প্রাচীন লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিন

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০২০, ১৪:৫৫ | আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২০, ১৫:১৯

আল-আমিন মিয়া, পলাশ (নরসিংদী)

নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় অবস্থিত শত বছরের পুরোনো জমিদার বাড়িটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিপুণ কারুকাজ বেষ্টিত বাড়িটি নির্মাণ করেন মোগল আমলের লক্ষণ সাহা নামে এক জমিদার। পূর্ণাঙ্গ শৈল্পিক ২৪ কক্ষবিশিষ্ট এই জমিদার বাড়ির পাশেই রয়েছে ছোট্ট আরেকটি কারুকার্য খচিত মন্দির, রয়েছে অর্ধনির্মিত প্রাচীন বাড়ি। বাড়ির পেছনে রয়েছে গাছের বাগান। বাড়িসহ বাগানের চারদিক উঁচু প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত। রয়েছে সেই সময় তৈরি করা জমিদার বাড়ির সুন্দর পুকুর আর সান বাঁধানো পুকুর ঘাট। পুকুরের পাশে পূঁজা করার জন্যে রয়েছে বড় আকারের মোড। 

প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে প্রাচীনতম লক্ষণ সাহার এই জমিদার বাড়িটি দেখতে হাজারও মানুষ এসে ভিড় করেন জয়নগর গ্রামে। বিশাল আকৃতির এই জমিদার বাড়ির বর্তমান মালিকানায় রয়েছেন আহম্মদ আলী নামে এক উকিল। যার কারণে এই বাড়িটি উকিলের বাড়ি নামেও পরিচিত। 

সরেজমিন স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর জমিদার লক্ষণ সাহার নাতি বৌদ্ধ নারায়ন সাহা জমিদারের রেখে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি আহম্মদ আলীর কাছে বিক্রি করে বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলায় চলে যান। আহম্মদ আলী স্ত্রীর নাম অনুসারে বাড়িটির নাম পরিবর্তন করে জামিনা মহল নামে নামকরণ করেন। মূলত আহম্মদ আলী সাহেব উকালতি পেশার সাথে সংযুক্ত ছিলেন বিধায় বর্তমানে এই জমিদার বাড়িটি উকিলের বাড়ি হিসেবেই বেশি পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে আহম্মদ আলীও নারায়ণগঞ্জ জেলায় বসবাস করছেন। 

এদিকে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিযোগ, জমিদারের রেখে যাওয়া এই বিশাল সম্পত্তি ছিল দেবোত্তর হিসেবে। আব্দুল কুদ্দুস নামে স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, তৎকালীন ভারতবর্ষে এই এলাকাটি ছিল দেবোত্তর হিসেবে। মূলত দেবোত্তর বলতে বুঝায় ওয়াকফাহ্ জমি। ওই সময়ে দেবোত্তর জমি হলে জামিদারকে খাজনা দেওয়া লাগতো না। জমিদার লক্ষণ সাহার ছিল তিন ছেলে। নিকুঞ্জ সাহা, পেরিমোহন সাহা ও বঙ্কু সাহা। জমিদার মারা যাওয়ার পর তারা তিন ভাই এই সম্পত্তি দেখভাল করতেন। বঙ্কু সাহা ভারত ভাগের সময় এখান থেকে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়ার কিছু পূর্বে নিকুঞ্জ সাহাও ভারতে চলে যান। এক পর্যায়ে জমিদারের ছোট ছেলে পেরিমোহন সাহা এই সম্পত্তির দেখভাল করতেন। পেরিমোহন সাহার বৌদ্ধ নারায়ন সাহা নামে এক ছেলে ছিল। পেরিমোহন সাহা মারা যাওয়ার পর বৌদ্ধ নারায়ন এই ওয়াকফাহ সম্পত্তিটি বিক্রি করে ফেলেন।

স্থানীয়রা আরও জানান, এলাকার হিন্দু সম্প্রদায় ট্রাস্ট নামে একটি সংগঠন দেবোত্তরকৃত এই সম্পত্তিটি বিক্রি করার পর আদালতে মামলা করেন। যা এখনও চলমান। মামলা জটিলতা ও দেখভাল করার অভাবেই বর্তমানে লক্ষণ সাহার এই জমিদার বাড়িটি অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রাচীনতম লক্ষণ সাহার এই জমিদার বাড়ি সংরক্ষণ করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের।  

এ বিষয়ে ডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাবের উল হাই-এর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, প্রাচীনতম এই জমিদার বাড়ি ডাঙ্গা ইউনিয়নের ঐতিহ্য। এটি সংরক্ষণ ও দর্শনীয় স্থান করার জন্য উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনকে একাধিকবার অবগত করা হলেও বাড়িটি সংরক্ষণে এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। লক্ষণ সাহার এই জমিদার বাড়ি সংরক্ষণ করে ডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে দিলে বাড়িটি সংস্কার করে ডাঙ্গার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন এই চেয়ারম্যান। পলাশের ঐতিহ্যবাহী এই জমিদার বাড়ি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্থানীয়দের দাবির সঙ্গে একমত প্রকাশ করে আমাদেরও দাবি, অতিদ্রুত লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণে উদ্যোগ নিন। 

পিডিএসও/হেলাল