জান্নাতুন নিসা

  ০৭ জুন, ২০২১

মুজিবপাঠ : প্রজন্মের প্রত্যাশা

অনন্তের পথে ছুটে চলা বিশ্বজয়ী মানুষ সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই শিল্পীত সময়ের ইতিহাস আঁকড়ে ধরেছে। আর আনুভূমিক কৌতূহলের সমকোণে দাঁড়িয়েই শিক্ষার পূর্ণতায় খুঁজে নিয়েছে আপন পথ। তবে দিগন্তের দেয়ালে লেপ্টে থেকে মূলত শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়েছিল বোধকরি। তাই বুঝি সমাজ উন্নয়নে প্রবীণদের দ্বারা নবীনদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে তা প্রস্ফুটিত হয়েছিল যুগের বুকে। প্রাক-শিক্ষিত সমাজ প্রথমত মৌখিকভাবে এবং পরে অনুকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। গল্প-বলার মাধ্যমে তারা জ্ঞান, মূল্যবোধ এবং দক্ষতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে স্থানান্তরিত করত। তবে সাংস্কৃতিক দক্ষতা যেমন প্রসারিত হয় অনুকরণের মাধ্যমে তেমনি জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি বিস্তৃত হয় আনুষ্ঠানিক শিক্ষা উন্নত করার মাধ্যমে। তাই উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতিকে নিয়ে যায় শূন্য থেকে শিকড়ে।

আমরা জানি, শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা ও কাঙ্ক্ষিত আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে একটি দক্ষ, দেশপ্রেমিক, আত্মনির্ভরশীল, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন, শ্রমনিষ্ঠ সুনাগরিক জনগোষ্ঠী গড়ে তোলাই শিক্ষার লক্ষ্য। এই শিক্ষা প্রসঙ্গে সক্রেটিস বলেন, শিক্ষা হলো মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, শিক্ষা হলো তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্বসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে। তাই শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যপুস্তকের গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থাৎ প্রতিটি শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয় নির্ধারণ এবং পাঠ্যবইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সর্বস্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে সামাজিক, মানবীয় এবং নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরসহ শিক্ষার প্রতিটি স্তরের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচিতে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, চেতনা ও সঠিক ইতিহাস এবং দেশে বিরাজমান পারিপার্শিকতা, মাতৃভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতিফলন ঘটে থাকে। এ প্রসঙ্গে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা চাই আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি এমন হউক যাহা আমাদের জীবনীশক্তিতে ক্রমেই সজাগ, জীবন্ত করিয়া তুলিবে। (নজরুল রচনাবলি, ১ম খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৬, পৃ. ৮৪৪)।

যেকোনো স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা, অনুসন্ধিৎসা ও মেধার উন্নয়নে পাঠ্যবইয়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। আর বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জন এবং এর আলোকে পাঠ্যপুস্তকসমূহ ও অন্যান্য শিখন কিংবা শেখানো সামগ্রী উন্নয়ন ও প্রকাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড যা এনসিটিবি নামে বহুল পরিচিত। এটি বাংলাদেশের প্রাক-প্রাথমিক হতে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সবস্তরের শিক্ষার্থীর পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, উন্নয়ন এবং মুদ্রণ করে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছে দেয়। তবে পাঠ্যপুস্তকে বিষয় নির্ধারণ কিংবা অধ্যায় পরিবর্তন-পরিমার্জনে সরকার কিংবা আমলাতান্ত্রিক যোগসাজশে নির্ভর করতে হচ্ছে আমাদের। বর্তমানে এই অবস্থা প্রজন্মের জন্য আরো মারাত্মক রূপ ধারণ করছে। কারণ ধর্মীয় কিংবা সাম্প্রদায়িক বুনিয়াদ যেনো বর্তমান পাঠ্যপুস্তকের নির্ধারিত অংশ হয়ে উঠছে। আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ। তাই বিশ্বব্যাপী তাদের সুস্থ বিচরণের জন্য দাঙ্গা-হাঙ্গামার সূত্র নয়, বরং সঠিক ইতিহাস সম্বলিত পাঠ্যবই কিংবা বিষয় নির্ধারণের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক পথ সৃষ্টি করে যেতে হবে আমাদের। নয়তো কালের আয়নায় নিজেদের বীভৎস অথচ ঐতিহাসিক মুখখানি দেখে শিহরিত হয়ে উঠতে হবে।

সম্প্রতি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পাঠ্যবইয়ের বিষয়, এমনকি শব্দও পরিবর্তন করা হয়। এ ছাড়া পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে কমিটি করা হয়, সেখানে ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শের সমমনা লোকজনকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। অথচ দল-মতের ঊর্ধ্বে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, যে মহান নেতা বাঙালি জাতীয়তাবোধের চেতনায় সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে মুক্তির দিশা দেখিয়েছেন যার একটিমাত্র অঙ্গুলি হেলনে সেই নেতা থেকে বিশ্বের বিস্ময় আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আন্দোলন, সংগ্রাম, ত্যাগ, ভালোবাসা, দেশপ্রেমের কথা কখনোই আমরা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির কথা ভাবিনি। হয়তো ভাবতেও চাইনি, জানতে কিংবা অজান্তে। অথচ বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষে প্রজন্মের চাওয়া নেতা থেকে বঙ্গবন্ধুকে জানা, বিশ্ববন্ধু থেকে ব্যক্তি মুজিবকে জানা। তাই প্রজন্মের একজন কাণ্ডারি হয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকারের কাছে প্রত্যাশা বৈশ্বিক মহামারিকালীন ক্রান্তি শেষে আগত নতুন ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’তে বঙ্গবন্ধুর জীবনী কিংবা জীবনীর কোনো অংশ নয়, স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে আরো অনেক বিষয়ের সঙ্গে প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যতালিকায় কৃষি, পরিবেশ, শারীরিক শিক্ষা, চারু-কারুকলা, আইসিটির মতো বিষয়ের পাশাপাশি ‘মুজিবপাঠ’ (৫০ কিংবা ১০০ নাম্বারের পরীক্ষার মাধ্যমে) অন্তর্ভুক্তির।

‘মুজিবপাঠ’ পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তিকরণের ফলে আমাদের প্রজন্ম একদিকে যেমন বাঙালি চেতনা, বাঙালি সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, জাতির পিতা এবং দেশপ্রেমের বিষয়ে সঠিক ইতিহাস সম্বলিত পাঠ গ্রহণের মাধ্যমে সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারবে বিশ্বদরবারে। তেমনি শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের ফল হিসেবে দক্ষ জনসম্পদে নিজেদের রূপান্তর করে নেতৃত্বের সঠিক নির্দেশনায় পথ হাঁটতে পারবে। কারণ ইতিহাস বিকৃত করে কেউ যেমন টিকে থাকে না, তেমনি ইতিহাস বিকৃতকারীকে ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে না। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রজন্মের কাছে ‘মুজিবপাঠ’ নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতিতে ‘মুজিবপাঠ’ অন্তর্ভুক্তি মুজিববর্ষে প্রজন্মের জন্য তার চেয়ে বহুগুণ আলোকিত প্রাপ্তি হয়ে থাকবে।

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মুজিবপাঠ,প্রজন্ম,বঙ্গবন্ধু
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close