ব্রেকিং নিউজ

শামসুর রাহমানের কয়েকটি কবিতাপাঠ

ফকির ইলিয়াস

প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে কজন কবি বহুল পঠিত হওয়া দরকার, শামসুর রাহমান তাদের অন্যতম প্রধান। তিনি আমাদের জীবন ও স্বভূমিকে কবিতায় যেভাবে কাছে আনতে পেরেছেন, অন্য অনেকেই তা পারেননি। তার বিশেষত্ব সেখানেই। একজন কবিকে তার সৃষ্টি রেখেই চিরবিদায় নিতে হয়। কিন্তু তার কর্ম আলোচিত হতে থাকে যুগে যুগে।

শামসুর রাহমান ছিলেন আমাদের কবিতার বরপুত্র। তার হাতে বাংলা কবিতার স্বর্ণালি যুগ কেটেছে। কোন অধিকার আন্দোলনে সচেতন ছিলেন না তিনি!

শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার প্রথম যে বিষয়টিতে মিল ছিল, তা হলো বাংলাদেশ নামক ভূখ-টির জন্ম সেই ১৯৪৭ সালেই হওয়া উচিত ছিল। তিনি আমার অগ্রজ কবি। কিন্তু আমি কৈশোরে যে ভাবনা নিয়ে বড় হয়েছি, যৌবনে পৌঁছে শামসুর রাহমানের সঙ্গে পরিচিত হয়ে এটাই লক্ষ্য করেছি, আমি এখন যা ভাবি তিনি তা ৩০ বছর আগেই ভেবেছিলেন। একজন বড় কবির দূরদর্শিতা সেখানেই। তিনি তার নবীন প্রজন্মের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সময়কে ধারণ করতে পারেন।

শামসুর রাহমান সেই কালো ‘রায়ট’ দেখেছেন। তিনি বুকের পাঁজরে দেশভাগের স্মৃতির বেদনা নিয়ে লিখেছেন ‘পাগলামী করিসনে বন্ধু সুধাংশু/সময় যে পার হয়ে যাচ্ছে/এবার যে তোর পালানোর বেলা/জিদ করিসনে বন্ধু, এখনই তুই পালা।/জানি তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু/দাঁড়িয়ে হাহাকারের ছোঁয়ায় জড়ানো শ্মশানসম বাস্তুভিটায়/সেই হারিয়ে যাওয়া প্রাণচঞ্চল দিনগুলো, আমাদের ছেলেবেলা/কিন্তু এবার যে তোর পালানোর বেলা, এবার তুই পালা।/আমি জানি নির্বাক দাঁড়িয়ে তুই কী ভাবছিস বন্ধু সুধাংশু/সেই একপাল বন্ধুগুলোÑ রামী, শেপু, কাকলী আরও অনেকে/প্রাণময় কোলাহলে কাটিয়েছি সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা বেলা/কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।/আমি বুঝি তোর শঙ্কা আগামী বিরহ বেদনার বন্ধু সুধাংশু/আড়াই যুগ ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা আত্মার সম্পর্ক/এই বাস্তুভিটার সাথে আর একঝাঁক বন্ধুর ভালবাসা প্রাণঢালা।/কিন্তু এবার যে তোকে পালাতে হবে, এবার তুই পালা।’ (সুধাংশু যাবে না)

আচ্ছা, এই যে বেদনার মাটিত্যাগ-চিত্র, তা কি বদলেছে? না বদলায়নি। দখলের পর দখল হয়ে যাচ্ছে আমাদের চর, মাঠ, ঘাট, বন, প্রান্তর আর প্রতিবেশীর বাড়িঘর। এর কোনো সুবিচার হচ্ছে না। পূর্ণিমা রানিরা এখনো সিরিয়াল রেপিস্টের শিকার হচ্ছে! কোথায় মানবতা! কোথায় সেই স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা! একজন কবি আগাম দেখতে পারেন। তিনি কাঁদেন। আকুতি করেন। তার ডাক কি শোনে কেউ! হয়তো শোনে, হয়তো শোনে না। তারপরও তাকে লিখতে হয়। কলম নিয়ে বসে থাকতে হয় বছরের পর বছর।

