গাজী শাহনেওয়াজ

  ০১ ডিসেম্বর, ২০২৩

সুরক্ষাহীন যৌনতায় দেশে এইডস রোগী বাড়ছে

সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বাড়ছে এইডস রোগীর সংখ্যা। প্রতি বছর এই রোগে দেশেই মারা যাচ্ছে সহস্রাধিক মানুষ। দেশের ভিন্ন স্থানে কমবেশি এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেশি পাওয়া যাচ্ছে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। এর মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া (রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ক্যাম্প), খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা। নাগরিকদের মধ্যে সচেতনার অভাব, একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির শরীরে প্রবেশ করানো, অবাধ যৌন মিলনে সুরক্ষা ব্যবস্থা বা পদ্ধতি অনুসরণ না করা এইডস সংক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ। এছাড়া নেশা জাতীয় ইনজেকশন থেকেও এইডসের ঝুঁকি বাড়ছে। সরকারি বেসরকারি সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। আজ বিশ্ব এইডস দিবস।

সাধারণ মানুষকে এই মরণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য কিছু সচেতনামূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে মানুষের মধ্যে এর প্রভাব পড়ছে না।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, এইচআইভি পজিটিভ হওয়া মানেই এইডস হওয়া নয়। এটা সুচিকিৎসায় ভালো হওয়া সম্ভব। কিন্তু যদি কারো এইচআইভি পজিটিভ থেকে এইডস রোগে আক্রান্ত হন তাহলে মৃত্যু অনিবার্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যশোরে এইচআইভি (এইডস) শনাক্তের সংখ্যা বেশ উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে যশোরে ৫ হাজার ৬৪০ জনের পরীক্ষা করে পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ১০ জন। আর এই সময়ে চারজন মারা গেছেন, যার মধ্যে নারী তিনজন এবং পুরুষ একজন। সম্প্রতি ছিন্নমূল মানব কল্যাণ সোসাইটির গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

সেমিনারে ছিন্নমূল মানব কল্যাণ সোসাইটির সাব ডিআইসি ইনচার্জ মিলন মন্ডল এ প্রসঙ্গে জানান, ২০২২ সাল নাগাদ গোটা দেশে ৯ হাজার ৭০৮ জন এইআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত; যার মধ্যে ২০২২ সালেই আক্রান্ত হয়েছে ৯৪৭ জন। এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৮২০ জন, যার মধ্যে ২০২২ সালেই মারা গেছে ২৩২ জন। তিনি জানান, তারা পাঁচটি বিভাগের ১৯ জেলায় তাদের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার মধ্যে খুলনা বিভাগের যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

প্রযুক্তির এই যুগে এইডস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ কি জানতে চাইলে যশোরের সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কুমার বিশ্বাস প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, যেহেতু বর্ডার এলাকা অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বর্ডার বাংলাদেশের যশোর স্থলবন্দর এলাকা। যেখান দিয়ে দেশের ৮০ শতাংশ পণ্য ভারত থেকে আসে। সেইসঙ্গে প্রচুর ট্রাক ড্রাইভার, হেলপারসহ পরিবহন শ্রমিকদের আসা-যাওয়া হয়। এখানে রয়েছে একটি বড় রেলওয়ে স্টেশন এবং যশোর থেকে ১৮টি রুটে দেশের বিভিন্ন জেলায় যাওয়া-আসা করা যায়। সে কারণে এই জেলা এইডসের জন্য খুবই অ্যালার্মিং। এছাড়া এইডস রোগের বিষয়ে কেউ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। এছাড়া অনেক মানুষ ছয় মাস ভারতে থেকে চলে আসেন। যাদের বড় একটি অংশ দেহ-ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই সম্পর্কবহির্ভূতভাবে মহিলা-পুরুষ অবাধ মেলামেশা করছে। এতে নিজে যেমন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে; একই সঙ্গে পরিবারকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এ বিষয়ে সচেতনা বাড়ানো দরকার।

