বদরুল আলম মজুমদার

  ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১

আস্থার সংকটে ই-কমার্স

বাজারে এখনো ‘ইভ্যালি’র মতো শত প্রতিষ্ঠান

ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালি, সিরাজগঞ্জশপসহ ই-কামার্স খাতের কোম্পানিগুলোর প্রতারণার জন্য আস্থার সংকটে পড়েছে ডিজিটাল মার্কেটিং বা ই-কমার্স খাত। নানা ধরনের প্রতারক কোম্পানির জন্য এ খাতে যারা সৎভাবে ব্যবসা করছে তারা নেতিবাচক প্রচারণার মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় সম্ভাবনাময় ই-কমার্স সেক্টরে নতুন করে সংকট দেখা দেওয়ায় মানুষের মধ্যেও নৈতিবাচক ধারণার জন্ম নিয়েছে ই-কমার্স খাত নিয়ে। আবার ইভ্যালির মতো প্রকাশ্যে বা গোপনে অনেক প্রতারক প্রতিষ্ঠান মানুষের পকেট কেটে হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে। এরই মধ্যে ১০-১৫টি প্রতিষ্ঠান নজরদারিতে থাকলেও এর অধিকাংশ নির্বাহী বা মালিকরা গা-ঢাকা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক নীতিমালা এবং কঠোর নজরদারি না থাকলে এই খাতে চরম বিশৃঙ্খলাসহ সম্ভাবনাময় একটি ব্যবসা সেক্টর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

তারা বলছেন, এমএলএম ধারণায় মার্কেটিং করে পৃথিবীর অনেক দেশে, অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ কনসেপ্টে ভালোভাবে ব্যবসা করলে খুব জলদি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতারক টাইফের কিছু লোকজনের কারণে এই মার্কেটিং ধারণাটি দেশের মানুষের মনে টোটাল নেতিবাচক ধারণার জন্ম নিয়েছে। এই প্ল্যান মোতাবেক পণ্য বিক্রির চেষ্টা করা হলেও মানুষ ভাবে- এগুলো প্রতারণা। অর্থাৎ এমএলএম কনসেপ্ট বলতেই ভোক্তারা এটাকে প্রতারণা ভাবছে।

আবার সমবায় সমিতির মাধ্যমে সম্মিলিত পুঁজির আইডিয়াকেও একশ্রেণির প্রতারক খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। যার ফলে গত কয়েক বছরে সমবায় খাতেও বড় কোনো সাফল্য দেখতে পাওয়া যায় না। আর দেশের বড় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোও লুটপাটের মুখে পড়ে আজ সবস্বান্ত। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসায়িক সেক্টরে একশ্রেণির প্রতারক হঠাৎ বড়লোক হতে আর্থিক বা ব্যবসা খাতের ভালো আইডিয়াগুলোকে মন্দ কাজে ব্যবহার করে ধারণাগুলোর প্রতি মানুষের চরম নেতিবাচক ভাবধারার জন্ম দিয়েছে। তাই মানুষ এমএলএম বা সমবায় সমিতির যেকোনো ধরনের ভালো উদ্যোগগুলোকেও খারাপভাবে নিচ্ছে। সরকারের নীতি-শৈথল্যতার কারণে এমনটা হয়েছে। বিশেষ করে ই-কমার্স খাতের সাম্প্রতিক প্রতারণায় এ খাতের অবস্থা বেহাল।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেসিসের সাবেক সভাপতি ও ই-কমার্স উদ্যোক্তা ফাহিম মাসরুর বলেন, ‘বিশাল প্রভাব পড়েছে ই-কমার্সে। ছোটদের ওপরে প্রভাবটা বেশি। বড় তথা মেইন স্ট্রিমের ই-কমার্স, যাদের গ্রাহক বেশি, তাদের খুব বেশি সমস্যা হবে না।’ তিনি বলেন, ‘ই-কমার্সে মানুষের আস্থা কমেছে। নতুন গ্রাহক আসছে না। পুরোনো গ্রাহকরাও সরে যাচ্ছে। তারা অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। এই প্রবণতা এ খাতের জন্য শুভ নয়।’

