এম এ মাসুদ

  ২৫ নভেম্বর, ২০২১

যৌতুক একটি অনৈতিক ও অমানবিক প্রথা

প্রতীকী ছবি

সমাজ সৃষ্টির শুরু থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ছিল। আর সমাজ আছে বলেই সামাজিক সমস্যাও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক সমস্যাগুলো না কমে বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তেমন একটি সামাজিক সমস্যা হলো যৌতুক প্রথা। যা শুধু নিন্দনীয় নয়, অমানবিকও। যার নির্মমতার শিকার বা বলি হচ্ছেন নারীরা।

যৌতুক নামক এ অভিশপ্ত প্রথার জন্য সমাজে কন্যা হয়ে জন্ম নেওয়াটাই যেন আজন্ম পাপ। যেমনটি ছিল আইয়ামে জাহেলিয়ার সময়। তবে পার্থক্য হলো, ওই যুগে কন্যা সন্তান পাপ বা সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে ভেবে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো আর বর্তমান সমাজে কবর দেওয়া না হলেও বিয়ের পর যৌতুক নামক অমানবিক প্রথার কারণে নির্যাতনে ঘটছে অকাল মৃত্যু। সেই মৃত্যু হয় স্বামী বা স্বামীর পরিবারের লোকজনের নির্যাতনে অথবা কখনো নির্যাতনের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।

বাবার সম্পত্তিতে ভাগ না পাওয়াজনিত কারণে হিন্দু সমাজে যৌতুক প্রথার উৎপত্তি হলেও কালক্রমে মুসলিম সমাজেও তা ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে। যদিও বা মুসলিম সমাজে নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার তবুও যৌতুক যেন এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। হিন্দু সমাজের বিয়েতে দেখা যায়, যৌতুকের বাইরে ছেলে পক্ষের বাড়িতে বিয়ের খরচ বাবদ বাড়তি টাকা দিতে হয় যা বাড়ি খরচ নামে পরিচিত। ঠিক এমন চিত্র মুসলিম সমাজেও ঢুকে পড়েছে। রেহাই মিলছে না কন্যা সন্তানের বাবা-মার যৌতুকের থাবা থেকে। যৌতুক নামক এ অমানবিক প্রথা সমাজে মানুষের মনে এমনভাবে প্রথিত হয়েছে যে, কন্যা সন্তান মানেই এখন বাবা-মার কাছে তা কন্যাদায়ে পরিণত হয়েছে । আর এ জন্যই ‘কন্যাদায়গ্রস্ত’ শব্দের মতো অমানবিক শব্দ এখন শুধু নাটক, সিনেমা, গল্প বা উপন্যাসে নয় বাস্তবেও শোনা যায়।

একটি কন্যাসন্তান জন্মের পর দ্বিতীয় সন্তানের বেলায় লিঙ্গ নির্ধারণ এখন নিত্য ঘটনা। টেস্টে কন্যাভ্রূণ হলেই স্বামী বা পরিবারের সদস্যদের মন খারাপ, ঘটানো হয় গর্ভপাত। কী নিষ্ঠুরতা কন্যাভ্রুণের প্রতি! কারণ হিসেবে দায়ী করা যেতে পারে যৌতুক নামক অভিশপ্ত প্রথাকে। শুধু তা নয়, কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য যৌতুকের ভয়ে ঘটছে বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনাও। শুনেছি, বিধবা এক ভিখারি মায়ের মুখে মেয়ের বিয়েতে না কী লাখ টাকা যৌতুক দিতে হবে। ভাবা যায়! এ ছাড়া পথেঘাটে তো হামেশাই দেখা মেলে ছেলে পক্ষের চাহিদা মেটাতে কন্যাদায়গ্রস্ত অসহায় বাবা-মাকে সমাজে হাত পেতে সাহায্য চাইতে। স্বস্তি মেলে না মেয়েকে উচ্চ শিক্ষিত কিংবা চাকরিজীবী বানিয়েও। তখনও গুনতে হয় অভিভাবকদের যৌতুকের অর্থ। তবে তা না কী আরও অনেক বেশি!

