এস এ এইচ ওয়ালিউল্লাহ

  ০৬ নভেম্বর, ২০২৩

সমুদ্রযাত্রায় এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা

হঠাৎ করেই পরিকল্পনা সেন্টমার্টিন যাব আমরা। সামনেই তিন-চার দিনের টানা ছুটি পাওয়া যাচ্ছে। সেই ছুটিকেই পুঁজি করে আমি, তারেক, রাজ্জাক মামা ও জিহাদ ক্যাম্পাস থেকে রওনা দিই। চট্টগ্রামে এসে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন আজাদ ভাই আর জিয়া। চট্টগ্রাম থেকে একসঙ্গে ছয়জন যাত্রা করি টেকনাফের উদ্দেশে। আগেই খোঁজ নিয়ে রেখেছিলাম, টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে শুধু ‘এমভি বার আউলিয়া’ নামক যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করেছে। তবে পূর্বে টিকিট বুকিং না দেওয়ায় দমদমিয়া ঘাটে গিয়ে পড়তে হলো বিপাকে। ওইদিন জাহাজের স্ট্যান্ডিং টিকিট বন্ধ রাখা হয়েছে। আমাদের মধ্যে শুধু জিয়া জাহাজে উঠে যেতে পারে। আমরা বাকি পাঁচজনই রয়ে যাই জেটিতে। সময়ক্ষেপণ না করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিই, টেকনাফের কায়ূকখালিয়া ঘাট থেকে স্পিডবোটে চেপে সাগর বক্ষের নীল জলরাশি মাড়িয়ে সেন্টমার্টিনে যাব আমরা। কায়ূকখালিয়া ঘাটে গিয়ে আমাদের পাঁচজনের সঙ্গে যুক্ত হয় তিনজনের আরেকটি দল। আমাদের বোট টেকনাফ থেকে রওনা দেওয়ার পর কায়ূকখালিয়া বিজিবি চেকপোস্টে রিপোর্টিং শেষে নাফ নদীতে ঢুকে পড়ে। খানিকটা রৌদ্রোজ্জ্বল আর মেঘমুক্ত পরিবেশেই আমরা স্পিডবোটে উঠেছিলাম। কোনোভাবেই আঁচ করার সুযোগ ছিল না, কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রুদ্ধশাসকর এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। আমাদের বোট নাফ নদীতে প্রবেশের অল্প সময়ের মধ্যেই হঠাৎ মিয়ানমারের আকাশ থেকে কালো মেঘ ছুটে এসে নাফ নদীর আকাশ পুরোপুরি ঢেকে দেয়। আচমকা শুরু হয় প্রচণ্ড বৃষ্টি আর ঝড়োবাতাস। মুহূর্তেই রুদ্রমূর্তি রূপ ধারণ করে নাফ নদী। আমাদের অনুরোধে স্পিডবোট চালক বোটটিকে ধীরে ধীরে শাহপরীর দ্বীপে নিয়ে নোঙর ফেলেন। সেন্টমার্টিন থেকে ফিরতি স্পিডবোট চালকদের থেকে খবর পাওয়া গেল সাগর বেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে। প্রায় ১ ঘণ্টা শাহপরীর দ্বীপে অপেক্ষা করি সাগর শান্ত হওয়ার আশায়। এরপর শাহপরীর দ্বীপ থেকে বোট যাত্রা শুরু করে সাগর বক্ষে।

ধীরে ধীরে আমাদের বোট নাফ নদীর মোহনা ছেড়ে পুরোপুরি সাগরের নীল জলরাশিতে ঢুকে পড়ে। আবারও শুরু হয় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এবং উদোম হাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝিরি বৃষ্টি এবং উদোম হাওয়া রূপ নেয় ভয়ংকর প্রলয়ংকরী তাণ্ডবে। দৈত্যের মতো বিকট গর্জন করে সাগরের নোনা পানির ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে আমাদের স্পিডবোটের ওপর। এক একটা ঢেউয়ের ঝাপটাতে মনে হচ্ছিল এই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল! ভয়ে বুক শুকিয়ে কাঠ সবার। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ঢেউ মাড়িয়ে আমাদের বোট এগিয়ে যাচ্ছিল গন্তব্যের দিকে। কারণ আমরা গভীর সমুদ্রে ঢুকে পড়েছি, পেছনে ফিরে যাওয়ার আর সুযোগ নেই। বড় বড় ঢেউয়ের ঝাপটা বোটের তলায় এমনভাবে আঘাত করছিল, মনে হচ্ছিল যেকোনো সময় বোটের তলা ফেটে যাবে।

