মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ

  ২৭ নভেম্বর, ২০২৩

সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ৭৫-এ পদার্পণ

রাজধানীর পুরান ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ। লাল ইটের বাতিঘরখ্যাত এই বিদ্যাপীঠটি ১৯৪৯ সালের ১১ নভেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষক সংকটসহ ভৌত অবকাঠামোগত বেশ কিছু সমস্যা নিয়ে কলেজটি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরবের ৭৪ বছর পূর্ণ করেছে।

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর উপাধি অনুসারে শুরুর দিকে এই কলেজটির নাম রাখা হয়েছিল ‘কায়েদণ্ডই-আজম কলেজ’। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু ও গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামানুসারে রাখা হয় ‘শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ’।

১৯৮৪ সালের ১ নভেম্বর কলেজটি সরকারি কলেজে পরিণত হলে এর নাম হয় ‘সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ’। ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষে কলেজটিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু করা হয়। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্যে ও শিক্ষার গুণগত উন্নয়নের জন্যে ২০১৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার যে সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়েছে সেগুলো মধ্যে অন্যতম হলো ‘সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ’। এই কলেজটিতে বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকের পাশাপাশি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নের ব্যবস্থা রয়েছে। কলেজটি প্রতিষ্ঠার পরই শিক্ষাক্ষেত্রে দ্রুত বদলাতে থাকে পুরো পুরান ঢাকার চিত্র। কিন্তু সেই সোহরাওয়ার্দী কলেজই এখন নানা সংকট আর সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

তুলনামূলক অবকাঠামো উন্নয়নে পিছিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পর্যাপ্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারছেন না কলেজ প্রশাসন। বর্তমানে কলেজটিতে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী, ১০১ জন শিক্ষক ও বিভিন্ন অনুষদের ১৭টি বিভাগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থা চালু থাকলেও নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। সোহরাওয়ার্দী কলেজের ক্যাম্পাস এক একরের অল্প একটু বেশি। ক্যাম্পাসটিতে লাইব্রেরীর জন্য আলাদা কোনো ভবন বা সুপরিসর কক্ষ নেই। মসজিদ পাশে নামকাওয়াস্তে মূল লাইব্রেরি। কলেজ লাইব্রেরিতে ক্যাটালগ নেই, বই ইস্যু এবং ফেরত নেওয়ার ব্যাপারেও অব্যবস্থা বিদ্যমান। নেই ক্লাস নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা, যেগুলো আছে তাও আবার আয়তনে পর্যাপ্ত নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার প্রায় ৪ বছর হলেও এখনো নানা রকম অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় হতাশ শিক্ষার্থীরা। সাত কলেজের মধ্যে ছয়টিতেই রয়েছে একাধিক আবাসিক হল কিন্তু সোহরাওয়ার্দী কলেজে নেই কোনো হলের ব্যবস্থা। এই নিয়ে নানা ভোগান্তিতে রয়েছে শিক্ষার্থীরা। আবাসিক এই সমস্যার সমাধান কবে মিলবে তা আদতে কেউ জানেন না। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ আসে গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। কলেজের ভর্তি হওয়ার পর আশপাশের এলাকায় মেস বা বাসা বাড়া করে শুধু পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া তাদের অধিকাংশের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে তাদের বাধ্য হয়ে খণ্ডকালীন চাকরিতে যোগ দিতে হয়। এজন্য তারা পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না। তাই ব্যাহত হচ্ছে তাদের পড়াশোনা। দিনে দিনে এই আবাসন সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দী কলেজের কোনো নিজস্ব পরিবহনব্যবস্থা নেই। এ নিয়ে ঢাকার অদূরের শিক্ষার্থীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। প্রতিষ্ঠার এত বছর পরেও বাস সার্ভিস দিতে না পারায় কলেজের প্রতি হতাশ শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এজন্য প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা বলছে। তারা দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চায়।

কলেজের জায়গা বৃদ্ধীকরণ, ডিআইটি মার্কেটে হল নির্মাণ, কলেজে খেলার মাঠ সম্প্রসারণ করা, যাতায়াতের জন্য কলজ বাসের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ক্লাসরুমের, লাইব্রেরি সংস্করণ, ক্যাম্পাসে ক্যান্টিন চালু করাসহ দীর্ঘদিন ধরেই বেশ কিছু দাবি জানিয়েছে আসছে।

কিন্তু দীর্ঘ ৭৪ বছরে দেশে আমূল পরিবর্তন হলেও তেমন পরিবর্তন হয়নি সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে। শিক্ষার্থীদের নানা অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ ও সম্প্রতি ‘ছাত্র অধিকার পরিষদ’ ছাড়া ক্রিয়াশীল কোনো ছাত্র সংগঠন নেই। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি স্থিতিশীল হলেও শিক্ষার্থীদের চাহিদা মেটাতে এক প্রকার ব্যর্থ সংগঠনগুলো। উন্নয়নের বিস্ময় গোটা বাংলাদেশ হলেও অজানা কারণেই পুরান ঢাকার এই কলেজটিতে তেমন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে, এই উন্নয়নের মহাসড়কে কলেজটিকে শামিল করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

কলেজটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোহসিন কবীর বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে জায়গা ও স্থাপনা। কলেজটির এত বছর পেরিয়ে গেলেও ভৌত অবকাঠামোর সমস্যা সমাধান হয়নি। আর আমাদের কলেজে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পদ নেই। তবু শিক্ষামন্ত্রী আমাদের কলেজের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য মাউশি থেকে কিছু অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’

কলেজটি নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমরা শিফট করে ভাগ করে ক্লাস পরীক্ষা নিচ্ছি। আমাদের অতি শিগগিরই একটি ভবন প্রয়োজন। সেজন্য আমরা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আলাপ-আলোচনা করে নতুন জায়গার জন্য চেষ্টা করছি যেন আমাদের সংকটগুলো কিছুটা হলেও দূর করা যায়।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close