শোকাবহ আগস্ট

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন গড়েছিল জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২০, ০৮:০০ | আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২০, ১১:৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্র ছিল কোমলে কঠোরে মেশানো, যার ছিল জাদুকরী আকর্ষণীয় ক্ষমতা। আর এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছিল তার মনের অভাবনীয় শক্তি এবং আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা। বঙ্গবন্ধু চরিত্রগতভাবে জাতীয়তাবাদী, আচরণগতভাবে গণতান্ত্রিক, বিশ্বাসে সমাজতান্ত্রিক এবং প্রত্যয়গতভাবে অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। তিনি নিছকই একজন ব্যক্তি নন, মূলত তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন, একটি বিপ্লব এবং একটি উত্থান। খুনিরা মহান নেতার চমৎকার উত্তরাধিকার-পুনরুজ্জীবিত বাঙালি জাতিকে শেষ করতে পারেনি। তিনি বাঙালি জাতিকে পথ দেখিয়েছেন আর তার স্বপ্নগুলো হয়ে উঠেছে একটি জাতির অস্তিত্বের ভিত্তি।

কৈশোর থেকেই তিনি তেজস্বী, দৃঢ়চেতা, অভীষ্ট সাধনে কৃতসংকল্প। ক্যারিশমা তো ছিলই। ১৯৩৮ সালে বয়স যখন ১৮ বছর, বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মহকুমা শহর গোপালগঞ্জে এলে তিনি নির্ভীকচিত্তে তাদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বিদ্যালয়ের সমস্যা তুলে ধরেন, আদায় করেন দাবি। এ সফরের সময়েই ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ গঠনের বিষয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তার আলোচনা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই সরাসরি যোগাযোগ, চিঠিপত্রের আদানপ্রদানও চলতে থাকে। এই বয়সেই তার প্রথম জেলজীবনের অভিজ্ঞতা ঘটে। কিন্তু কিছুতেই তিনি দমে যাননি।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করা এবং একইসঙ্গে জনকল্যাণ, এই লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি তিনি কলেজে পড়াশোনার জন্য যান কলিকাতা, ১৯৪২ সালে ভর্তি হন ইসলামিয়া কলেজে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় লঙ্গরখানা পরিচালনার কাজেও নিজেকে সঁপেছিলেন তিনি। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে তিনি শান্তি স্থাপনের পাশাপাশি সক্রিয় রিলিফ ক্যাম্প পরিচালনায়।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাস খানেকের মধ্যেই তিনি কলিকাতাকে বিদায় জানিয়ে ঢাকায় চলে আসেন, ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগে। সেই বয়সেই বুঝতে সমস্যা হয়নি যে পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব বাংলার বাঙালিদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দমিয়ে রাখতে সক্রিয়। এজন্য মিথ্যাচার এবং ধর্মের অপব্যহার করতেও তারা দ্বিধা নেই। তিনি এ অন্যায় রুখে দাঁড়াতে উদ্যোগী হলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাড়ে চার মাসের মধ্যে গড়ে তোলেন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক হাতিয়ার ছাত্রলীগ। এর দেড় বছরের কম সময়ের মধ্যে মওলানা আবদুল খান ভাসানীকে সভাপতি নির্বাচিত করে প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগেরও তিনি প্রাণপুরুষ।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগ মাত্র ২ মাস ৭ দিনের মাথায় নেতৃত্ব দেয় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ডাকা ১১ মার্চের হরতালে। এ দিন বিপুলসংখ্যক ছাত্র নেতাকর্মীর সঙ্গে গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান, যা ছিল পাকিস্তান আমলে তার জেলজীবনের প্রথম। এই কারাগারেই তার কাছে হাজির হন চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী, কলিকাতায় ছাত্র আন্দোলন করার সময় যার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা।

‘সিক্রেট ডকুমেনটস অব ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি ন্যাশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ এর প্রথম খণ্ডে বলা হয়েছে, ‘ফজলুল কাদের চৌধুরী ৯ মে (১৯৪৯) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের ছাত্র ও মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময়ে শেখ মুজিবকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আপস করার প্রস্তাব দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ক্ষমা চাইতেও রাজি হননি। তার মতে, ছাত্ররা এমন কোনো অন্যায় করেনি যে জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। তারপরও ফজলুল কাদের চৌধুরী আপসের জন্য পীড়াপীড়ি করলে শেখ মুজিব চারটি শর্ত উপস্থাপন করেন, সব ছাত্রছাত্রীর শাস্তি প্রত্যাহার, এ ঘটনায় আটক ছাত্রদের মুক্তি, নতুন করে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া এবং সংবাদপত্রে খবর প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করায় তার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু জীবনের যে পাঠ তিনি গ্রহণ করেছেন মাতৃভূমির প্রতি, জনগণের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধ থেকে, সেটাই তাকে সংকল্পবদ্ধ করে তোলে। তিনি শপথ নেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ছাত্র হিসেবে না হলেও আমি আবার ফিরে আসব।’

পিডিএসও/হেলাল