আবদুর রউফ, ধামরাই ( ঢাকা)

  ০৮ ডিসেম্বর, ২০২৩

যুগলবন্দি বট-পাকুড়

বট-পাকুড়ে কবিতা ‘এই চরে ওই হালটার কোণে বিঘে দুই ক্ষেত ভরি

বট ও পাকুড়ে দোহে ঘিরে ঘিরে করি আছে জড়াজড়ি

গায়ের লোকেরা নতুন কাপড় তেল ও সিঁদুর দিয়া

ঢাকঢোল পিটি গাছ দুইটির দিয়ে গেছে নাকি বিয়া।’

কবি বন্দে আলী মিয়ার এ কবিতায় উঠে এসেছে বট-পাকুড়ের নিবিড় সম্পর্কের কথা। পরিত্যক্ত ভবন, পুরোনো বাড়ি, ঘরের দেয়ালেসহ নানা জায়গায় বট-পাকুড় গাছ বেড়ে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু এ গাছ বাড়তে বাড়তে বিশালকার ধারণ করেছে এমনটি বিরল। তবে এরকম বড় অকারের এক বট-পাকুড় গাছের দেখা মেলে ঢাকার ধামরাইয়ে।

স্থানীয়দের দাবি, ৫০০ বছর আগে স্থানীয় দেবীদাস বংশের পূর্বপুরুষরা গাছ দুটি রোপণ করেন। একে-অপরকে জড়িয়ে তারা বেড়ে উঠতে থাকে। ওইসময় বটগাছকে নারীর রূপ আর পাকুড় গাছকে মনে করা হতো পুরুষের রূপ হিসেবে। ওইসময় ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে দাস বংশের পূর্বসূরিরা ঢাকঢোল পিটিয়ে সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ দিয়ে ব্রাহ্মণের মাধ্যমে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করিয়ে গাছ দুটির বিয়ে দেন। সেই বিয়েতে যোগ দিয়েছিলেন বহু মানুষ। সেখান থেকেই গাছ দুটি স্বামী-স্ত্রী বলেও পরিচিত। বর্তমানে গাছ দুটির অবস্থান ৫ বিঘারও বেশি জমিজুড়ে। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থী আসেন এ যুগল গাছ দেখতে।

ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের যাদবপুর ইউনিয়নের সাইট্টা গ্রামে রয়েছে এ বট-পাকুড় গাছ। প্রথমে এ গ্রামে ৬০টি পরিবার নিয়ে এখানে বসবাস শুরু হয়। তাই এ গ্রামের নাম ছিল ষাটটি। পরে ষাটটি থেকে এ গ্রামের নাম হয় সাইট্টা। বর্তমানে এ গ্রামে ৪ শতাধিক মানুষের বসবাস রয়েছে। এ এলাকার প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষই হিন্দু সম্প্রদায়ের। এ গাছ দুটিকে গ্রামের নামে অনেকে সাইট্টা বটগাছও বলে থাকেন। লোকমুখে প্রচলিত আছে, বহু আগে একবার এ বট-পাকুড় গাছের নিচ দিয়ে ইটভর্তি একটি ট্রাক যাওয়ার সময় এ গাছের ডালের সঙ্গে আটকে যায়। ওই ট্রাকচালক বটগাছের ডালটি কেটে মাটিতে ফেলে ট্রাক নিয়ে চলে যান। পরে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের পরামর্শে বটগাছের নিচে কয়েক কেজি বাতাসা আর মোমবাতি দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার পর ওই ট্রাকচালক সুস্থ হন।

এছাড়া কার্তিক সরকার নামে এক কৃষকের জমিতে বটগাছের ডাল ছড়িয়ে পড়লে তার জমিতে চাষ করা সমস্যা হয়ে যায়। তিনিও তার জমিতে যাওয়া বটগাছের ওই ডালটি কেটে ফেলেন। এরপর সেই কৃষকও অসুস্থ হইয়ে পড়েন। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর অনেক গুরুজনদের পরামর্শে ওই বটগাছের নিচে একটি মন্দির নির্মাণ করে সেখানে পূজা-অর্চনা করতে থাকেন। এরকমই অনেক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে এ বট-পাকুড়-গাছ নিয়ে। এরপর থেকে ভয়ে এলাকার আর কেউ ওই গাছের ডালপালা কাটেনি। ফলে গাছ দুটি বর্তমানে অসংখ্য ডাল শিকড় ছেড়ে দিয়ে ৫ বিঘা জমি দখল করে আছে। প্রতি বছরই বট-পাকুড় গাছের নিছে থাকা মন্দিরে পূজা করেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন।