শামসুর রাহমান তার কাব্যজীবনের প্রথমদিকে কেমন কবিতা লিখতেন। তা আমরা কেউ জানি, কেউ জানি না। ‘কাফেলা’ পত্রিকার (ফাল্গুন ও চৈত্র ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ, ১৯৫০ ইংরেজি সালে একটি কবিতা তার ছাপা হয়। এটা তার লেখা প্রথম জীবনাংশের কবিতা বলে আমরা বিবেচনা করতে পারি। কবিতাটি ছিল এ রকম ‘কিষানের হাতে শানিত কাস্তে, কিষানির চোখে হাসির কুঁড়িটি ফোটে :/সোনালি ধানের সোনালিয়া শিষ কাজল মাটিতে লোটে।/ভোরের আকাশ ঝকঝকে নীল : ফসলের মাঠে নারঙ্গি রোদ কাঁপে,/কিষানির চোখ উজ্জ্বল হলো স্বপ্নের উত্তাপে।/ভোরের আকাশ ঝকঝকে নীল : ফসলের মাঠে নারঙ্গি রোদ কাঁপে।/আকাশ সেদিন ধ্বনিময় ছিল নীল সাগরের মতো/বুনো হাঁসগুলি ডানা মেলে দিয়ে ভেসেছে ইতস্তত।/আকাশ সেদিন ধ্বনিময় ছিল নীল সাগরের মতো।/এত দিন ধরে জীবনে মোদের ছেয়ে ছিল শুধু ফাঁকি,/এত দিন ধরে দীপ্ত দিনের পরিচয় ছিল বাকি।’ (সংক্ষেপিত)

এই কবিতাটির সঙ্গে কবির পরিপূর্ণ জীবনের কবিতাগুলোর খুব কম মিলই আমরা খুঁজে পাই। তবে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না, শামসুর রাহমান আজীবনই ছিলেন সাম্যবাদী মানুষ। তিনি গণমানুষের পক্ষে থেকে সবল চিত্তেই দাঁড়িয়েছেন নিজ সাধ্য দিয়ে।

শামসুর রাহমানের কয়েকটি কবিতার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি আছে। তিনি নিউইয়র্ক সফরে এসেছিলেন। ওই সময়ে উত্তর আমেরিকায় সামরিক জান্তা এরশাদবিরোধী আন্দোলন খুবই তুঙ্গে। ওই সময়ে তাকে নিয়ে ঘুরেছি নিউইয়র্কের অলিগলি, কবিতা ক্যাফে, গ্রিনিচ ভিলেজ।

দেশে ফিরে তিনি ওই স্মৃতি নিয়ে কবিতা লেখেন। এর মধ্যে রয়েছে তার একটি বিখ্যাত কবিতা। এখনো আমরা মনের অজান্তে বলে উঠি, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। কবির এই যে বলা, তা থেকে কি বাংলাদেশ বেরিয়ে আসতে পেরেছে? না পারেনি। পারেনি বলেই তো আজ ধর্ষকরা প্রকাশ্যে মহড়া দিচ্ছে বাংলার গ্রামে গ্রামান্তরে, আনাচে-কানাচে, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

শামসুর রাহমানের কবিতায় মানবিক প্রেম আমাদের মোহাবিষ্ট করে রাখে বারবার। তিনি তার প্রেমিকাকে খুঁজেছেন এই বাংলার পলিতে। তার মায়ের মুখ ভেসে উঠেছে যে সূর্যভোরে, সেই ব-দ্বীপের নাম বাংলাদেশ। শামসুর রাহমানের কবিতায় আমাদের মজলুম মানুষের স্থিরচিত্র উঠে এসেছে এক ব্যাপৃত ক্যানভাসে।

তার স্বাধীনতাবিষয়ক কবিতাগুলো আমাদের কবিতার আকর। শামসুর রাহমানের কবিতায় আমরা তার নিজস্ব ভাষা-ব্যবহারের সাক্ষ্য পাই। তিনি যা লেখেন, তা এক নিটোল ভঙ্গিমায় আমাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।

একজন কবির কবিতার আংশিক উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচনা হয় না। কথাটি আমাকে বলেছেন, মার্কিন কবি ডব্লিউ এস মারউইন। কারণ পরের স্তবকে কবি কী বলেছেন, তার ওপরই হয়তো নির্ভর করে আগের স্তবক। তাহলে পাঠক কী বুঝবেন যদি পুরো কবিতাটি না পড়েন!

