হুমায়ূন এসেছিলেন বলে

প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২০, ১৫:০৮ | আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২০, ১৫:২৯

সোহেল নওরোজ
হুমায়ূন আহমেদ (১৩ নভেম্বর ১৯৪৮—১৯ জুলাই ২০১২)

বাংলা সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল তারকার নাম হুমায়ূন আহমেদ। সৃষ্টির প্রাচুর্যে ও বৈচিত্র্যে, জনপ্রিয়তার নিরিখে তিনি হয়েছিলেন অনন্য। পাঠকের মনোজগতে আলোড়ন তুলেছিলেন সহজাত লিখনশৈলীর মাধ্যমে। তার লেখার মোহে আবিষ্ট পাঠক আপাত তুচ্ছ ও অতি সাধারণ বিষয়ের মধ্যেও সৌন্দর্যের সন্ধান করে। তিনি আমাদের হৃদয়ঘরের লেখক। সাহিত্যের এই নন্দিত কথাকারের জন্মবার্ষিকীতে প্রতিদিনের সংবাদের আয়োজন

সাহিত্যের বহমান স্রোতে গা ভাসিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পান সমকালের সাহিত্যিকরা। কেউ সফল হন, কেউবা হারিয়ে যান অভীষ্টে পৌঁছার আগেই। এর বাইরে থেকে যান কেউ কেউ। যারা গা ভাসান না, বরং নিজেরাই একটা স্রোত তৈরি করেন। তাদের সৃষ্টিতে মোহাবিষ্ট হয়ে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। সেই নবনির্মিত পথে হাঁটেন সাহিত্যের পথযাত্রীরা। বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ (১৩ নভেম্বর ১৯৪৮১৯ জুলাই ২০১২) এমনই একটা ধারা, একটা পথ, একটা স্রোত তৈরি করে গেছেন। সাহিত্যের প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বিরোধে না গিয়ে যাপিত জীবনের দরদমাখা আখ্যান নির্মাণ করেছেন নিজের মতো করে। এত সহজ সাহিত্য মানব জীবনের এমন গভীর ও তীক্ষ্ম অনুভূতিকে কী করে ধারণ করতে পারে, তা এক বিস্ময়ই বটে! হুমায়ূন আহমেদের নির্মিত চরিত্রগুলো কখনো দরদ-ভালোবাসার কোমলতা আবার কখনো অতৃপ্তি-বিষাদের হাহাকার গায়ে মেখে আমাদের খুব কাছের হয়ে ওঠেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাদের দুঃখ-বেদনা আমাদের ছুঁয়ে যায়, হাসি-আনন্দে আমাদের চিত্তেও প্রশান্তির পরশ লাগে। তিনি যেন পাঠকের সঙ্গে সাহিত্যের ভাষা, চরিত্র ও আঙ্গিকের দূরত্ব ঘোচানোর অভিপ্রায়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম, যা সাধারণ কলম থেকে একসময় হয়ে ওঠে জাদুর কলম!

সাহিত্য সহজ কোনো ক্ষেত্র নয়। এখানে টিকে থাকতে হলে কতটা অধ্যবসায়, ত্যাগ, শ্রম আর মেধা লাগে হুমায়ূন আহমেদ তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। এই একটা ক্ষেত্রে নিজের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। তার স্বভাবে খেয়ালিপনা ছিল। তবে হেঁয়ালি ছিলেন না। যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতি বিচার করতেন আবার অদৃষ্টকেও অস্বীকার করতেন না। জীবনের কঠিন মারপ্যাঁচের কথাগুলো সহজ-সরল করে অনর্গল বলে গেছেন স্বকীয় ঢঙে। তার মধ্যে হিউমার ও উইট ছিল, নিজের লেখাতেও সেসবের প্রয়োগ করতে কুণ্ঠা করেননি। তাতে বর্ণনা আরো রসালো হয়েছে। আমোদিত হয়েছে পাঠক। তিনি রাখঢাক না রেখে কথা বলতে পছন্দ করতেন। এই অকপট আচরণের কারণে হয়তো অনেকের বিরাগভাজন হয়েছেন, তবু নিজেকে বদলাননি। তবে তিনি কঠিন হৃদয়ের মানুষ ছিলেন না। ভেতরের কোমলতা যারা ধরতে পারতেন, তারা কখনো তাকে ভুল বুঝতেন না।

কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, গত এক-দেড় দশকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে আমি হয়তো তাকে কিছুটা বুঝতে পেরেছি। তাকে বুঝতে না পেরে অনেকেই তার কাছ থেকে সরে গেছেন। আসলে অদ্ভুত এক ধরনের সারল্য ছিল তার। ছিলেন স্পষ্টবাদীও। তাই তার সরাসরি কথায় অনেকে আঘাত পেয়ে দূরে চলে যেতেন। হুমায়ূন আহমেদ কিন্তু বিষয়টা এত জটিলভাবে দেখতেন না। বরং আবার যদি কখনো দেখা হতো তাদের সঙ্গে নিজেই জানতে চাইতেন, ‘ওই দিন খুব কষ্ট পেয়েছিলে, তাই না?’ তিনি মনে রাখতেন এভাবেই মানুষকে। শত ব্যস্ততার ভিড়েও। এই হলেন হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদ জীবদ্দশাতেই জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছেছিলেন। তার বই মানেই যেন পাঠকের হামলে পড়া, বেস্টসেলার হওয়া! বাংলাদেশের পাঠক যখন বলতে গেলে এ দেশীয় লেখকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের বইয়ের প্রতি ঝুঁকতে শুরু করেছে, ঠিক সে সময় হুমায়ূন আহমেদ একটা ধাক্কা দিলেন। পাঠকরা নড়েচড়ে বসল। এক জাদুকরের আবির্ভাব তাদের আবার দেশীয় সাহিত্যমুখী করল। প্রকাশনা ব্যবসা, বাংলা একাডেমির বইমেলায় প্রাণ ফিরে এলো। পাঠকরা হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, রূপা পেয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেল। নিজেদের নতুনভাবে আবিষ্কার করল বইয়ের পাতায়। হুমায়ূন তাদের স্বপ্ন দেখালেন। জীবনের নতুন অর্থ খুঁজতে শেখালেন। যেখানে ঝুম বৃষ্টি, উথাল-পাথাল জোছনা, হিমালয়ের বিশালতা, সমুদ্রের স্নিগ্ধতা—এ বিষয়গুলোকে নতুনভাবে চেনালেন। খালি পায়ে হাঁটা তরুণের কাছে রাতের অন্ধকারকেও অর্থবহ করে তুললেন। পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতা, টানাপড়েন, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, অঘোম পরিণতির চিত্র এঁকে বাঙালি মধ্যবিত্তের মনের ঘরে ঢুকে গেলেন। বইয়ের পৃষ্ঠায় আটকে না থেকে তাদের জন্য নাটক বানালেন। সেখানেও জয় করলেন দর্শকের মন। এরপর হাত দিলেন সিনেমা বানানোর কাজে। সাফল্য এলো সেখানেও। হুমায়ূন আহমেদ মানেই যেন জয়ের গল্প, অর্জনের গল্প! কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনের গল্পটা মোটেও একরৈখিক ছিল না।

