প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ২৪ এপ্রিল, ২০২৪

তাপপ্রবাহ উপেক্ষা, ধান কাটার ধুম

দেশজুড়ে চলছে তাপপ্রবাহ, এতে সবাই দরকার ছাড়া কেউ বাইরে বের হচ্ছেন না। সবাই একটু স্বস্তির জন্য বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করছেন। কিন্তু বসে নেই হাওরসহ বিভিন্ন এলাকার চাষিরা। তারা তীব্র তাপপ্রবাহ, কড়া রোদ ও গরম হাওয়ার হলকা উপেক্ষা করে ধান কাটছেন। তারা বলছেন, যেভাবে তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। এর পরিণতিতে বড় কোনো ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসার আগেই ধান কেটে গোলায় তোলার জন্য মরিয়া তারা। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

নিকলী (কিশোরগঞ্জ) : বৈশাখের শুরুতে হাওরে যেসব জমির ধানে পাক ধরেছিল, এরই মধ্যে তা কাটার উপযোগী হয়েছে। সেগুলো কাটার ধুম পড়েছে। বর্তমানে দম ফেলার ফুরসত নেই চাষি পরিবারের। কিশোরগঞ্জের নিকলীর হাওরজুড়ে চলছে এখন ধান কাটার উৎসব। উপজেলার ফ্যানাগোনা, মাধলা, কান্দিরপলা, সর্পমারি, মুদানল, উজাইমারা, জংশাই, বানহর, অরুইত্তা, বরুলিয়া, পাগলার হাওরসহ উঁচু-নিচু সব জমিতে পুরাদমে ধান কাটা শুরু হয়েছে। ৭০টির মতো হার্ভেস্ট মেশিন হাওর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা সদরের গোয়ালহাটি গ্রামের কৃষক মো. মুর্শিদ আলী (৫৩) জানান, তিনি ৪ একর জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। সেগুলো মাড়াই ও শুকনোর কাজ চলছে। তিন দিনের মধ্যে সব ধান গোলায় তুলতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

নিকলী বেড়িবাঁধ ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সড়কের দুই পাশে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর বহু দৃশ্য চোখে পড়ে। রাস্তাজুড়েও শুধু ধান আর ধান। ধান মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর জন্য তৈরি চত্বরকে খোলা বলা হয়। প্রতিটি খোলার পাশেই অস্থায়ী খুপড়ি ঘর তুলেছেন চাষিরা। সেখানেই চলে রাত্রী যাপন, খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রাম। পুরো বৈশাখ মাস হাওরে ধান তোলার উৎসবকে ‘বৈশাখী’ বলেন স্থানীয়রা।

মোহরকোনা গ্রামের কৃষক মো. সেলিম আমিন (৪০) জানান, তীব্র শীত এবং তীব্র গরম সহ্য করে সোনালি ফসল ফলাই। মাথার ঘাম পায়ে ঝরে। শুধু বিক্রির সময় ন্যায্য দাম মেলে না।

আগাম বন্যায় ও ভারী বর্ষণে যেসব হাওরে পানি প্রবেশ ঢোকে, এসব হাওরের ধান ৮০% পাকলে অতি দ্রুত কাটার নির্দেশনা দিয়েছে উপজেলা কৃষি অফিস। নিকলী উপজেলা কৃষি অফিসার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, নিকলীতে এ পর্যন্ত ৩০% জমির ফসল কাটা হয়েছে। ৮০% পাকলে ধান কাটতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) : তাহিরপুর উপজেলার বৃহত্তর শনি হাওর, মাটিয়ান হাওর, লামার গুল, মাঝের গুল, সমসা চুনখলা, এরালিয়া কোনাসহ ছোট বড় ২৩টি হাওরে চলছে ধান কাটার উৎসব। তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান উদণ্ডদৌলা জানান, এ বছর উপজেলার ছোট বড় হাওর মিলিয়ে প্রায় ১৭ হাজার, ৪৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। কিন্তু তাহিরপুরে এ বছর ধান কাটার শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। সঠিক সময়ে ঘরে ফসল না তুলতে পারলে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে কৃষকের সব স্বপ্ন।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ফসলডুবি এবং ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তাহিরপুরের কৃষকরা গত বছর ফসল ঘরে তুলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছিলেন। একটু ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় এ বছর ঋণ করে লগ্নি করে আবার ধান লাগিয়েছেন। এ বছর ঘরে ধান তুলতে না পারলে পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তায় বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না বলে জানায় কৃষক পরিবারগুলো।

সময়মতো ফসল ঘরে তোলার জন্য ধান কাটার মৌসুমে তাহিরপুর উপজেলার বাগলি, চারাগাঁও, বড়ছড়া শুল্কস্টেশনসহ ফাজিলপুর বালুমহাল বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন চাষিরা। প্রতি বছরই সুনামগঞ্জের হাওরে ধান কাটার শ্রমিক সংকটের কথা বিবেচনা করে মৌসুমের সময় বালুমহাল বন্ধ রাখে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন।

কৃষক লীগ তাহিরপুর উপজেলা শাখার সভাপতি জিল্লুর রহমান আখঞ্জী প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে এখনই যদুকাটা বালুমহালসহ তিনটি শুল্ক স্টেশনের সব কার্যক্রম বন্ধ রাখা উচিত।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা পারভীন জানান, শুল্ক স্টেশনগুলোর নেতারাসহ বালু মহালের ইজারাদার ও ফাজিলপুর শ্রমিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

মনিরামপুর (যশোর) : যশোরের ভবদহ অঞ্চলে সবচেয়ে জলাবদ্ধ এলাকা হচ্ছে বিল বোকড় ও বিল কেদারিয়া। এই দুই বিলে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ওই দুই বিলের অধিকাংশ খেতের ধান পেকে গেছে। তাই ধান কাটা শুরু হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠের ৮০ শতাংশ জমির ধান কাটার উপযোগী হয়েছে। মনিরামপুর উপজেলার লখাইডাংগা গ্রামের প্রতাপ মন্ডল বলেন, তার তিন বিঘা জমির ধান পেকেছে। ধান কাটাও শুরু করেছেন তিনি। কুলটিয়া গ্রামের বিদ্যুৎ মন্ডল বলেন, তার অর্ধেক জমির কাটা শেষ। তবে বাজেকুলটিয়া, আলীপুর, পোড়াডাঙ্গা, নেহালপুর, সুজাতপুর গ্রামের অনেক কৃষকই শঙ্কায় রয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, কোনো সময় ঝড়বৃষ্টি হলে পাকা ধানে মই পড়বে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেখা মন্ডল জানান, এ বছর বিল কেদারিয়ায় মোট ৫৮০ হেক্টর জমির মধ্যে ৫১০ হেক্টর এবং বিল বোকড়ে মোট ১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমির মধ্যে ৭৩০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে।

উবশি ধানের ফলন গড়ে ৩৩ শতকের বিঘাপ্রতি ২২ মণ ও হাইব্রিড ধানের ফলন বিঘাপ্রতি ২৮ মণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close