এভাবেই কিছুদূর এগোনোর পর বিস্তৃত নীল জলরাশির মাঝে আমাদের চোখের লেন্সে ধরা পড়ে সেন্টমার্টিন। তখনো আমরা গভীর সমুদ্রের ‘গোলগড়া’ নামক এলাকায় ছিলাম। কিছুটা আশা তবু সঞ্চার হয় প্রাণে। মনে মনে ভাবি ওই তো দেখা যাচ্ছে সেন্টমার্টিন! আর অল্প সময় লাগবে, কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাব। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই চোখের সামনে ঘটে যায় এক লোমহর্ষক ভয়ংকর দুর্ঘটনা। হঠাৎই আমাদের সামনের বড় স্পিডবোটটি ঢেউয়ের তাণ্ডবে তলা ফেটে নিমিষেই ডুবে যায় সাগরের অথৈ জলে। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখতে পেলাম স্পিডবোটের সব যাত্রী দিগন্তহীন নীল জলরাশিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। কোনো কোনো যাত্রীর গায়ে লাইফ জ্যাকেট ছিল, আবার অনেকের গায়েই লাইফ জ্যাকেট ছিল না। নারী-শিশু-পুরুষ সবার চিৎকারে মুহূর্তে ভারী হয়ে ওঠে শূন্য সমুদ্রের বাতাস। সাগরের গর্জন আর বিশাল বিশাল ঢেউয়ের উদ্দামতার সামনে অসহায় মানুষগুলোর বাঁচার আকুতি শোনার মতো তখন আর কেউ নেই। তাদের কাছাকাছি যেতেই শুধু একটা কথাই শুনতে পেলাম, ‘ভাই, আমাদের বাঁচান!’ সুবিশাল সাগর বক্ষে এতগুলো মানুষের বাঁচার আকুতি উপেক্ষা করে সত্যিই আমাদের সামনে এগোনোর সাহস হয়নি। নিজেদের বেঁচে ফেরার অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও থেমে যাই মানুষগুলোর চিৎকারে। দ্রুততার সঙ্গে স্পিডবোটের চালক আমাদের বোটের ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন। ঝড়োবাতাস আর ঢেউয়ের ধাক্কায় আমাদের বন্ধ বোটটি স্থির হতে পারছিল না। এমনভাবে দুলছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি উল্টে যাবে অথবা ডুবে যাবে! মৃত্যুর এক ভয়ংকর বিভীষিকা নতুন করে দিলে হানা দেয়। ভাবনায় আসে সাগরই হয়তোবা আমাদের শেষ ঠিকানা হতে চলেছে। এমন অবস্থার মধ্যে প্রথমেই তারেক এবং জিহাদ দুটি বাচ্চাকে বোটে তুলে নেয়। আজাদ ভাই এক হাত দিয়ে বন্ধ বোটের স্টিয়ারিং ধরেন এবং অন্য হাত বোটের বাইরে বাড়িয়ে দিয়ে ভাসমান আরেকজনকে ধরে রাখেন, যেন লোকটি ঢেউয়ে ভেসে না যায়। বোটচালকের সহযোগিতায় একে একে আরো তিনজন মহিলাকে বোটে ওঠানো হয়। আমাদের বোটটি ছিল অনেক ছোট; মাত্র আটজন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন। সেখানে আমরাসহ ১৪ জন অবস্থান করছি। ধারণক্ষমতা না থাকায় বাকি পুরুষদের বোটে ওঠাতে পারছিলাম না। জিহাদ এবং তারেকও বোটের বাইরে হাত এগিয়ে দিয়ে ভাসমান কিছু মানুষকে ধরে রাখে। বাকিদের জন্য আমাদের বোট থেকে আমাদের লাইফ জ্যাকেটগুলো খুলে পানিতে ছুড়ে মারি। তখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি চলছে। কী করব কিছুই মাথায় আসছে না। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে দেখি এয়ারটেল সিমে কিছুটা নেটওয়ার্ক পাচ্ছে। সেই নাফ নদী থেকেই বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে আছি আমরা। পানির কারণে ফোনের স্ক্রিন কাজ করছে না। আজাদ ভাইয়ের পরামর্শে বেশ খানিকটা চেষ্টার পর ৯৯৯-এ কল দিই। কল সেন্টারে বিস্তারিত বলার পর আমাকে যুক্ত করা হয় টেকনাফ থানায়। টেকনাফ থানা আমাদের উদ্ধারে অপারগতা প্রকাশ করে ফায়ার সার্ভিসকে যুক্ত করার কথা বলে। টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু টেকনাফ থেকে ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধার করার মতো সময় আমাদের হাতে মোটেও ছিল না। আমি বারবার অনুরোধ জানাই সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডকে খবর দেওয়ার জন্য। কল সেন্টার থেকে আমাকে জানানো হয় কোস্টগার্ড ফোন রিসিভ করছে না। তবে দীর্ঘক্ষণ প্রচেষ্টার পর সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয় কল সেন্টার। একজন মহিলাকে (ফিরোজা বেগম, স্থানীয় সাবেক ইউপি মেম্বার) বোটে তুলতে কিছুটা দেরি হয়। তার গায়ে কোনো লাইফ জ্যাকেটও ছিল না। বোটে তোলার সময়ই মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। সেন্টমার্টিন পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমাদের বোটেই মারা যান ভদ্রমহিলা।

