলো পড়ে সামনের নালাটার জল চিকচিক করছে। বাচ্চা দুটো কেউ কোথাও নেই। আমি মাটি থেকে ওঠে, যখন কাপড়চোপড়ের ধুলো ঝাড়ছি, তখনই নালার দিক থেকে জল ছিটানো আর জলের মধ্যে দাপানোর ছপাং ছপাং শব্দ কানে এলো। আমি আবার ফিরে তাকালাম। দেখি, চাঁদের আলো ঝলকানো কাদাভর্তি নালা থেকে দুটো ছোট ছোট মোষ আমার দিকে চেয়ে আছে।

ইংরেজ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক রাস্কিন বন্ডের জন্ম হিমাচল প্রদেশের কসৌলিতে ১৯৩৪-এর ১৯ মে। ১৭ বছর বয়সে লেখেন তার জীবনের প্রথম উপন্যাস The Room

On The Roof। ১৯৯২ সালে ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান দেওয়া হয় তাকে ১৯৯৯ সালে এবং ‘পদ্মভূষণ’ ২০১৪-তে। বর্তমানে বাস করছেন মুসৌরিতে

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close