গাজী শাহনেওয়াজ

  ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২

ইসিতে জনবল নিয়োগের কর্মযজ্ঞ

ছবি : সংগৃহীত

জনবল নিয়োগের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে অন্তত এক হজার লোকবল নিয়োগ হবে সাংবিধানিক এ সংস্থায়। এই জনবলের মধ্যে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) অধীনে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শতাধিক কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য চিঠি দিয়েছে কমিশন। একই সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমতিসাপেক্ষে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ২৭২ জন কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন।

ইসির ৫১৭টি থানা নির্বাচন অফিসের জন্য সমসংখ্যক কম্পিউটার ডেটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগের কার্যক্রম রয়েছে চলমান। বিভিন্ন শূন্যপদের বিপরীতে (প্রকল্পের অধীন আউটসোর্সিং ও ইসির বিভিন্ন পদে আউটসোর্সিং ও রাজস্ব খাত) এই জনবল নিয়োগ করা হবে। এসব জনবল নিয়োগ হওয়ার পরও জনবল সংকট থাকবে কমিশনে। কারণ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পদে অবসরে যাচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। খবর ইসির দায়িত্বশীল সূত্রের।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, জনবল নিয়োগের বিষয়টি নতুন নয়; চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। তবে একত্রে অনেকসংখ্যক নিয়োগের বিষয়টি একটু নজরকাড়ার মতো। কারণ প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে প্রায় ১ হাজার জন লোকবল নিয়োগের কার্যক্রম চলমান। দীর্ঘদিন শূন্য থাকা প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণির পদে শতাধিক কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য কমিশন থেকে নিয়োগ দেওয়া কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তারা বলছেন, বিসিএসসহ নানা পরীক্ষার শিডিউল থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়াটি শুরু করতে বিলম্ব হবে। আর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমতিসাপেক্ষে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর ও অফিস সহায়ক পদে লোকবল নিয়োগের উদ্যোগ নিলেও পদ সংখ্যার বিপরীতে কয়েক লাখ আবেদনকারী হওয়ায় জায়গা সংকটের কারণে পরীক্ষা কার্যক্রম হাতে নিতে সময় লাগছে।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচন কমিশনে থানা-উপজেলা কর্মকর্তা হিসেবে বিএনপি সরকারের আমলে ৩২০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ পায়। বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় এসব কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছিল এমন অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কিছু নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ পেয়েছিল। পরবর্তীতে ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দীন সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্বে এসে কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। সাবেক সচিব ড. এ টি এম শামসুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) করে তিন সদস্যের অপর দুই নির্বাচন কমিশনার হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেণ (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ও মোহাম্মদ ছহুল হোসাইন।

এ কমিশন দায়িত্বে এসে ওই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ বিভাগের তত্ত্বাবধানে পুনর্মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হয়। এ পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত মার্ক পেয়ে ২৩৫ জন উত্তীর্ণ হন। এরমধ্যে অনেকেই বিসিএসসহ নানা পদে চাকরি পেয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যান। বর্তমানে ওই নিয়োগের ১৮৮ জন উপসচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব ও থানা-উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে সারা দেশে ইসির অধীনে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ৮৫ জন মূল্যায়ন পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। অকৃতকার্যদের বাদ দিয়ে ড. হুদা কমিশন কৃতকার্যদের নিয়োগ দেন।

নিয়োগ প্রক্রিয়ার পর সিইসি ড. শামসুল হুদা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। তার উপলব্ধির জায়গা থেকে ওই সময়ে বলেছিলেন, থানা-উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে বিএনপির সময়ে যে ৩২০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের অযোগ্য বলা হলেও কথাটি সঠিক না। কারণ আইবিএ পরীক্ষায় অনেকেই এক্সাট্রা অডিনারি মেধাসম্পন্ন কর্মকর্তার পরিচয় রেখেছেন। যারা অকৃতকার্য হয়েছেন, তারা সবাই মেধাসম্পন্ন। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হওয়ায় হয়তো তারা উত্তীর্ণ হওয়ার মতো নম্বর না পেলেও সবাই কাছাকাছি নম্বর পেয়েছিলেন। কিন্তু নিয়ম মানতে তাদের বাদ দিয়ে বাকিদের চাকরিতে বহাল রাখতে হয়েছে।

এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে ৮৫ কর্মকর্তা আদালতের শরণাপন্ন হন। পরে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনাল আদালত ২০১০ সালে ১২ এপ্রিল তাদের নিয়োগ দিতে নির্বাচন কমিশনকে আদেশ জারি করে। সেই আদেশবলে নির্বাচন কমিশন ২০১০ সালের ১৩ মে ৮৫ কর্মকর্তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ চারটি লিভ টু আপিল করে। পরবর্তীতে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারক ২০১০ সালের ২৯ এপ্রিল আপিল ট্রাইব্যুনালের আদালতের রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করেন এবং আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে বিষয়টি শুনানির জন্য পাঠান। এরপর ২০১১ সালে রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক আপিল করে। শুনানির পর গত ১ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালত তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়।

এতদিন আদালতে মামলা থাকায় ওই পদ সংরক্ষণ রেখে বাকি শূন্যপদে লোকবল নিয়োগ দিয়ে আসছিল কমিশন। সম্প্রতি সংরক্ষিত শূন্যপদ পূরণে পিএসসিতে পত্র দেয় কমিশন। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগ দিতে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে পাবলিক সার্ভিস কমিশন।

ইসির জনবল ব্যবস্থাপনা শাখার সহকারী সচিব মোহাম্মদ শহীদুর রহমানের ২৬ সেপ্টেম্বর (সোমবার) স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, আপিল বিভাগের সিভিল আপিল নং ২১২০১১, ২২২০১১, ২৩২০১১ ও ২৪২০১১-এর ০১-০৯-২০২২ তারিখের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের চাকরিচ্যুত ৮৫ জন উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ১৩ মে ২০১০ তারিখের নিয়োগ ৩(২৫)২০১০১৮১নং প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাকরিতে পুনর্বহালের আদেশটি এতদ্বারা নির্দেশক্রমে বাতিল করা হলো। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

এদিকে, স্মার্টকার্ড প্রকল্পসহ কমিশনের চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, আউটসোর্সিং ও রাজস্ব খাতেও কিছু জনবল নিয়োগের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। ইতোমধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগের অনুমতি পেয়েছে কমিশন। এরমধ্যে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর পদে ৫১৭ জন ও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (আউটসোর্সিং ও রাজস্ব খাতে) ২৭২ জন লোকবল নিয়োগ হবে। কর্মচারী পর্যায়ের ২৭২ জন নিয়োগের বিপরীতে প্রায় ৩ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। একইভাবে ৫১৭ জনের বিরুদ্ধে কয়েক লাখ আবেদন জমা হয়েছে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষা নেওয়ার কেন্দ্র রাজধানীতে না থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়াটি ঝুলে আছে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ইসিতে জনবল,নিয়োগের বিশাল কর্মযজ্ঞ
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close