ইতিমধ্যে রাজ্জাকদের স্পিডবোট ওদের সেন্টমার্টিনে নামিয়ে দিয়ে যতটা দ্রুত পেরেছে আবারও ফেরত আসে দুর্ঘটনা স্থলে। তৎক্ষণাৎ আমরা ভাসমান মানুষগুলোকে ওই স্পিডবোটে তুলে দিই। ওই স্পিডবোটটির ইঞ্জিনও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিকল হয়ে যায়। এরপর সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ততক্ষণে সাগরও কিছুটা শান্ত হয়ে এসেছে। কোস্টগার্ড এসে ওই বোটের সবাইকে জাহাজে উঠিয়ে নেয়। আমাদের বোটের অতিরিক্ত যাত্রীদের কোস্টগার্ডের জাহাজে তুলে দিয়ে হালকা হলে আমাদের বোটটি আবারও বিস্তীর্ণ জলরাশির উঁচু-নিচু ঢেউ ভেঙে এগিয়ে যায় সেন্টমার্টিন অভিমুখে। অবশেষে আমরা দুপুর ২টার পর সেন্টমার্টিনের জেটিতে নামতে সক্ষম হই। সেন্টমার্টিনে নামার পর মনে হচ্ছিল, জীবনে নতুন আরেকটা সূর্যোদয় হলো আজ। এতটা ভয়াবহতার মুখোমুখি আমরা কখনো কেউ হইনি। স্পিডবোটে চড়ে সাগর পাড়ি দেওয়ার ভুল সিদ্ধান্ত, সাগরে ঝড়ের কবলে পড়া, ঢেউয়ের তাণ্ডবে চোখের সামনে স্পিডবোটডুবি, এতগুলো মানুষের চিৎকার, মানুষের মৃত্যু... একসঙ্গে এতগুলো হাড় হিম করা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা আমাদের ভ্রমণ স্মৃতিতে অমলিন হয়েই থাকবে, কখনোই ভুলতে পারব না।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close