বাবার হিসাবের টাকায় ছয় ছেলেমেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে হুমায়ূনমাতার। এর সঙ্গে তার খেয়ালি স্বভাব তো ছিলই! বাজার করার টাকা নেই অথচ গিটার কেনা, ঘোড়া কিনে বাসায় নিয়ে আসা, নিজের ক্যামেরায় ছবি তুলে ডেভেলপ করাএসব কাজ নিয়মিতই করতেন ফয়জুর রহমান। বাবার এই স্বভাবের অনেকটাই পেয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। কিংবা হয়তো ইচ্ছে করেই নিজের ভেতরে শহীদ বাবাকে লালন করেছিলেন! মাঝে মাঝে নুহাশপল্লীতে জোছনা দেখার আয়োজন করতেন হুমায়ূন। আবার অন্ধকার রাতে নকল ভূত সাজিয়ে অতিথিদের ভয় দেখাতেন। নুহাশপল্লীর লিচুগাছের ফল খাওয়ার ব্যাপারে তার কিছু আরোপিত নিয়ম ছিল। দুটি ফলগাছ থাকলে একটির ফল খাবে মানুষ আর অন্যটির ফল পাখিরা। কড়া নির্দেশ ছিল তার। খুব বৈষয়িক বা পাণ্ডিত্যের প্রকাশ ঘটান, এমন লোকদের পছন্দ করতেন না।

স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হন হুমায়ূনপিতা ফয়জুর রহমান। যুদ্ধের সময় তাকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাগ্যগুণে বেঁচে ফিরেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। বাবার মৃত্যুর পরই প্রকৃত যুদ্ধ শুরু হয় তার। সংসারের ভার এসে পড়ে হুমায়ূনের ওপর। বেতনের প্রায় পুরোটাই মায়ের হাতে তুলে দিতেন। বাসে চড়ার পয়সা বাঁচানোর জন্য হেঁটে যেতেন দূর-দূরান্তে। সেই অভাবের দিনের কথা কখনো ভোলেননি। তার অনেক লেখাতে সেসব দিনের চিত্র উঠে এসেছে। নিজেদের চলতেই হিমশিম খেতে হয় এর মধ্যে চিঠির মাধ্যমে পরিচয় ঘটে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর নাতি গুলতেকিনের সঙ্গে।

মুনীর আহমেদের লেখায় সে প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এভাবেগ্রীষ্মের এক বিকালে ঘর্মাক্ত হুমায়ূন হোস্টেলে এসে হাজির। রসায়ন বিভাগে দিনের শেষ ক্লাস নিয়ে কার্জন হল থেকে মগবাজার চৌরাস্তা হয়ে তেজগাঁও লিংক রোডের কাঁচা রাস্তা ধরে রোদের মধ্যে হেঁটে এসেছে। উদ্দেশ্য, একজনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা। তখন সম্পর্কের আদান-প্রদান শুরু মাত্র। মেয়েটির নাম গুলতেকিন। ক্লাস টেনে পড়ে। উদীয়মান তরুণ লেখকের একজন ভক্ত হিসেবে প্রথম পরিচয়। ওই বয়সের একটি মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছে যাওয়া কম সাহসের কথা নয়! পারিবারিকভাবেই দুজনের বিয়ে হয়। হুমায়ূন নতুন বউ নিয়ে বাসায় আসে। পরদিন বাবর রোডের বাসার সামনে পুলিশের গাড়ি। শহীদ পরিবার হিসেবে পাওয়া বাসা থেকে পুলিশ তাদের বের করে দেবে। সেই নোটিস পনেরো দিন আগেই দিয়ে গেছিল। বর-বধূকে বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে রিকশায় চড়িয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ ঘরের সব জিনিসপত্র বাইরে ফেলে দেয়। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটায় শহীদ পরিবারটি।

কঠিন সময়ের ভেতর দিয়ে যেমন গিয়েছেন, তেমনি জীবনকে নানাভাবে উপভোগও করেছেন। বলতে গেলে মুদ্রার দুই পিঠই আছে হুমায়ূন আহমেদের জীবনে। বই লেখা বা বড় কোনো কাজ শেষে হলেই ঘুরতে বের হতেন। কখনো মাঝরাতে দল বেঁধে নৌকায় করে নদীতে ঘুরতেন। মানুষকে চমকে দিতে পছন্দ করতেন। অন্যকে প্রভাবিত করার সহজাত ক্ষমতা ছিল তার। জীবনটাকে আনন্দময় করার বাসনা থেকে গড়ে তোলেন নন্দনকানন নুহাশপল্লী। এখানে প্রায়ই গান-বাজনার আসর বসাতেন। নিয়ম করে আড্ডা দিতেন। জাদু দেখাতেন। অতিথিদের দাওয়াত করে আনতেন। ওপার বাংলা থেকে সুনীল-সমরেশরাও ছুটে আসত তার ডাকে। হ্যামিলিনের বংশীবাদকের মতো হুমায়ূনের ডাকে সাড়া না দিয়ে কেউ থাকতে পারত না।

