এস এম রাফি, চিলমারী (কুড়িগ্রাম)

  ২৩ নভেম্বর, ২০২১

একজন পরিশ্রমী কিশোরী বধূ ও মেধাবী শিক্ষার্থীর গল্প

সুমাইয়া আক্তার চাঁদনী একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তিনি কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নের থানাহাট বাজার এলাকার এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।

টানাপোড়েনের সংসারে অদম্য ইচ্ছায় ২০১৮ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু পারিবারিক চাপে কলেজ জীবনের প্রথম বর্ষেই একই উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের পানাতিপাড়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরু জামানের ছেলে আব্দুল্লাহ মহসিনের সাথে বিয়ে হয় এই শিক্ষার্থীর। বিয়ের পরও কিন্তু দমে যাননি তিনি। স্বামীর সংসারে গেলেও পড়াশোনাতে প্রভাব পড়তে দেননি একটুও। নতুন সংসার, পড়াশোনা সমানভাবেই সামলে নিয়েছিলেন চাঁদনী।

২০২০-এ এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি থাকলেও কোভিড-১৯-এর কারণে সারাদেশে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল হয়। শিক্ষাবোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুসারে পরবর্তীতে ২০২০ সালের এইচএসসি শিক্ষার্থীদের জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এইচএসসির ফলাফল দেওয়া হয়। চাঁদনীর ফলাফল আসে জিপিএ-৫।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিযুদ্ধের জন্য মনোনিবেশ করেন তিনি। প্রবল আত্মবিশ্বাস, পরিবারের সকলের উৎসাহ এমনকি স্বামীর ভালোবাসা, স্ত্রীর পড়ালেখায় নিয়ে তার আগ্রহ চাঁদনীকে প্রচণ্ড অনুপ্রেরণা যোগায়। এছাড়া এই নববধূ মেধাবী শিক্ষার্থীর পরিশ্রমের প্রভাব ঠিকই ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে প্রতিফলিত হয়।

চলতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিযুদ্ধে চাঁদনী ঢাবি ‘বি’ ইউনিটে ১৫৮৭তম, রাবি ‘এ’ ইউনিটে ৮৪৭তম, ‘বি’ ইউনিটে ৫০তম এবং গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় ৭৩.৭৫ পয়েন্ট পেয়ে উত্তীর্ণ হন।

চাঁদনীর পড়াশোনা শুরু হয় স্থানীয় ফুলকলি মেরিট কেয়ার স্কুলে। প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন এই প্রতিষ্ঠানে। এরপর নবম-দশম শ্রেণিতে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। অনেকেই মানবিক বিভাগ বেছে নেওয়া নিয়ে তাকে নিরুৎসাহিত করেন। কিন্তু নিজ সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন চাঁদনী। মানবিক বিভাগেই ভর্তি হন। এইচএসসিও তাই।

এ বিষয়ে শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার চাঁদনী বলেন, আমার ইচ্ছা আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক বা এডমিন ক্যাডার হবো। বলেন, এই সাফল্য আমার একার নয়। পরিবার, শিক্ষক, শুভাকাঙ্ক্ষীদের; যারা আমাকে সবসময় উৎসাহ যোগিয়েছেন। দিক-নির্দেশনা দিয়ে পাশে থেকেছেন। আমি তাদের কাছে ঋণী। আমি সবার কাছে দোয়া চাই।

শিক্ষাথীদের উদ্দেশ্যে চাঁদনী বলেন, তোমরা লেখাপড়া চালিয়ে যাও, বিশ্বাস রাখো সফল হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়ে পড়বে এটা বাবা-মা’র চাওয়া। আর মেয়ের চাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ার। দুই বোন এক ভাই ও বাবা-মাকে নিয়ে তাদের অভাবের সংসার। ভাতের হোটেল ব্যবসায়ী বাবার স্বপ্ন সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন।

চাঁদনীর বাবা চাঁদ মিয়া বলেন, মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ায় আমি খুশি, তবে ভর্তি করতে অনেক টাকার প্রযোজন। আমার যে ভাতের হোটেল আছে, সেটি ভাড়ায় চালাই। প্রতিমাসে ভাড়া দিতে হয়। যেটুকু আয় হয় তা দিয়ে কোনোরকমে পরিবার নিয়ে বেঁচে আছি।

চাঁদ মিয়া বলেন, মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। কিন্তু তার ভর্তি এবং মাসিক খরচের টাকায় কোথায় পাবে জানি না।

এভাবেই হতাশা-সংশয় প্রকাশ করেন মেধাবী শিক্ষার্থী চাঁদনীর বাবা। তবে, মেয়ের আগ্রহ এবং তার উচ্চশিক্ষাকে প্রাধান্য তার কাছে। বলেন, প্রয়োজনে নিজের শেষ সম্বলটুকু খুঁইয়ে হলেও মেয়ের উচ্চশিক্ষা অর্জনের আশা পূরণ করবেন।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মেধাবী শিক্ষার্থী,চিলমারী উপজেলা,সুমাইয়া আক্তার চাঁদনী
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close