কোরবান আলী, ঝিনাইদহ

  ২৩ জানুয়ারি, ২০২৩

ঝিনাইদহের বলুহর বাওড়ে মৎস্যজীবীদের আহাজারি, ‘হয় বাওড় নয় বিষ দ্যান’

হালদার সম্প্রদায়ের মৎস্যজীবী পরিবারের পেটে লাথি না মারার আকুতি। ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

ঝিনাইদহের ছয়টি বাওড় রক্ষায় হালদার সম্প্রদায়ের মৎস্যজীবীরা কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। প্রতিদিন তারা বাওড়পারে মানববন্ধন ও সমাবেশ করছেন।

সোমবার (২৩ জানুয়ারি) কোটচাঁদপুরের বলুহর প্রজেক্ট এলাকায় এমন মানববন্ধনে হাজির হন ৭৭ বছর বয়সী শ্রী নরেন হালদার। যার ৬৮ বছরই কেটেছে জাল দড়া টেনে। মানববন্ধনে হালদার সম্প্রদায়ের কয়েকশ মানুষ তাদের পেটে লাথি না মারার আকুতি জানান।

মানববন্ধনে সুধীর হালদার নামে এক মৎস্যজীবী বলেন, হালদার সম্প্রদায় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে বলে এসেছেন ‘হয় বিষ দ্যান না হয় বাওড়ের মালিকানা দ্যান।’ বাপ দাদার কর্মক্ষেত্র বলুহর বাওড় ইজারা দেওয়া হলে তারা স্বেচ্ছায় আত্মহুতির কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলেও জানান এ মৎস্যজীবী।

তাদের ভাষ্য, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমল থেকে তারা বাওড়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও বৃহৎ একটি পরিবার তাদের আয়ের উপর নির্ভরশীল। জীবনসায়াহ্নে এসে তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন বলুহর বাওড়ের মালিকানা হারাতে বসেছে।

তথ্য নিয়ে জানা গেছে, জেলা প্রশাসন টেন্ডারের মাধ্যমে বাওড়গুলো ইজারাদানের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। ফলে কর্ম হারানোর প্রহর গুণছেন বাওড়পাড়ের হাজারো মৎস্যজীবী পরিবার। শুধু নরেণ হালদার নয়, তার মতো বাওড় পাড়ের রহমতপুর গ্রামের সাধন হালদার, বলুহর গ্রামের নিত্য হালদার, শ্রীমতি কমলা রানী হালদার, বজরাপুর গ্রামের সন্তোষ কুমার হালদারসহ জেলার ছয়টি বাওড়ের উপর নির্ভরশীল প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের মাঝে নেমে এসেছে চরম হতাশা।

মৎস্যজীবীরা জানান, ভূমি মন্ত্রণালয় ঝিনাইদহের ছয়টি বাওড় ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাওড়গুলো হচ্ছে ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার কাঠগড়া, ফতেপুর, কোটচাঁদপুরের বলুহর, জয়দিয়া, কালীগঞ্জের মর্জাদ এবং বেড়গোবিন্দপুর। এসব বাওড়ের মোট জলাকার হচ্ছে ১১৩৭ হেক্টর। ছয়টি বাওড় এলাকায় ৭৬৭টি পরিবারের প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য এসব বাওড় থেকে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। মৎস্যজীবীরা সরকারের ‘জাল যার জলা তার’ এই নীতির উপর ভর করে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে বাওড়ে মাছ ধরে আসছিলেন।

সুফলভোগী মৎস্যজীবী সুধীর হালদার জানান, বাওড় ইজারা দিলে সরকারের এককালীন বেশি টাকা আয় হলেও একদিকে যেমন বাওড়গুলো ক্ষতির মুখে পড়বে, তেমনি মালিকানা হারিয়ে পথে বসবে বাওড়ের উপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবার। ফলে ধ্বংস হবে জীববৈচিত্র্য। বাওড়গুলো চলে যাবে প্রভাবশালী মধ্যসত্বভোগীদের দখলে। ইতোমধ্যে একটি মাফিয়া চক্র বাওড়গুলো ইজারা নিতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। ভুইফোঁড় সমিতির নামে কোটি কোটি টাকার ডাক তুলে সিডি জমা দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মনিরা বেগম জানান, বাওড়পাড়ের মানুষগুলোর কথা চিন্তা করে ভূমি মন্ত্রণালয় মৎস্য অধিদপ্তরের এক প্রকল্পের মাধ্যমে মাছ চাষের জন্য দিয়েছিল। কিন্তু তারা সফলতা আনতে পারেনি। বাওড়পাড়ের হলদারদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কথা বলবেন বলে তিনি জানান।

সংসদ সদস্য শফিকুল আজম খান চঞ্চল জানান, আগামী ৩১ জানুয়ারি বিষয়টি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হবে। সেখানে বিষয়টি উঠবে। বাওড়গুলো ইজারা দিলে সরকার হয়তো এককালীন টাকা পাবে, কিন্তু হালদার পরিবারগুলো কোথায় যাবে? এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হবে বলে তিনি মনে করেন।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
বাওড়,বিষ,বলুহর বাওড়
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close