বিশেষ প্রতিবেদক

  ০৯ ডিসেম্বর, ২০২৩

পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক

প্রতিনিধিত্বশীল ছবি

গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর মধ্য বাড্ডার খোলাবাজারে সাইদুল ইসলাম বাসার জন্য পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে জানতে পারেন প্রতি কেজির দাম ১১০ টাকা। শনিবার একই ব্যক্তি রাজধানীর কুনিপাড়া বউবাজারে অফিসের জন্য পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে বিক্রেতার কাছে শুনতে পান পেঁয়াজের দর ১৮০ টাকা, বিকেলে তা উঠে ২০০ টাকায়। পেঁয়াজের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে চোখ কপালে ওঠেছে। তবে ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে বলা হয়েছে, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে বলে দাম এত বাড়তে পারে না। কারণ শুধু ভারত নয়, অন্য দেশ থেকেও বাংলাদেশে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। তাদের মতে, এই হঠাৎ দাম বৃদ্ধির পেছনে পেঁয়াজবণিকদের কারসাজি রয়েছে।

শনিবার বিকেলে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, এই মধ্যেই জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজার মনিটরিংয়ে নেমেছে। ১৬৬ প্রতিষ্ঠানকে পেঁয়াজের দাম বেশি নেওয়ার কারণে জরিমানা করেছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, বাসায় খাবারের টেবিলে, পাড়া-মহল্লাহর চায়ের দোকানে কিংবা বাসায় টেলিভিশন সেটের সামনে বসে বা অন্য কোনো আড্ডায় এখন আলোচনার কেন্দ্রে আছে পেঁয়াজের হঠাৎ দাম বৃদ্ধি। পেঁয়াজ রপ্তানিতে ভারতের বর্তমান নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশে সবজিজাতীয় নিত্য দরকারি এই পণ্যটির মাত্রাতিরিক্ত এই মূল্য বেড়েছে বলে মনে করেন অনেকে। নির্বাচনী আলাপ-আলোচনা বাদ দিয়েও এখন পেঁয়াজের দাম-বিতর্ক নিয়ে বিভিন্ন এলাকাবাসী এখন সরকার ও ভারতের ওপর নাখোশ বলে জানা গেছে।

ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করেছে। তা গত শুক্রবার দেশের গণমাধ্যমে প্রচার-সম্প্রচার হয়। এরপর থেকেই রাজধানীসহ সারা দেশের বাজারে পেঁয়াজের বাড়তি দামে পকেট পুড়ছে ক্রেতাদের। দোকানে খুচরা বা আড়তের পাইকারি বিক্রেতার কাছে বেশি দরে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু হয়।

ভারত সে দেশের বাজারে সরবরাহ ও দাম স্বাভাবিক রাখতে পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর আগামী মার্চ পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যবিষয়ক মহাপরিচালকের কার্যালয় গত বৃহস্পতিবার (৭ ডিসেম্বর) জানায়, আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত পেঁয়াজ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে ভারতে। এই নির্দেশনা অবশ্য গত শুক্রবার (৮ ডিসেম্বর) থেকে কার্যকর হয়।


# আমদানিকারকদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হয় # বাজার তদারকি জোরদারের দাবি ভোক্তাদের # এক কেজির বদলে কেনা হচ্ছে ২৫০ গ্রাম


ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করার পর সুযোগ নিচ্ছেন বাংলাদেশের পেঁয়াজের ব্যবসায়ীরা। তারা পাইকারি ও খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।

