দৃষ্টিপাত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : এক অনন্য উচ্চতার নাম

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

ড. শাহনাজ পারভীন

নব্বইয়ের দশকে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম, তখন প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঢোকার আগেই নীলক্ষেত থেকেই দেখতে পেতাম স্বৈরাচার সরকার পতনের আন্দোলনে অস্ত্রের ঝনঝনানি, মারামারি, দৌড়াদৌড়ি, রক্ত এবং ছাত্ররাজনীতির চরম উত্তেজনা। আমার এমএ ফাইনাল পরীক্ষার সময় আমার ছোট কন্যাটি বেশ ছোট থাকায় চার ঘণ্টার অজুহাতে মাঝে মাঝে ওর বাবাকে নিয়ে যেতে হতো। অনেকটা সময় ওরা ক্যাম্পাসে কাটাত। খুব কাছ থেকে যখন এসব দৌড়াদৌড়ি দেখতাম তখন ওর বাবা বিড়বিড় করত, আমি অস্ফুট শুনতে পেতাম। আমার কিন্তু কখনো এসবে ভয় বা অস্থিরতা ছিল না। বুকের মধ্যে এক ধরনের গরম রক্ত টগবগ করত। আমার ক্যাম্পাস। আমার ইউনিভার্সিটি। কেমন যেন আমিও সটান দাঁড়িয়ে যেতাম মননে, সত্যি সত্যি। সেই আমার অহঙ্কার, সেই আমার অন্য এক উচ্চতার নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। এখনো যখন ভাবি, তখনই কী এক অন্য উচ্চতার আলোয় আলোকিত হয়ে যায় আমার হৃদয়, আমার মন। যাপিত জীবনে নানা রকম শ্লাঘার বিষয় থাকলেও ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোয় মুহর্তেই সব আঁধার ভেদ করে আলোকিত হয়ে যায় নানা বর্ণের দিনগুলো। কোনো অন্ধকারই সেখানে আর দাঁড়াতে পারে না।

সম্প্রতি ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ ২০২১ সালে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা প্রকাশ করেছে। ৯৩টি দেশের দেড় হাজার বিশ্ববিদ্যালয় এ তালিকায় স্থান পেয়েছে। তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১০০১ নম্বর অবস্থানে। শিক্ষা প্রদান, গবেষণা, জ্ঞান বিতরণ ও আন্তর্জাতিক মানদন্ডÑ এই চারটি ক্যাটাগরিতে মোট ১৩টি দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে এ তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকা প্রকাশের আগে ১৩ মিলিয়নের বেশি গবেষণা, প্রকাশনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং জরিপে বিশ্বব্যাপী ২২ হাজার বিশেষজ্ঞের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, শিক্ষার মানের জন্য একদা ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে অভিহিত করা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা দিন দিন কমছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির দীর্ঘায়িত প্রক্রিয়া, বিদেশি বান্ধব ক্যাম্পাস, আবাসন সুবিধার অভাব এবং ঢাকার শিক্ষা খাতে অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াকে দায়ী করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ঢাবিতে ভর্তি নিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ সমাধানে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেও দায়ী করছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সহায়তা ডেস্ক থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও বর্তমানে ঢাবির বিভিন্ন বিভাগ ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫,১৬০ বিদেশি শিক্ষার্থী এবং পে-রোল আওতায় ১৯ জন শিক্ষক নিযুক্ত আছেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। স্যার পি জে হার্টজ আন্তর্জাতিক হলের সংযুক্তিতে ঢাবিতে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন।

হলের প্রভোস্ট ড. মো. মহিউদ্দিন স্যারের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে হলটিতে ১১৭ জন বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। তার মধ্যে ৩৮ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত আর বাকিরা অধিভুক্ত মেডিকেল ইনস্টিটিউটে ভর্তি রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৩টিতে প্রায় ৮০৪ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছেন। অন্যদিকে দেশে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭টিতে ১,৩৮৬ জন বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্কিত কার্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ স্যার বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেভাবে বিজ্ঞাপন দেয়, সেভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া হয় না। ফলে আমরা যে বিষয়গুলো পড়াই ও আমাদের যেসব ডিগ্রি কোর্স আছে, সে সম্পর্কে বিদেশি শিক্ষার্থীরা জানেন না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলে আমরা বিদেশি শিক্ষার্থীদের নজরে আসার জন্য মার্কেটিংয়ে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে বিশ্বাসী না।’ তিনি বলেন, ‘একজন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য প্রথমে আমাদের ওয়েবসাইটে ঢুকে অনলাইন প্রসপেক্টাস ও আমাদের সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করবেন। দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা এখনো আন্তর্জাতিক মানের একটি অত্যাধুনিক পোর্টাল এবং প্রসপেক্টাস ডিজাইন করতে পারিনি, আমাদের গৌরব অর্জন এবং আরো বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করার জন্য বিখ্যাত গবেষণা কাজগুলো তুলে ধরার উদ্যোগ নিয়েছি। তবে পদোন্নতির জন্য শিক্ষকরা গবেষণা বা একাডেমিক কাজের চেয়ে রাজনীতির প্রতি বেশি মনোযোগী।’

