মিজান রহমান

  ২৬ নভেম্বর, ২০২০

জোটে জোটে জট

দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক জোটে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা। সব কটি বড় জোটেই প্রধান শরিক দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে ছোট দলগুলোর। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে অনেকটা কোণঠাসা অবস্থায় শরিকরা। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেও বাড়ছে অসন্তোষ। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব মেলাতে পারছে না ওইসব জোটের শরিক দলগুলো। এতে ফাটলও দেখা দিচ্ছে জোটে।

আওয়ামী লীগ ১৪ দলের শরিক দলগুলোর অভিযোগ, টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে দীর্ঘদিনের মিত্রদের একপাশে সরিয়ে রেখেছে ক্ষমতাসীন দল। ওই জোটের মনোনয়ন নিয়ে শরিক বিভিন্ন দল থেকে বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তাদের কারোরই স্থান হয়নি মন্ত্রিসভায়। এর আগের মন্ত্রিসভায় শরিক দলের কয়েকজন নেতাকে রাখা হলেও এবার নেওয়া হয়নি কাউকেই। তারা এখন সরকারি দলে নাকি বিরোধী দলে তাও ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারছেন না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও চলছে ভাঙাগড়ার খেলা। বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগে ঐক্যফ্রন্ট গড়ে উঠতে না উঠতেই সটকে পড়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। পরে ভাঙন দেখা দেয় আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলে (জেএসডি)। সর্বশেষ ভাঙনের মুখে পড়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক দল গণফোরাম। দলটির একাংশ আগামী ডিসেম্বরে কাউন্সিল আহ্বান করেছে, যাতে ড. কামাল হোসেনের সায় নেই।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ও রাজনীতি-বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘দেশে এখন রাজনীতি নেই। রাজনীতির প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কোনো দল বা জোট ভাঙল নাকি জোড়া লাগল, তাতে কিছু যায় আসে না।’

সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ১৪ দলকে আরো বেশি সক্রিয় ও ঐক্যবদ্ধ করার পরমর্শ দিচ্ছে জোটের শরিক দলগুলো। তবে তাতে খুব বেশি সাড়া দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমুকে ১৪ দলের মুখপাত্র ও সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়ার পরও অনেকটাই নিষ্ক্রিয় এ জোট। সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বৃদ্ধি, নারী ধর্ষণসহ বেশ কিছু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ দলের ঐক্য ও সক্রিয়তা বাড়ানোর দাবি উঠলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তেমন সাড়া মিলছে না।

দীর্ঘদিন পর গত ৪ নভেম্বর জেলহত্যা দিবসের এক ভার্চুয়াল আলোচনায় অংশ নেন ১৪ দলের শরিক দলগুলোর নেতারা। সেখানে জেলহত্যা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি অনেকেই সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের দৃষ্টি অকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। ১৪ দলকে সক্রিয় করার প্রস্তাব দেন তারা। জোটের শীর্ষ নেতার সঙ্গে দ্রুত বৈঠক আয়োজনেরও তাগিদ দেন। কিন্তু বাস্তবে তা কাজে আসেনি।

১৪ দলের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি ওই সভায় বলেছিলেন, ‘শুধু প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে নয়, জনগণের ওপর নির্ভর করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু যেখানে নির্ভর করেছিলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রীও জনগণের ওপর নির্ভর করে যাচ্ছেন। আমাদের তৃণমূলের জনগণের আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ করে এ উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বিষয়গুলো নিয়ে একেবারেই গুরুত্ব দিচ্ছে না। আমরা জানি না তারা কেন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।’

আগামী দিনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণের জন্য দ্রুত জোটপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪ দলের শরিকদের বৈঠক আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছিলেন গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহদাত হোসেন। গত ৪ নভেম্বর আলোচনায় এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘যে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য নিয়ে ১৪-দলীয় জোট গঠন করা হয়েছিল, তার অনেক সফলতা আছে; একই সঙ্গে ব্যর্থতাও আছে। বিশেষ করে করোনার মধ্যে দলগতভাবে প্রত্যেকের কর্মসূচি চালিয়ে গেলেও জোটগতভাবে আমরা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি। এ ছাড়া আগামী দিনে আমরা কীভাবে অগ্রসর হব, সেটা এখনই নির্ধারণ করা উচিত। এজন্য দ্রুত আমাদের জোটনেত্রীর সঙ্গে বসা উচিত। কারণ, আমরা বুঝতে পারছি না আওয়ামী লীগ কী করতে চায়, তারা আসলে কী ভাবছে? এসব বিষয় নিয়ে দ্রুত নিজেদের মধ্যে আলোচনা হওয়া উচিত। আমরা বিষয়গুলো নিয়ে তাগিদ দিচ্ছি, জানি না আওয়ামী লীগ গুরুত্ব দিচ্ছে কি না।’

স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সাত-দলীয় জোট গড়ে উঠেছিল বিএনপির নেতৃত্বে। অনেক ভাঙাগড়ার পর নতুন করে চারদলীয় জোট গঠিত হয় ১৯৯৯ সালে। তার পর ১৮-দলীয় জোট এবং সর্বশেষ কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ও সাম্যবাদী দলের একাংশ নিয়ে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল গঠিত হয় ২০-দলীয় জোট। এগুলোর মধ্যে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত মাত্র আটটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘রাজনীতিতে জোট গঠন ও ভাঙাগড়া চলমান ঘটনা। পাকিস্তান আমল থেকে আজ পর্যন্ত নানা সময়ে মূলত আন্দোলন ও নির্বাচন কেন্দ্র করে জোট হয়েছে। তবে নির্বাচন শেষে সেই জোট ভেঙে যেতে পারে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয়ক মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, সব দলেই কিছু নেতা চলে যান আবার অনেকে যোগ দেন। এটিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখতে হবে।

২০-দলীয় জোটের শরিক কল্যাণ পার্টির মহাসচিব মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, ‘যারা দল ভাঙতে উসকানি দেয় বা প্রলোভন দেখায়, তারাও মন্দ কাজ করে। ২০-দলীয় জোটে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য শুভ হিসেবে দেখছি না। মন্দ লোকরা এর সুযোগ নেয়।’

এদিকে নির্বাচনের পর নানা ইস্যুতে বিকল্পধারার নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। যুক্তফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া বলেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করার জন্যই আমাদের রাজনীতি। শুধু সরকারের তোষামোদ করার রাজনীতি নয়। গত ছয় মাসে সরকারের নানা ভুল ও দুর্নীতি নিয়ে দলগতভাবে আমরা কথা বললেও জোটগতভাবে কিছুই করিনি।’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গনে আমাদের অবস্থানটা কোথায়, এটা অবশ্যই পরিষ্কার করতে হবে। নইলে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।’

পিডিএসও/হেলাল

জট,জোট,আওয়ামী লীগ,রাজনীতি
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়