reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ২৪ মার্চ, ২০২৪

আল মামুন তালুকদারের হাসির গল্প

বিয়ের গল্প

গত বছর আব্বাকে মিনমিন করে বললাম, ‘আব্বা- বিয়ে করতে মন চায়।’ আব্বা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘বাবা- তোমার কী কোনো লজ্জা-শরম নাই? এত বেশরম হলে কবে থেকে? আগে রোজগার শিখো, তারপর বিয়ে করো; আমার ঘাড়ে বসে বসে তুমি খাচ্ছ আবার তোমার বউও এসে খাবে এটা আমি সহ্য করবো না।’ কয়েক মাস রোজগারের চেষ্টাও যে করিনি তাও না। কিন্তু রোজগার তো আর বললেই হয় না। এ জন্য চাই সাধনা, চাই ধৈর্য। এর মধ্যে আমার কোনোটাই নেই। আমি এতই অধৈর্য যে, ট্রেনের টিকিট কাটার সময় লাইনে দাঁড়িয়ে যে টিকিট সংগ্রহ করব এ ধৈর্যও নেই। এই ধৈর্যহীনতার জন্য বেশ কয়েকবার লজ্জায় পড়তে হয়েছে।

তার কিছুদিন পর আবার দুপুরে খেতে এসে আমার রুম থেকে আব্বাকে শুনিয়ে শুনিয়ে জোরে জোরে বললাম, আম্মা- এক সপ্তাহ সময়, এর মধ্যে বউ না দেখলে বউ অটো চলে আসবে ঘরে। আমার সাফ সাফ কথা। আম্মা মুখে আঁচল গুঁজে সারাটা বিকেল কাঁদলেন বিলাপ করে। কেন কাঁদলেন কিছুই বুঝলাম না। হয়তো কষ্টে কাঁদলেন। বিয়ে করা মানে ভালোবাসার পাত্র থেকে কিছু ভালোবাসা ধীরে ধীরে সরে যাওয়া। আব্বা কোনো কথা বললেন না। আব্বার নীরবতা আবার ভয়ংকর। ভাবলাম কি করে না করে কে জানে? রাতেই দেখি ভগ্নিপতিকে ফোন দিয়ে বলছে আমার জন্য বউ দেখার জন্য। খুশিতে মনটা ভরে গেল। বিয়ের আনন্দের মতো এত নির্মল পবিত্র আনন্দ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। এই আনন্দের কোনো তুলনা হয় না। আশি বছরের বুড়োকেও বিয়ের কথা বললে দাঁত বের করে একটা হাসি দেয়। যেন কি মজার কথা। আমার বয়স সবে ২২ বছর। আমার নিরানন্দ হওয়ার তো কোনো কারণ নেই। আমার বড় বোনকে নিয়ে বেশ কয়েকটা মেয়েও দেখা হলো। মেয়ে দেখতে গেলেই তার বাহানা। এই ভালো না, ওই ভালো না। এইগুলো আমার ভারী বিরক্ত লাগে। রাগে শরীর ঝাঁ ঝাঁ করে। ভাই এত দিক দিয়ে কি মেলানো যাবে? আচানক কারবার! একটু চেহারা-সুরত ভালো, রান্না-বান্না পারলেই হলো। একটা মেয়ে মানুষের মধ্যে আর কি চাই! ব্যাস। না উনি চায় সুন্দরী, স্বাস্থ্যবান, ধনী, বংশ, ছোট পরিবার আবার কোঁকড়া চুল তার পছন্দ না। চুল হতে হবে লম্বা-সিস্কি। যে কয়টা মেয়ে দেখলাম সবগুলো মেয়ে আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে। সবগুলো মেয়ে বিয়ে করার মতো। কিন্তু আমার বড় বোনটার জন্য আমার আরো পেছাতে হলো। আমি সারা জীবন সরল সহজভাবে চলতে অভ্যস্ত, কিন্তু বিয়ে করতে গিয়ে দেখলাম মানুষের মধ্যে কত জটিলতা, কত প্যাঁচের রাজনীতি। সামান্য ভুলত্রুটি নিয়ে রাগারাগি মারা-মারি লেগে যায়। এ বলে বিয়েতে আসবে না, ও বলে বিয়েতে আসবে না। নিজের পরিবারের লোকজনই বেঁকে বসে দিনে তিনবার। কি আচানক ব্যাপার!

আষাঢ় মাসের ২১ তারিখ আমার বিয়ে হলো। মাস জুড়ে কোনো বৃষ্টি নেই, বিয়ের দিন এত বৃষ্টি দেখে আমার মনটাই ভালো হয়ে গেল। বৃষ্টি যে কি দারুণ পছন্দ আমার এ কথা কাউকে আমি আজও বোঝাতে পারিনি। ছোট্ট একটা ট্রলারে করে শ্বশুরবাড়িতে গেলাম। মোটে বড়যাত্রী দশ-বারো জন। যাকে বলে গরিবী বিয়ে। আমাদের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ির মাত্র চার মাইল রাস্তা। আধা ঘণ্টার পথ। বিয়ের দিন নিজেকে রাজা-রাজা মনে হলো। নিজেকে নতুন করে দেখার অনুভব করলাম। এই মগড়া নদী, পাগলা বিল, রাস্তার পাশে সারি সারি তালগাছ, আমাদের বাউসা বাজার, গ্রামের পরিচিত মেঠোপথ, মানুষজন কত চেনা আমার অথচ বিয়ের দিন এসব কিছু আমার কাছে নতুন রূপে দেখা দিল। নতুন করে এই জগৎকে দেখে পুলকিত হলাম। আহা- জীবন তো ফেলনার নয়। নিজের প্রতি কত অবহেলাই না করেছি! নিজেকে এক অনন্য মানুষ হিসেবে অনুভব করলাম সেদিন। যেকোনো দিন আমার দিকে ফিরেও তাকায়নি সেও বিয়ের দিন এলো আমাকে দেখতে। লজ্জায় মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। বৃষ্টি দেখে সবাই বিরক্ত। আম্মা কতক্ষণ বিচানায় বিলাপ করে কাঁদলেন এই বৃষ্টির জন্য। বৃষ্টি নাকি কুলক্ষণ। এমন কথাও কি জগতে আছে? আব্বাও যে খুব খুশি হয়েছে তাও না। দেখলাম কয়েকবার কয়েকজনের কাছে বলছে ‘আমি দায়িত্ব শেষ করলাম।’ দায়িত্ব শেষ করার কি আছে তা মাথায় ধরল না। বিয়ের পর থেকে ভালোই সংসার চালাচ্ছি। কাজ-কামে সুন্দর মন বসছে। আমার মাঝে ধৈর্যের কোনো কমতি দেখি না এখন। মাঝে মাঝে নিজেই অবাক হই আমার পরিবর্তন দেখে। কি দারুণ চলছে আমার সংসার!

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close