অধ্যাপক ইমতিয়াজ স্যার সর্ব বিষয়েই সঠিক তথ্য তুলে ধরেছেন। স্যারের প্রতিটি কথাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই তথ্যটি জেনে মনে মনে কষ্ট অনুভব করছি যে, কর্তৃপক্ষ এখনো আন্তর্জাতিক মানের একটি অত্যাধুনিক পোর্টাল এবং প্রসপেক্টাস ডিজাইন করতে পারেনি; যা সত্যিই বেদনার উদ্রেক করে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আন্তর্জাতিক মানের একটি অত্যাধুনিক পোর্টাল এবং প্রসপেক্টাস ডিজাইন অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়াও বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে গণমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ‘মিডিয়া কভারেজ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত ধারণা আছে যে, ঢাবিতে পড়াশোনা করার জন্য বাংলা জানতে হবে। অনেক বিভাগই শেখানোর মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ব্যবহার রয়েছে, তা তারা জানেন না। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা খাবার সরবরাহ করার বিষয়েও মিডিয়াতে ঐভাবে জানানো হয় না। বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কৌশলগত বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

তিনি বলেছেন, পদোন্নতির জন্য শিক্ষকরা গবেষণা বা একাডেমিক কাজের চেয়ে রাজনীতির প্রতি বেশি মনোযোগী। এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি একটি জাতির জন্য অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় বলে আমি মনে করি।

আমি এই তথ্যের সঙ্গে আর একটু যোগ করতে চাই। সেটি হচ্ছে বর্তমান সময়ের এই চিত্র শুধু যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, তা কিন্তু নয়, বরং সব দেশেই এখন এই নৈরাজ্য ছেয়ে গেছে। শিক্ষকরা এখন আর গবেষণার টেবিলে সময় ব্যয় করতে চান না। বরং তারা রাজনৈতিক পরিচয়েই তাদের পদোন্নতি বাগিয়ে নিতে চান বা নিচ্ছেন। যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে আমাদের নতুন গবেষণা করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দেবে। জাতি হিসেবে আমরা হয়ে যাব পঙ্গু। নিত্যনতুন আবিষ্কার থেকে আমরা পিছিয়ে পড়ব। গবেষণার কষ্টকর সময় থেকে আমাদের শিক্ষকরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন।

প্রকৃত শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষকদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি ভেবে দেখার সময় এখন। শুধু পদোন্নতির কথাইবা বলি কেন, শিক্ষক জীবনের পরতে পরতে পড়াশোনা এবং গবেষণা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকার কথা ছিল। বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকার যতই গুণগত শিক্ষার জন্য মরিয়া হোক না কেন, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে না পারলে সরকারের এই যুগোপযোগী প্রচেষ্টা সহসাই আলোর মুখ দেখবে বলে আমার সন্দেহ হয়। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরও গবেষণার ব্যাপারে যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে শিক্ষকরা সহসাই গবেষণার দিকে মুখ ফেরাবেন বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চতর গবেষণার জন্য তাদের কোনো রকম আর্থিক সুবিধা বা পদোন্নতির কোনো নিয়ম যদি থাকত, তাহলেও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার বড় অংশই বেসরকারি শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় শিক্ষকরা এ বিষয়ে মনোযোগ দিতেন বলে আমার বিশ্বাস। গত ২১ অক্টোবর ২০২০ তারিখে উপস্থিত ছিলাম ‘আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা ২০২০’ অনুষ্ঠান আয়োজনের অনলাইন সুধী সংযোগে। সেখানে শিক্ষকদের নিয়ে নানা অভিমতের মধ্যে বর্তমান শিক্ষকদের ছাত্র-ক্লাসপ্রীতির পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রীতির এই বিষয়টি বেশি প্রতীয়মান হলো এবং নিজেও তা প্রতি পদে পদে নিজের জীবন দিয়ে অনুভব করছি। যা সত্যি একজন শিক্ষক হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রতি এ বিষয়ে সুতীক্ষè দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

উপাধ্যক্ষ, উপশহর মহিলা কলেজ, যশোর

 

"