শামসুর রাহমান আমাদের জীবন ভেদ করে কবিতাকে নিয়ে গিয়েছেন পাঁজরের কাছাকাছি। এমন অনেক উদাহরণ দিয়ে নিবন্ধ দীর্ঘতর করা যাবে। কিন্তু আজকের পাঠকেরও তো একটা দায়িত্ব আছে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সমৃদ্ধ কবিতাগুলো পড়ার। নয় কি?

শামসুর রাহমানের কবিতাগুলো আমাদের শিল্পিত বেদনা-বোধ। তাকে যতই অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হোক না কেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, জাতির পিতার নির্মম হত্যাকা-, সামরিক জান্তাদের বিরুদ্ধে হুংকার, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র-সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে তার সুস্পষ্ট অবস্থান আমাদের কবিতার বীজতলাকে অনেক মজবুত করেছে। আজকের প্রজন্ম সেসব কবিতা পড়লে এর প্রমাণ পাবেন পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে।

খুবই প্রাসঙ্গিক একটি কবিতা দিয়ে আমি লেখাটি শেষ করতে চাই। তিনি লিখেছেন, ‘আমার শরীর থেকে টুকরো টুকরো কী খসে পড়ছে স্ট্রেচারে? মাটিতে? এ আমি কোথায় চলেছি? স্ট্রেচার-চালকদের প্রশ্ন করতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছি বারবার।’ এই চিত্রটি আজকের বাংলাদেশের। কোথায় চলেছি আমরা! কোথায় চলেছে বাংলাদেশ! আমাদের মানবিক বোধ আজ কোথায়! আসুন পড়ি সেই কবিতাটি ‘গোধূলি-স্নাত বারান্দায় খয়েরি পাখিটাকে দেখে/ভালো লাগল না কি মনের/গহনে ভয়ানক হিম হাওয়া বয়ে গেল, বুঝতে/পারিনি। মনে হলো, কারা যেন অত্যন্ত/তাড়াহুড়ো করে আমাকে মলিন স্ট্রেচারে শুইয়ে ঠেলে/নিয়ে চলেছে ঢিমে তালে। ডুবু-ডুবু সূর্য হিংস্র জন্তুর মুখ!/আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে জোড়া-তালি-দেওয়া/আনাড়ি ব্যান্ডেজ ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে দেখছে চারপাশের/রুক্ষ গাছগুলোকে। কী একটা করুণ সুর/ভেসে আসে কে জানে কোত্থেকে। আমার শরীর থেকে টুকরো/টুকরো কি খসে পড়ছে স্ট্রেচারে? মাটিতে? এ আমি/কোথায় চলেছি? স্ট্রেচার-চালকদের প্রশ্ন করতে গিয়ে/ব্যর্থ হচ্ছি বারবার। তবে কি আমার গলা থেকে কোনও/আওয়াজ বেরুচ্ছে না? না কি ওরা কানে তুলো গুঁজে/রেখেছে ঢের আগে থেকে! এক রত্তি শক্তি নেই শরীরে,/অথচ লাফ দিয়ে মাটিতে দাঁড়াতে ভারী ইচ্ছে করছে।’ (এক পাল পশু ধেয়ে আসছে)

কবি সমাজের অনেক সংকট আগাম দেখেন। স্বাধীন বাংলাদেশে নানামুখী সংকট আজ। তা কাটিয়ে উঠতে আলোকিত মানুষ প্রয়োজন। আইনের শাসন তাদের জন্যই, যারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বন্যশূকর তো আইন মানে না! আমাদের অনেক আঁধারের মধ্যে শামসুর রাহমান যে আলোর বাতি জ্বালিয়ে গিয়েছেন, তা সমুন্নত রাখতে পারলেই বেঁচে থাকবে তার কাব্য-চেতনা।

 

 

"