অনলাইন ডেস্ক
  ২৫ নভেম্বর, ২০২০

৩১ বছরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৯১ সালের ২৫ নভেম্বর মাত্র ৪টি ডিসিপ্লিন এবং ৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে দক্ষিণবঙ্গের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি)। এরপরে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলে কেটে গেছে তিন দশক, আজ ৩১ বছরে পা দিয়েছে খুবি। তবে, সুদীর্র্ঘ এই যাত্রায় অপ্রাপ্তির চেয়ে প্রাপ্তির ঝুড়িই বেশি ভারি।

নেই ছাত্র রাজনীতি, নেই সেশনজট
শিক্ষা কার্যক্রম চালুর পর থেকে খুবিতে সন্ত্রাস ও ছাত্র রাজনীতিমুক্ত পরিবেশের ধারা এখনো অব্যাহত আছে। রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কবলে এই ক্যাম্পাসে কখনো কোনো ছাত্রের শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত ঝরেনি। প্রশাসনিক ভবন থেকে শুরু করে একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, ক্যাফেটেরিয়া- কোথাও দেয়ালে লেখা নেই কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের স্লোগান, সাঁটানো নেই কোনো পোস্টার। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে যেখানে মিছিলে না গেলে সিট হয় না, সেখানে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাক্রম এবং আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় সিট বরাদ্দ দেয়া হয়।

খুবিতে একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী যথাসময়ে ক্লাস, পরীক্ষা এবং ফল প্রকাশিত হয়ে থাকে। সব ডিসিপ্লিনে একসাথে বছরের প্রথম সেমিস্টারের ক্লাস পহেলা জানুয়ারি শুরু হয়ে ৩০ জুনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশিত হয়। আবার, দ্বিতীয় সেমিস্টারের ক্লাস পহেলা জুলাই শুরু হয়ে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ফলাফল প্রকাশিত হয়। তাই, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সেশনজটের ভোগান্তিতে পড়তে হয় না। 

বিদেশি শিক্ষার্থীদের টানছে খুবি
শিক্ষার মান, পরিবেশ ও সুখ্যাতির জন্য খুবি বিদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রমের প্রথম দিকেই জায়গা করে নিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে নেপাল, মালদ্বীপ, ভুটানসহ আরও কিছু দেশ থেকে বিভিন্ন সেশনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, এমফিল এবং পিএইচডি পর্যায়ে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে খুবিতে ১৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন। খুবির বন্ধুত্বপূর্ণ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সুবাদে তারা খুব সহজেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পেরেছেন।

বারো মাসে তেরো পার্বনের খুবি
সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ ও সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য এখানে ২২টিরও অধিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো খুবিতে নিয়মিত এই সংগঠনগুলোর কার্যক্রম লেগেই থাকে। এসকল সংগঠনগুলোতে গান, নাচ, আবৃত্তি, ফোটোগ্রাফি, সাংবাদিকতা, পথশিশুদের শিক্ষাদান, পাঠচক্র, সমাজসেবামূলক নানা কার্যক্রম চর্চা করা হয়। এখান থেকেই শিক্ষার্থীদের সাংগঠনিক নেতৃত্বের সাথে সাথে ব্যক্তিগত গুণাবলীর বিকাশ ঘটতে থাকে। খুবি শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের সবথেকে বড় শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠান (র‌্যাগ ডে) পালন করে । তিন দিনব্যাপী আয়োজনে খুলনার সবচেয়ে বড় কনসার্ট হয় এখানে। এছাড়া পিঠা উৎসব, বাউল উৎসব, ক্যাফে আনপ্লাগড, শিক্ষা মেলাসহ বছরব্যাপী নানা আয়োজনে মেতে থাকে খুবি ।

এ বিষয়ে ‘বাঁধন-খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট’ এর সভাপতি নিলয় সরকার বলেন, ‘করোনাকালেও কিন্তু আমাদের কার্যক্রম থেমে নেই। এই বছরও বন্যা কবলিত এলাকায় মানুষের সাহায্যে ছুটে গিয়েছে বাঁধন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, তাও বিগত ৭ মাসে চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিদিন আমরা কমপক্ষে ১৫-২০ ব্যাগ কিংবা তার চেয়েও বেশি সংখ্যক ব্লাড যোগাড় করে দিয়েছি।’

করোনাকালে মানবিক খুবি
করোনা ভাইরাসের বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে দেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক আবেদনে সাড়া দিয়ে ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে স্বেচ্ছায় ১৫ লাখ টাকা দান করেছে খুবি। ৯ মে খুবি স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ (স্বাশিপ) আরও এক লাখ টাকা ওই তহবিলে জমা দেয়। এছাড়াও এই সংকট মোকাবিলায় সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (কুয়া), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (কুটা), হেল্প স্কোয়াড খুলনা, ভলান্টিয়ার অ্যাগেইনস্ট কন্টাজিউন (ভিএসি), বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, প্রবাসে অবস্থানরত শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তিপর্যায়ে অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধ্যমতো এগিয়ে এসেছেন। এ বছর ক্যাম্পাস ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যাধুনিক রিয়েল টাইম আরটি পিসিআর মেশিন প্রতিস্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

করোনাকালে আর্থিকভাবে তুলনামূলক দুর্বল শিক্ষার্থীদের ভার্চুয়াল শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রতি ডিসিপ্লিনে ১৪ জন করে শিক্ষার্থীকে ৫ হাজার টাকা করে বিনা সুদে ঋণ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি, মুঠোফোন অপারেটর কোম্পানী গ্রামীনফোনের সাথে চুক্তির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট ডেটা প্রাপ্যতা নিশ্চিত করেছে। 

শিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে গেছে খুবি
বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দি সুন্দরবনসকে (সিআইএসএস) ইনস্টিটিউট ফর ইন্টিগ্রেটেড স্টাডিজ অন দ্য সুন্দরবনস এন্ড কোস্টাল ইকোসিস্টেম (আইআইএসএসসিই) এ রূপান্তর করা হয়েছে। এছাড়া, রিসার্চ সেল, মডার্ণ ল্যাংগুয়েজ সেন্টার ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডিজ শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। 

খুবির সাথে জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়, নেপালের কেআইএএস বিশ্ববিদ্যালয়, সারওয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের মেকানিকাল বিভাগ মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (এলআইপিআই) এর বায়োমেটিরিয়ালস সেন্টার এবং  জার্মানির স্টুটগার্টস ইউনিভার্সিটির সাথে শিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটি ও লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির সাথে যৌথ গবেষণা প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ সুবিধার্থে ইতোমধ্যে ইন্টারন্যাশনাল অফিস চালু হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীত জ্ঞান যাতে বাস্তবে কাজে লাগানো যায় এবং সেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে কলামে প্রশিক্ষণ হয় সে জন্য বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের রাইঙ্গামারি গ্রামকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি ভিলেজ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে গবেষণা কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশে প্রথম কৃষি ফসলের বর্জ্য দিয়ে পার্টিকেল বোর্ড খুবিতে উদ্ভাবন করা হয়েছে। সম্প্রতি, খুবির গবেষকেরা সহজলভ্য জলজ আগাছা ‘কচুরিপানা’ হতে কারুশিল্পের কাগজ তৈরীর পন্থা উদ্ভাবন করেছেন।

বিজ্ঞান ও গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত সিমাগো-স্কপাসের ২০২০ সালের ইনস্টিটিউশনস র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের মধ্যে সার্বিক ক্যাটাগরিতে খুবি টানা দুই বছর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। উদ্ভাবনী ক্যাটাগরিতে গত বছরের চেয়ে ২৮ ধাপ এগিয়ে বৈশ্বিক ৪২১ তম স্থানে এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে খুবি।

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে পরিচালিত এ অন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় খুবি প্রথমবার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মধ্যে উদ্ভাবনীতে প্রথম, গবেষণায় দ্বিতীয় এবং সামাজিক গবেষণায় ৬ষ্ঠ স্থান লাভ করে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সাইটেশনের ভিত্তিতে বিশ্বসেরা এক লাখ ৬১ হাজার বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের ৫৬ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে খুবির ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষক অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম স্থান পেয়েছেন।

সব ডিসিপ্লিনের পর্যাপ্ত ক্লাসরুম নেই; নেই পর্যাপ্ত ল্যাবের সুবিধা
বর্তমানে খুবিতে ৮টি স্কুল (অনুষদ) রয়েছে। এখানে মোট ২৯টি ডিসিপ্লিনে (বিভাগ) শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু অপেক্ষাকৃত নতুন ডিসিপ্লিনগুলো ক্লাসরুম এবং ল্যাব সুবিধার সংকটে পড়েছে, ভোগান্তি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তত ৫টি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরাই ক্লাসরুম সংকটে ভুগছেন।

এ বিষয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী ইশরাত রেজওয়ানা তিশা বলেন, ‘আমাদের বিষয়টি অন্যান্য যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয় তারা সবাই কমবেশি ল্যাবে হাতে কলমে কাজ শিখতে পেরেছে। স্নাতক শেষ হয়ে গেলেও আমরা এখনো এই সুবিধা পেলাম না।’

টিএসসি নেই খুবিতে; আবাসন সংকটে ভোগে শিক্ষার্থীরা
তিন দশক পেরিয়ে এলেও খুবিতে কোনো টিএসসি তৈরী হয়ে ওঠেনি। খুবির ভাস্কর্য অদম্য বাংলার ডান পাশের চা-সিঙ্গারার ঝুপড়ি দোকানগুলোতেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আড্ডা দেয়। শিক্ষার্থী সংখ্যার তুলনায় এই ঝুপড়ি দোকানগুলোও অপ্রতুল বিধায় শিক্ষার্থীদের একাংশ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর রোডের দোকানগুলোতে ভিড় জমায়। তাই, ‘টিএসসি’ এখনো খুবি শিক্ষার্থীদের একটি আক্ষেপের জায়গা।

বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই স্নাতক পর্যায়ের দুই বছর পার করে আসার আগে আবাসিক হলে উঠতে পারেন না। এমনকি,  তৃতীয় বছরে এসেও হলে সিট হয়নি এমন শিক্ষার্থীও আছে। শিক্ষার্থী সংখ্যার তুলনায় আবাসিক হলে সিটের পরিমান একেবারেই অপ্রতুল। ফলে, আবাসন সংকটে ভুগতে হয় শিক্ষার্থীদের।

ক্লাসরুম, ল্যাব ও টিএসসি সম্পর্কে ছাত্র বিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. শরীফ হাসান লিমন বলেন, ‘অপেক্ষাকৃত নতুন ডিসিপ্লিনগুলোতে ক্লাসরুম ও ল্যাব সংকট রয়েছে। আমি কেন্দ্রীয় বৈঠকে বিষয়গুলো উত্থাপন করেছি। আশা করছি, দ্রুতই এই সমস্যাগুলোর সমাধান হয়ে যাবে। এছাড়া, টিএসসি নির্মাণের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

পিডিএসও/এসএম শামীম

খুলনা,বিশ্ববিদ্যালয়
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়