পদ্মের আবেশে বর্ণিল শরৎ

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

মৃণাল সরকার মিলু, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)

চলনবিলে অপরূপ সৌন্দর্য ছড়িয়ে ফুটেছে ফুলের রানি পদ্ম। বিলের জলরাশি যখন স্থির, ঠিক তখনই পদ্ম তার আবির রাঙানো রূপের ডালির পসরা সাজিয়ে বসেছে। পদ্মফুলের বাহারি আবেশে শরতের প্রকৃতি হয়েছে বর্ণিল। পদ্মফুলের এ নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে আসছেন পর্যটক আর প্রকৃতিপ্রেমীরা। রূপবৈচিত্র্য দেখে প্রকাশ করছেন তাদের মুগ্ধতা।

ভাদ্রের মাঝামাঝি সময়ে কলি থেকে ফুল ফোটা শুরু হয়ে এখন আশ্বিনের শুরুতেও তা চলমান। শীত না আসা পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন উদ্ভিদ গবেষকরা। তবে চলনবিলে এ পদ্ম ফুটেছে দীর্ঘ প্রায় চার দশক পরে। হারিয়ে যাওয়া পদ্ম ফিরে আসায় উচ্ছ্বসিত চলনবিলবাসী। শুধু তাড়াশ নয়, পার্শ্ববর্তী গুরুদাসপুর উপজেলার হাঁড়িভাঙা বিলেও ফুটেছে পদ্মফুল। তাড়াশ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মনিরুজ্জান চলনবিল নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, এককালে চলনবিলে হরেক রকম জলজ উদ্ভিদ পাওয়া যেত। বিলের বিভিন্ন প্রান্তরে ফুটে থাকত শাপলা ও পদ্ম। পদ্ম ফোটার সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য মানুষকে আবেগতাড়িত করত। বিলের মানুষ পদ্মপাতায় ভাত খেত। হাট থেকে লবণ, জিলাপি ও গুড় পদ¥পাতায় মুড়িয়ে নিয়ে আসতেন। বিলের জলাধার দিনের পর দিন কমতে থাকায় ধীরে ধীরে চলনবিলের পদ্মফুল হারিয়ে যেতে থাকে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পদ্মফুল জন্মে। এগুলোর বৈশিষ্ট্য অনুসারে দুটি প্রজাতিতে ভাগ করা হয়। এরমধ্যে একটি হচ্ছে এশিয়ান বা ইন্ডিয়ান পদ্ম, অন্যটি হচ্ছে আমেরিকান বা ইয়োলো লোটাস। এশিয়ান পদ্ম আবার দুই রঙে দেখা যায়, একটি মসৃণ সাদা, অপরটি হালকা গোলাপি। আমাদের দেশে যেসব পদ্মফুল দেখতে পাওয়া যায়, সেগুলো এশিয়ান বা ইন্ডিয়ান লোটাস বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবরিনা নাজ। তিনি সম্প্রতি চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার মাগুড়াবিনোদ ইউনিয়নের দোবিলা বিলে ফোটা পদ্মফুল পরিদর্শন করেন। অধ্যাপক সাবরিনা নাজ প্রায় চার দশক পরে চলনবিলে পদ্ম ফিরে আসা প্রসঙ্গে বলেন, পদ্ম একটি বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। পদ্মফুলের একটি পরিপক্ষ বীজ এক হাজার বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। অনুকূল পরিবেশ পেলে সে আবারও বংশ বিস্তার করে থাকে। চলনবিলে ফোটা পদ্মের ক্ষেত্রেও সেটিই হয়েছে।

অধ্যক্ষ এম এ হামিদ রচিত ‘চলনবিলের ইতিকথা’ বই থেকে জানা যায়, ১৮২৭ সালে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলের ওপরের। ১৯০৯ সালে পরিচালিত চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলে জলমগ্ন এলাকা মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটার বলে জানান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম।

চলনবিলের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন নামে ১ হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল। এসব বিলে পদ্ম, শাপলা, মাখনা, সিঙ্গট, গেচু, চেচুয়া, ভাতসোলাসহ বহু প্রজাতির সপুষ্পক ফার্ন, মস ও শৈবাল পাওয়া যেত। এরমধ্যে অনেকগুলোই বিপন্ন এবং বেশ কিছু প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জলবায়ুর পরিবর্তন, রেল ও সড়কপথ নির্মাণ, নদী ও খাল দখল এবং যত্রতত্র অবকাঠামো নির্মাণের ফলে প্রাকৃতিক বিশাল এ জলাধার চলনবিল এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

গবেষকদের অভিমত, পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চলনবিল নিয়ে এখনই ভাবনার সময়। দেশের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে এখনই দরকারি পদক্ষেপ না নিলে হারিয়ে যাবে চলনবিলের অনেক জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী।

 

 

"