লেখালেখি বা নির্মাণউভয়ের জন্যই যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকত হুমায়ূন আহমেদের। প্রচুর পড়তেন। বিদেশ থেকে ফিরলে তার বাক্সভর্তি থাকত বইয়ে। তবে পড়ার ক্ষেত্রে বাছ-বিচার করতেন না। বিজ্ঞানভিত্তিক, ধর্মীয়, গবেষণামূলক, জাদুবিদ্যা এমনকি হাত দেখার বইও পড়তেন। ভালো চলচ্চিত্রের প্রতিও তার ছিল দুর্বার আকর্ষণ। আশির দশকের দিকে যখন একটা মাত্র টেলিভিশন চ্যানেল ছিল, তখন ইস্টার্ন প্লাজা থেকে নামকরা সব ছবির ক্যাসেট জোগাড় করে ছবি দেখার আসর বসাতেন। তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। নিজের লেখা স্ত্রী ও মেয়েদের পড়তে দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতেন তাদের কেমন লাগছে।

হুমায়ূন-তনয়া শীলা আহমেদ সে কথাই বলেছেন এভাবেসাধারণ পাঠকের কাছে লেখাটা কেমন লাগে, বাবা সেটাই বুঝতে চাইতেন। লেখা হয়ে গেলেই আমাদের সেটা পড়তে দিতেন আর আমাদের সামনে গম্ভীর মুখে পায়চারি করতেন। বারবার তাকাতেন আমাদের মুখের দিকে, পড়ে কেমন লাগছে, তা বোঝার চেষ্টা করতেন। যেমন লেখাটা যদি দুঃখের হয়, তবে সেটা পড়ে আমরা কাঁদছি কি না, তা খেয়াল করতেন। ধরেন, কোনো দুঃখের কাহিনি পড়লাম, পড়ার পর চোখে পানি এলো না। তখন তিনি খুব রেগে যেতেনদুঃখের কাহিনি পড়ার পরও আমার চোখে পানি আসছে না কেন? যেন আমি একটা বড় অপরাধ করে ফেলেছি!

১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে শুরু করছিলেন, এরপরের চার দশকে তিন শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা বনে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ। নাটক-সিনেমা নির্মাণেও অনেক সময় দিয়েছেন। গান লিখেছেন, ছবি এঁকেছেন! একজন মানুষের এই বিশাল সৃষ্টি বিস্ময়জাগানিয়া! হুমায়ূন বলেই তিনি পেরেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার মতো সম্মানীয় পদ ছেড়ে পুরোদস্তুর লেখক আর নির্মাতা হয়ে গিয়েছিলেন। যেনতেনভাবে টিকে থাকা নয়, বরং রাজত্ব করেছেন আমৃত্যু। তিনি চলে গেলেও তার সৃষ্টির গ্রহণযোগ্যতা ও আবেদন কিছুমাত্র কমেনি। এখনো এ দেশে তার বইয়ের পাঠক সবচেয়ে বেশি। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রজন্মটিকে যিনি বইয়ের ভাঁজে আটকে রেখেছেন, জীবনকে তরিয়ে উপভোগ করতে শিখিয়েছেনতার কীর্তি কখনো মলিন হওয়ার নয়। হুমায়ূন আহমেদ একইভাবে থাকবেন বাংলা সাহিত্যের সুউচ্চ আসনে। জন্মদিবসে এই কথার কারিগরকে স্মরণ করছি নিখাদ শ্রদ্ধায়, অপরিমেয় ভালোবাসায়।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গল্পকার
[email protected]

পিডিএসও/হেলাল