পত্রিকার পাতা উল্টালেই প্রতিদিন চোখে পড়ছে নারী নির্যাতনের বিভিন্ন খবর। নারী নির্যাতনের মূলে রয়েছে যৌতুক নামক এ অমানবিক প্রথা, যা গ্রাস করেছে আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে। পাত্রের যোগ্যতা ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় যৌতুকের পরিমাণে তারতম্য হয়ে থাকে। কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মা তাদের জমিজমা, ভিটে বিক্রি করে কিংবা গ্রাম্য মহাজনদের কাছে চড়া সুদে অর্থ ধার নিয়ে মেয়েকে পাত্রস্থ করছেন। সাথে যৌতুক হিসেবে দিতে হচ্ছে গহনা, মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, ফ্রিজ, ঘরের আসবাবপত্র ও নগদ অর্থসহ রান্নার তৈজসপত্র। বিয়ে বাড়িতে খাবার নিম্নমানের বা কম হলে হয় মারামারি এমনকী প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটতে দেখেছি পত্রিকার পাতায়।

তবে কন্যাদায়গ্রস্ত এক বিধবা মাকে যখন মেয়ের বিয়ের জন্য দেহের কিডনি বিক্রি করে দিতে হয়, তখন সমাজের জন্য তা লজ্জাজনক।

চলতি বছরের ২৩ মার্চ একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবরের তথ্যমতে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার আহম্মেদাবাদ বোড়াই গ্রামের জোছনা বেগম স্বামীর মৃত্যুর পর দুই মেয়েকে নিয়ে পড়েন বিপাকে। শুরু হয় খুব কষ্টের দিন। এক বেলা খাবার জুটলে তো আরেক বেলা জুটতো না। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন ওই নারী। মেয়েরা বড় হয়ে উঠছে, বিয়ে দিতে হবে আর এ জন্য প্রয়োজন অর্থের। চিন্তায় পড়েন যান তিনি। হঠাৎ শুনতে পান একজনের একটি কিডনি নষ্ট। জোছনা সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তাকে একটি কিডনি দেবেন এবং বিনিময়ে অনেক টাকা পাবেন। সেই টাকা দিয়ে মেয়েদের বিয়ে দিবেন। এমন আশায় তিন লাখ টাকায় একটি কিডনি বিক্রি করেন তিনি। মেয়ের বিয়েতে যৌতুকের চাহিদা মেটাতে গিয়ে মায়ের কিডনি বিক্রির এমন ঘটনা সমাজে বিরল। এমন ঘটনা বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত করেছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ গত ৩১ ডিসেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো তথ্য বলছে, ২০২০ সালে যৌতুকের কারণে নির্যাতন হয়েছে ১১৭ জন, তন্মধ্যে ৫২ জন যৌতুকের কারণে হত্যা হয়েছে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৫৯ জন।

সামাজিক এ কুপ্রথা অনৈতিক ও অমানবিক। তাই এ প্রথাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় বা উৎখাত করা জরুরি। এ অমানবিক প্রথা থেকে প্রতিকারের উপায় হিসেবে প্রণীত হয়েছে কঠোর আইন। যৌতুক দেওয়া ও নেওয়া দুটোই অপরাধ। কিন্তু আইন করে যৌতুক নামক এ সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা যাবে না। এ জন্য বাড়াতে হবে ধর্মীয় ও নৈতিকতার চর্চা। পারিবারিক চার দেয়ালের মধ্যে থেকেও পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের ভূমিকা পুরুষের তুলনায় যে কম নয়, তা বোঝাতে হবে।

শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে হবে নারীদের। নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে তোলার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে জনমত সৃষ্টি করতে হবে। পরিবর্তন করতে হবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির, বাড়াতে হবে নারী শিক্ষা, দিতে হবে মর্যাদা। করতে হবে আইনের কঠোর প্রয়োগ, সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে যৌতুককে। আমাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষিত নারী বোঝা নয়, আমাদের সম্পদ। তবেই হয়তো মিলবে পরিত্রাণ।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী [email protected]

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস,যৌতুক,নারী
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close