গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ
যমুনা নদীতে অসংখ্য ডুবোচর, নৌ চলাচল ব্যাহত

সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় জেগে উঠেছে অসংখ্য ডুবোচর। যমুনার বুক প্রায় পানিশূন্য। জেগে উঠা এসব বালু ও ডুবোচরে রয়েছে আঁকাবাঁকা পানিপথ। এভাবে প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট কারণে যমুনার নৌপথগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। যার ফলে কাজিপুর, চৌহালী, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় নৌ-পথে যাতায়াতকারী মানুষ জনের দুর্ভোগ দিনদিন বাড়ছে।
বর্তমানে যমুনায় নৌ-যান চলাচল ব্যহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও এক কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থানে পৌঁছাতে ৫ কিলোমিটার ঘুরে আসতে হচ্ছে। সময় ও জ্বালানি খরচ বেশি হওয়ার কারণে অনেক মাঝি নৌকা চালানো বন্ধ রেখেছে। চরাঞ্চলের মানুষকে পায়ে হেঁটে চর পাড়ি দিয়ে একাধিকবার নৌকায় পাড় হয়ে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। ডুবোচরের কারণে ১ ঘণ্টার নদী পথ পাড় হতে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে। এলাকাবাসী জানান, প্রতিদিন অগণিত মানুষ জেলা শহর ও উপজেলা প্রশাসন, থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়তের জন্য তাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া শহর এলাকাল বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চরাঞ্চলের অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী প্রতিদিন যমুনা নদী পার হয়ে লেখা-পড়া করতে সমস্যা হচ্ছে।
কাজিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা নাটুয়াপাড়া চরের হোসেন আলী বলেন, চর ঘুরে কাজিপুরে আসতেআগের চেয়ে প্রায় ২ ঘণ্টা বেশি সময় লাগে। মেঘাই হাটে লাউ, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, কাচামরিচ সহ বিভিন্ন শাকসবজি বিক্রি করতে আসা একই চরের ফুলজোর গ্রামের হানিফ সরকার বলেন, মেঘাই আসতে ২ বার নদী পার হতে হয়। নৌকা নিয়ে আসতে অনেক সময় লাগে। ছিন্ন চরের শিক্ষার্থী মাহমুদ হোসেন, ছালাল চরের শিক্ষার্থী দুলাল হোসেন, জানান, শুষ্ক মৌসুমে যমুনা নদীতে অসংখ্য চর জেগে উঠায় নদী পার হতে অনেক জলপথ ঘুরে আসতে হয়। সঠিক সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। কলেজ ছাত্রী মিতালী বেগম বলেন, বাড়ি থেকে ভোরে বের হয়ে স্কুল-কলেজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বড় শিমুল চরের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, যমুনার বুকে অসংখ্য বালুচর ও ডুবোচর জেগে ওঠায় এ অঞ্চলের সিংহভাগ সব খেয়াঘাট বন্ধ রয়েছে। আরও কয়েকটি বন্ধ হবার পথে। কৃষি পন্য বিক্রেতা ফজলার রহমান জানান, ভোরে সিরাজগঞ্জ শহরে নৌকায় আসতে অনেক সময়ই বাজারের বেলা চলে যায় যে কারনে আমরা নায্য মুল্য থেকে বঞ্চিত হই।
কাজিপুর উপজেলার মনসুর নগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক রাজমহর বলেন, শুষ্ক মৌসুমে যমুনা নদীর বিভিন্ন শাখা নদী শুকিয়ে যাওয়ায় প্রতি বছরই চরবাসীদের ভোগান্তিতে পরতে হয় । এ সময় শিক্ষার্থী ও রোগীদের কষ্ট আরো বেড়ে যায় । আবার নদীতে পানি আসলে মানুষ ভোগান্তি থেকে রেহাই পায় । দুঃখ কস্ট আর ভোগান্তি নিয়েই চরবাসীরা বেঁচে আছে যুগ যুগ ধরে বলে তিনি জানান ।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাওয়াখোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিয়া মুন্সি বলেন, পানি কমে যাওয়ায় ক্যানেলে নৌকা আটকে যাওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে। এছাড়া ঘন কুয়াশার কারণে মাঝি দিক হারিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় চরবাসী কাজ করে বাড়ি ফিরতে পারছে না। অনেক সময় শহরে আত্নীয় বা হোটেলে রাত্রি যাপন করতে হয়। তিনি আরো জানান জেলার কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালি ও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ নদী ভাঙ্গন, বন্যা ও খরার সাথে যুদ্ধ করে আজও বেঁচে আছে ।
চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, বর্ষার শুরুতে যমুনা ফুলে ফেঁপে উঠে নদীর দু-পাড়ে ভাঙন দেখা দেয়। আর শুষ্ক মৌসুমে নৌপথের পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান গুলোকে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। এসব সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে যমুনা নদীতে ড্রেজিং ও ভাঙনরোধে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
যেভাবে নদীর পানি কমছে, তাতে নৌকা চালানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এখন ড্রেজিং করে নৌপথ তৈরি করা না হলে যোগাযোগ একদম বন্ধ হয়ে যাবে। এতে করে জেলা সদরের সঙ্গে নৌপথে চরাঞ্চলবাসির যাবতীয় কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়বে। দ্রুত ড্রেজিং করে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানান এলাকার সচেতন মহল।
পিডিএস/এমএইউ