তিনি জানান, সার্বিকভাবে ই-কমার্সে গত কিছুদিনে ২০-২৫ শতাংশ অর্ডার কমে গেছে। অগ্রিম নিতে পারছেন না অনেকে। পেমেন্ট গেটওয়ে কোম্পানিগুলো নগদ টাকা দিতে বেশি দেরি করছে। তিনি সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, ‘ই-কমার্সে যাদের নাম আসছে, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। যারা ইভ্যালির মডেলে ব্যবসা করছে, তাদের সম্পদ জব্দ করা উচিত। তাহলে অন্যরা সতর্ক হয়ে যাবে। গ্রাহকরা ক্ষতির মুখে পড়বেন না।’

সরকারি মনিটরিংয়ের বিষয়ে গণমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকারে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসার প্রসারে রয়েছে নির্দিষ্ট পরিকল্পনাও। করোনাকালে ই-কমার্সের প্রসার হয়েছে। গত দেড় বছরে লাখ লাখ মানুষ এ খাতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। বেকারত্ব দূর হয়েছে। এটা সরকারের জন্য খুবই আশাব্যঞ্জক। আরো দুই বছর পরের টার্গেট এখনই পূরণ হয়েছে। তবে এটা নিয়ে কিছু সমস্যাও তৈরি হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সুযোগ নিয়ে মানুষের টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিয়েছে। এটা সরকারের নজরে এসেছে। বাণিজ্য, অর্থ ও আইন মন্ত্রণালয় এই জালিয়াতি নিয়ে সরাসরি কাজ করছে। সমস্যাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ-বিষয়ক কমিটিকে আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করা হবে। শুধু লাভ নয়, সব দিক বিবেচনা করে যেন মানুষ বিনিয়োগ করে।

তিনি আরো বলেন, ভোক্তারা যেন বঞ্চিত না হন, লোকসানে না পড়েন। তবে কোনো অবস্থায় ই-কমার্সের এই প্রসার স্থবির হয়ে পড়ুক এটা সরকার চায় না। কারণ তৃণমূলের অনেকে এ ব্যবসা করে বেঁচে আছেন। এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে যারাই ব্যবসা করুক, তাদের একটি কেন্দ্রীয় নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে। বিজ্ঞাপন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি নীতিমালা মানতে হবে। ওই বিজ্ঞাপনে বলে দেওয়া হবে, নিজেরা বুঝেশুনে সতর্কভাবে বিনিয়োগ করুন। সরকারকে দায়ী করবেন না।

এদিকে ই-কমার্স খাতে আলোচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আরো অনেক প্রতিষ্ঠান এভাবে প্রতারণা করে যাচ্ছে। শহর থেকে গ্রামে সব জায়গাতেই এ ধরনের প্রতারণার দোকান খোলা হয়েছে। শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজ এরই মধ্যে গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। কয়েকটি বড় প্রতারণার ঘটনার পর সরকারও নড়েচড়ে বসেছে। জানা গেছে, সরকার ৯টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা তদন্ত করতে একটি কমিটি গঠন করেছে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে এ তদন্তের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যসচিব।

জানা গেছ, আলেশা মার্ট ও ই-অরেঞ্জসহ ৯টি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- ধামাকা, আলাদিনের প্রদীপ, বুম বুম, আদিয়ান মার্ট, সিরাজগঞ্জশপ, কিউকুম, নিড ডটকম ডটবিডি। এসব প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ আর্থিক অবস্থা, মোট দায় এবং প্রতিষ্ঠানের চলতি ও স্থায়ী মূলধনের তদন্ত করা হচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা প্রতিবেদন চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। এর বাইরে আরো কয়েকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা হয়েছে।

এদিকে প্রতারণা ঠেকাতে ই-কমার্সের বিজ্ঞাপনের নিচে ‘অনলাইনে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতারণা থেকে সাবধান’- এমন সতর্কবাণী লিপিবদ্ধ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এটি নিশ্চিত করতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে গত বৃহস্পতিবার চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া বিদ্যমান মানি লন্ডারিং আইনে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে বিদ্যমান আইনের সংশোধনীর কাজও শুরু করেছে।

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close