৬০ বছর বয়সের নিলকমল নামে এক বৃদ্ধ জানান, আমরা আমাদের মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনে আসছি এ গাছ দুটি স্বামী-স্ত্রী। গাছ দুটি ৫০০ বছরের পুরোনো। এদের একেকটি শিকড় এখন একটি গাছের থেকেও মোটা হয়ে গেছে। এদের ডালপালা কেউই কাটে না। প্রতিদিন এখানে অনেক মানুষ আসে এ গাছ দেখতে। প্রতি বৈশাখ মাসে এখানে মেলা হয়। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবে এখানে মানুষের সমাগম বেশি হয় এবং বিভিন্ন দোকানপাট বসে।

সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে গাছটির অবস্থান। সেখানে গাছ দেখতে ভিড় জমিয়েছেন অনেকে মানুষ। নাজমুল ইসলাম নামে এক দর্শনার্থী জানান, অনেক কাছে শুনেছি এ গাছ দুটির কথা। তখন থেকেই গাছ দুটি দেখার খুব ইচ্ছা ছিল। আজ পরিবারসহ আসছি গাছ দুটি দেখতে। দেখে খুব ভালো লাগছে। এত বড় গাছ আসলে কখনো দেখা হয়নি। গড়মের দিনেও এ গাছের নিচে থাকে ঠাণ্ডা। তাই গরমের মধ্যেও মানুষের ভিড় থাকে। মনে হচ্ছে এখানেই থেকেই যাই। আর গাছ দুটি একে-অপরকে তাদের ডালপালা ও শিকড় দিয়ে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, যা দেখতে মনোমুগ্ধকর এবং এতে সত্যি মনে হচ্ছে যে এ গাছ দুটি স্বামী-স্ত্রী।

উপজেলার আমড়াইল গ্রামের ওয়াহিদ ইসলাম নামে দর্শনার্থী বলেন, আমার বাড়ি পাশের গ্রামে। মাঝেমধ্যে এখনে ঘুরতে আসি। ছোটবেলা থেকেই আমার এখনে বেড়ে ওঠা এবং জায়গাটা আমার খুবই পছন্দের। আমি মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনছি বট-পাকুড় গাছটি অনেক পুরোনো। পাশে মন্দিরটিও পুরোনো। আর এখানে এলেই মন ভালো হয়ে যায়। মনটা ভালো করার জন্য এখানে একবার ঘুরতে আসা উচিত।

ধামরাই উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. মোতালেব হোসেন জানান, ওইখানে প্রায় ২ একর জায়গা আছে। পাশেই রয়েছে হিন্দুদের মন্দির, বট-পাকুড় গাছ দেখতে অনেক পর্যটক আসে, তবে রাস্তার অভাবে গাড়ি নিয়ে পর্যটক যেতে পারে না। তাছাড়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই, যদি রাস্তাঘাট করা হয় এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়া যায়, তাহলে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসবে বলে জানান তিনি। এছাড়া বট-পাকুড়ের চারদিকে সৌন্দর্যবর্ধনে কাজ হয়, তাহলে ধামরাই উপজেলার মধ্যে সুন্দর একটা পর্যটনকেন্দ্র হবে।

এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকি বলেন, গাছ দুটি ধামরাইয়ের ঐতিহ্য। এ গাছ অন্য গাছকে ঘিরে এখানে ছোট একটা পর্যটন তৈরি হয়েছে। আগে এখানে যাওয়ার রাস্তা কাঁচা ছিল। বৃষ্টির দিনে দর্শনার্থীদের যাওয়া-আসা কষ্ট হতো। এখন ইট দিয়ে রাস্তাটি উন্নত করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমাদের এখন জরুরি দরকার হচ্ছে ন্যাচারাল পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়। দিন দিন জায়গাটা আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। এটা যেন কেউ নষ্ট করতে না পারে, সংরক্ষিত থাকে, সেজন্য আমরা সবসময় খোঁজখবর রাখি, বিভিন্ন সময়ে পরিদর্শনে যাই, অনেক ডিজিটালরা আসে। এটার পরিচর্যা অব্যাহত থাকবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close