সীমান্ত বাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাজারে পেঁয়াজের ঝাঁজ বাড়ছেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, হিলি স্থলবন্দর বাজারে গত বৃহস্পতিবার ভারত থেকে আমদানিকৃত পেঁয়াজ পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় ৮৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে। শনিবার তা ঢাকার বাজারে বিক্রি হয় ১৮০ টাকা কেজি দরে। হিলি বাজারে পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হয়েছে। এ কারণে দাম বাড়ছে। আমদানিকারকদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, ঢাকার কাছে গাজীপুরের শ্রীপুরের বিভিন্ন বাজারে ক্রেতারা পেঁয়াজের বাড়তি দামের চাপে পড়েন। সেখানে বিভিন্ন বাজারে শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত দেশি পেঁয়াজের দর হাঁকা হয় ১২০ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজের দর হাঁকা হয় ১০০ টাকা। শনিবার দুপুর ১২টায় বাজারে দেশি পেঁয়াজ ছোট-বড় সাইজের দর ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজ ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

এক রাতের ব্যবধানে পেঁয়াজের দর দ্বিগুণ হয়েছে। তাই ক্রেতারা ক্ষুব্ধ। তাই তাদের ক্ষোভ মাত্রা ছাড়াচ্ছে। বাজার থেকে ঘরে ফিরে তাই কথায় কথায় ক্ষোভ ঝাড়ছেন তারা। ওই বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা সবুজ মিয়া বলেন, এক কেজির বদলে আমি ২৫০ গ্রাম পেঁয়াজ কিনেছি।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পেঁয়াজের দাম বাড়িয়েছে। আমাদের একাধিক মোবাইল টিম বাজার তদারকি করতে কাজ শুরু করেছে।

কলারোয়া (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জানান, সেখানে এক লাফে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। এক দিন আগেও যে পেঁয়াজের দর ছিল ৭০ টাকা তা গতকাল ছিল ১৬০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। পেঁয়াজের এমন দাম বৃদ্ধিতে হতবাক সাধারণ মানুষ। গতকাল শনিবার সকালে সাতক্ষীরার কলারোয়া বাজারে গেলে ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কয়েকজন ক্রেতা জানান, গত শুক্রবারও স্থানীয় বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের দর ছিল ৮০-১০০ টাকা। এক দিন পর শনিবার সেই পেঁয়াজের দাম নেওয়া হয় কেজিতে ১৬০-২০০ টাকা। আর দেশি পেঁয়াজের দর ছিল ১৮০ টাকা। কয়েকজন বিক্রেতা জানান, শনিবার সকাল থেকে পেঁয়াজ পাইকারি বাজার থেকে কেনা হয়েছে ১৫০-১৮০ টাকা কেজিতে। এজন্য বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে। তবে কয়েকজন পাইকরি আড়তদার দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ ও সদুত্তর না দিতে পারলেও তারা বলছেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ায় তারাও বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন।

এদিকে সাধারণ ক্রেতা ও ভোক্তারা রাগ প্রকাশ করে বলেন, এখনো যে পেঁয়াজ বাজারে আছে সেগুলো আগেই আমদানি করা। তাহলে কেন এক লাফে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিগুণ দামে পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে? অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অবিলম্বে নজরদারি অত্যন্ত জরুরি।

মানিকছড়ি (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি জানান, খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। শনিবার (৯ ডিসেম্বর) মানিকছড়ি বাজারে সাপ্তাহিক হাটের দিন সকালে পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১১০-১২০ টাকায়। আগের দিন তা ছিল ১০৩-১১০ টাকা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গতকাল দুপুরে পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ২০০ টাকায়। কথা হয় পেঁয়াজ কিনতে বাজারে আসা ফরিদ, নাছির ও আলমগীর জানান, সকালে খুচরা ও পাইকারি দোকানদাররা পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন ১১০ টাকায়। অথচ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তা ২০০ টাকা হয়। হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ জানেন না তারা। উপজেলা প্রশাসনের বাজার মনিটরিংয়ের জোর দাবি জানিয়েছেন এই স্বল্প আয়ের ক্রেতারা। ক্রেতা মুজিবুর রহমান বলেন, বাজার ঘুরে দাম যাচাই-বাছাই করে অনেক কষ্টে ১৭০ টাকা করে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনতে হয়েছে। আর এখন সেই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২০০ টাকায়। অথচ সকাল বেলা আমার সামনেই ১১০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।

হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে খুচরা বিক্রেতা চমক, নওশাদ, জাহিদ, তারেক ও শিমুল বলেন, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির খবর ছড়িয়ে পড়ায় আড়ৎদারেরা দাম চড়া দাম নিচ্ছে পেঁয়াজের। যার ফলে বাজারে খুচরা দোকানদারদের বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার রক্তিম চৌধুরী জানান, ভারতের পেঁয়াজ আমদানির খবরেও সারা দেশের মতো মানিকছড়ির স্থানীয় বাজারেও পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং করার কথা জানিয়েছেন তিনি।

ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, প্রতি কেজি পেঁয়াজ দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয় শনিবার। দর ছিল ২০০ থেকে ২২০ টাকা। দুপুরে উপজেলার ভূরঙ্গামারী হাটে দেশি পেঁয়াজ ২২০ থেকে ২৪০ টাকা এবং আমদানি করা পেঁয়াজ ২০০ থেকে ২২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।

ক্রেতা লুৎফর রহমান বলেন, পেঁয়াজের দাম জিজ্ঞাসা না করে বিক্রেতাকে এক কেজি পেঁয়াজ ব্যাগে ঢুকিয়ে দিতে বলেছিলাম। দাম শোনার পর কিনেছি ২৫০ গ্রাম। ক্রেতা আব্দুল হাই বলেন, পেঁয়াজের দর কেজিতে আগের চেয়ে ১২০ টাকা বেশি।

সুকুমারী রানী বলেন, ৫০ টাকা দিয়ে ৭টা মাঝারি আকারের পেঁয়াজ কিনলাম।

ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম ফেরদৌস বলেন, পেঁয়াজ দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে জানতাম না। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

এদিকে, ঢাকার বিভিন্ন বাজারে দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেশি ছিল কারওয়ানবাজার, মালিবাগ, মগবাজার, রামপুরা বিভিন্ন বাজারে। এসব বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৮০-২০০ টাকায়। আমদানিকৃত পেঁয়াজ বিক্রি হয় ১৬০-১৯০ টাকায়। এসব বাজারে পেঁয়াজের দাম কমপক্ষে বাড়তি নেওয়া হয়েছে ৫০ টাকা। মালিবাগ বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ শুক্রবার ছিল ১৩০, গতকাল তা উঠে ১৮০ টাকায়।

এফবিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল হুদা চপল বলেন, শুধু ভারতই আমাদের পেঁয়াজ আমদানির উৎস নয়। বছরের প্রথমেই যদি আমরা আমাদের চাহিদা মোতাবেক পেঁয়াজ আমদানির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না।

তিনি বলেন, দেশে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ মজুদ আছে। তাছাড়া কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন পেঁয়াজ উঠবে। রপ্তানি বন্ধের ঘোষণায় সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়তে পারে না। কারা কারা এবং কী পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করেছে এবং তা বিক্রি করেছে তার তথ্য সরকারের কাছে আছে। একশ্রেণির ব্যবসায়ী এমন সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।

অভিযানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর : পেঁয়াজের বাজার দ্রুত অস্থির হওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে অভিযানে নেমেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। শনিবার সকাল থেকে ঢাকা মহানগর এলাকায় বিভিন্ন বাজারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চার কর্মকর্তার নেতৃত্বে চারটি দল অভিযান পরিচালনা করে। এ অভিযান চলবে বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছেন, এক দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়ে ২০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে এমন খবর আমাদের কাছে এসেছে। আমরা বাজারে বাজারে গিয়ে দেখব, কত দামে এই পেঁয়াজ কেনা ছিল। এক দিনে বাজারে মূল্য এত বৃদ্ধির কথা নয়। অনিয়ম পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পিডিএস/পার্থ/মীর

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
পেঁয়াজ,ভোক্তা অধিকার,বাজার,দাম বৃদ্ধি
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close