যশোরের মতো সিরাজগঞ্জেও বাড়ছে এইচআইভি পজিটিভ রোগীর সংখ্যা। জেলায় ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮১ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা শতাধিক।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইনজেকটিভ ড্রাগ ব্যবহারকারীরাই বেশি পজিটিভ হচ্ছে। নিষিদ্ধ নেশা জাতীয় ইনজেকশনের মাধ্যমে এই রোগ বেশি ছড়াচ্ছে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতলের তথ্য মতে, জেলায় ১৬০০ এইচআইভি পরীক্ষায় শতকরা ১৮ ভাগ মানুষ পজিটিভ হচ্ছে। আর পজিটিভ রোগীদের মধ্যে বেশির ভাগই ইনজেকটিভ ড্রাগ ব্যবহারকারী। নেশা জাতীয় এসব ইনজেকশন গ্রহণের সুই বা সিরিঞ্জ একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করে। শনাক্ত হওয়া মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগ মাদক গ্রহণকারী।

জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. রাম পদ রায় প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, মানুষের মধ্যে অসচেতনা একটি কারণ। এ ছাড়া আমরা এইআইভি পজিটিভ যেসব রোগী পারছি তাদের বেশির ভাগ বলা যায়, অনিরাপদ যৌন মিলনের কারণে। একই সিরিঞ্জ বার বার ব্যবহার হচ্ছে এ থেকেও এইচআইভিতে আক্রান্ত হচ্ছে। আবার তৃতীয় লিঙ্গের কারণে এইডস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে কেউ কেউ। এই চিকিৎসক বলেন, কুসংস্কার থেকেও কিছু মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে কিছু বদ্ধমূল ধারণা জন্মিয়েছে, তারা মনে করেন এইচআইভি পজিটিভ মানেই এইডস হয়েছে তার। কিন্তু সেটাতো না। পজিটিভ হলে চিকিৎসায় ভালো হয়। কিন্তু এইডস হলে মৃত্যু অনিবার্য।

এদিকে, যশোর, সিরাজগঞ্জের মতো খুলনা বিভাগও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এইডস রোগী। বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে খুলনাঞ্চল। গত মে মাস পর্যন্ত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যান্টি রেক্ট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টারে ৪২ জনের নমুনায় এইচআইভির জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্ত হয়েছে খুলনা জেলায়। একই সময়ে এ রোগে মৃত্যু হয়েছে ১৫ জনের। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ও এআরটি সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. দীপ কুমার দাশ বলেন, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় খুলনা অঞ্চলে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে সমুদ্র ও স্থল সীমান্ত অতিক্রম করে প্রবেশকারীদের রক্ত পরীক্ষা না করা, নিষিদ্ধপল্লী ও ভাসমান যৌনকর্মীদের নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকা, যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহারে অনীহার কারণে এ পরিস্থিতি জটিল রূপ নিচ্ছে। শুধু অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের জন্য এইচআইভি আক্রান্ত হয় বিষয়টি তেমন নয় বলে জানান ওই চিকিৎসক।

এছাড়া কয়েক মাস আগে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে উত্থাপিত এক প্রতিবেদনের তথ্য থেকে জানা গেছে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা এলাকায় এইচআইভি/এইডস, হেপাটাইটিস সি ও ডিপথেরিয়া রোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব রোগে এখনো পর্যন্ত ৭১০ জন শনাক্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৬১২ জনই রোহিঙ্গা। এর মধ্যে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬১ রোহিঙ্গা এইচআইভি/এইডসে মারা গেছেন। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন ৯৫ শিশু জন্মগ্রহণ করে। ২০২৫ সালে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ১২ থেকে ১৩ লাখ পর্যন্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারে বিভিন্ন হোটেলে পাঁচ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নারী দেহ ব্যবসায় সক্রিয় রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

আজ বিশ্ব এইডস দিবস

আজ ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস। বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি সরকারিভাবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে নিয়ন্ত্রিতভাবে এই দিবসটি সীমিত পরিসরে উদযাপন করা হবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

পিডিএস/মীর

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
বিশ্ব এইডস দিবস
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close