জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট

  ০৯ জুলাই, ২০২৪

সন্ধ্যা নামলেই ভূতের বাড়ি, বসে নেশাখোরদের আড্ডা 

লালমনিরহাট বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভাগের আওতাধীন। এখানে রেলের প্রায় ৭০০টি আবাসিক কোয়াটার দীর্ঘ দিন ধরে বেদখল হয়ে আছে। অভিযোগ উঠেছে রেলওয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দিন দিন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে নিরব ভূমিকায় রয়েছে রেলওয়ে প্রশাসন। কোয়ার্টার ভবনগুলোর ছাদ ও ওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে, জানালা-দরজা নেই। আগাছা ভরতি ঝুঁকিপূর্ণ এসব কোয়ার্টার এখন নেশাখোরদের দখলে। স্থানীয়রা বলেছেন এসব অনিয়ম দেখার কেউ নেই।

সন্ধ্যার পর ভবনের পাশের রাস্তা দিয়ে চলতে গেলে গা শিউরে ওঠে। দেখে মনে হয় ভুতুড়ে বাড়ি। এসব ভুতুড়ে পরিত্যক্ত ও বিধ্বস্ত কোয়ার্টারগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন কিছু অসহায় পরিবার। কিছু ভবন নেশাখোরদের দখলে। সন্ধা হলেই এসব পরিত্যক্ত ভবন গুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তাদের আড্ডা। শুধু রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে রেলওয়ের অধিকাংশ আবাসিক কোয়ার্টারের এ অবস্থার সৃষ্টি বলে অভিযোগ উঠেছে।

রেলওয়ের বিভাগীয় শহর লালমনিরহাট। রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসবাসের জন্য সরকার বাংলাদেশ রেলওয়ের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য আবাসিক কোয়ার্টারগুলো তৈরি করে। এ বিভাগের আওতাধীন প্রায় ৯১০টি কোয়ার্টারের মধ্যে ৭০০ কোয়ার্টার রয়েছে রেলের বেদখলে। পুরনো ও জীর্ণ অধিকাংশ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তা ঘোষণা করা হয়নি পরিত্যক্ত হিসেবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লালমনিরহাট জেলার সীমানা জুড়ে বিভিন্ন রেল স্টেশন রয়েছে। এসব স্টেশন সংলগ্ন আবাসিক কোয়ার্টারগুলোয় স্টেশন মাস্টারসহ অন্যান্য কর্মকর্তা কর্মচারীর বসবাসের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভাগ কোয়ার্টারগুলো তৈরি করেন। কিন্তু রেল কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও সঠিক তদারকির অভাবে কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রেল বিভাগ আর সরকার হারাচ্ছে কোটি টাকার রাজস্ব। বর্তমানে অধিকাংশ কোয়ার্টার রয়েছে বহিরাগতদের দখলে।

ব্রিটিশ আমলের তৈরি লাল রঙের ভবনগুলো অধিকাংশ জীর্ণ এবং বসবাসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে ওই ভবনগুলোতে রেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা না থাকায় সাধারণ মানুষ দখল করে নিয়েছে। ভবনগুলো ধসে পড়ার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বসবাস করছেন বহিরাগতরা। সেই সঙ্গে চুরি হয়ে যাচ্ছে ভবনের ইটসহ বিভিন্ন সরঞ্জামাদি। বহিরাগতদের দখলে থাকা ওইসব আবাসিক কোয়ার্টার এখন মাদক ব্যবসাসহ নানা অনৈতিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে।

কয়েকটি কোয়ার্টারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বসবাসকারী এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, মুহুরী, মুদি-দোকানদার, বাস-ট্রাক চালক, হেলপার, হকার, এনজিও কর্মী, শ্রমিক ও দিনমজুররা বছরের পর বছর ধরে আছেন। এদের অনেকে আবার এক শ্রেণির রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে অলিখিতভাবে মাসিক ভাড়া হিসেবে বসবাস করছেন। এ ভাড়ার টাকা কোনো দিনও রেলের আর্থিক আয়ে বা সরকারের রাজস্ব খাতে জমা হচ্ছে না।

লালমনিরহাট জেলা শহরের স্টেশন এলাকায় গিয়ে কথা হয় ওই এলাকার বাসিন্দা মো. মফিজুলের সঙ্গে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘লালমনিরহাট জেলা রেলওয়ে বিভাগ হওয়ায় এক সময় রেলের শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। ওই সময় এখানে রেলওয়ের জমজমাট অবস্থা থাকলেও এখন নাজুক। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বেদখল হয়ে গেছে রেলওয়ের স্টাফ কোয়াটার। কেউ কেউ এসব সরকারি কোয়ার্টার দখল করে ভাড়াও দিয়েছেন। এছাড়াও দিনের পর খোলা জায়গায় থেকে নষ্ট হচ্ছে রেলওয়ের কোটি কোটি টাকার মালবাহী গাড়ি।

শহরের সাহেবপাড়া এলাকায় রেলওয়ে কোয়াটারে বসবাসরত আলী আকবর ফকির বলেন,‘এক সময় আমার দাদা রেলওয়েতে চাকরি করতো। সেই সুধাদে এই কোয়াটারটি আমি পেয়েছি। এই কোয়াটার এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে তাই পাশেই একটি পাকা ঘর তুলে বসবাস করছি। তবে রেলওয়ে থেকে তিনি কোনও জমি লিজ নেননি বলে জানান।

আবাসিক কোয়ার্টারগুলো শুধু অবৈধ দখলে নয়, তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ। বেশিরভাগ কোয়ার্টারে নেই বিদ্যুতের মিটার। পৌর শহরের আনাচে-কানাচে বেশিরভাগ রেল কোয়ার্টারে মিটারবিহীন বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারী মাসোহারা হিসেবে বিদ্যুতের লাইন সংযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শহরের সাহেবপাড়া, বাবুপাড়াসহ বেশিরভাগ কোয়ার্টারে রয়েছে মিটারবিহীন অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ।

লালমনিরহাটে স্টেশন মাস্টার নুরুন্নবীর দেওয়া তথ্য মতে প্রতিদিন লালমনিরহাট স্টেশন থেকে ১৪টি ট্রেন বিভিন্ন রুটে চলাচল করে।

এ ব্যাপারে নাম না প্রকাশে একাধিক স্থানীয় রেলওয়ে কর্মচারী বলেন, আবাসিক কোয়ার্টারগুলো অবৈধ দখলদারের হাত থেকে রক্ষা করে বিধ্বস্ত কোয়ার্টারগুলো মেরামতসহ নতুন ভবন নির্মাণ করে রেল কর্মচারীদের বরাদ্দ দিলে বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্নিক ফান্ড বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারের রাজস্ব বেড়ে যেত।

রেলওয়ে কোয়ার্টার গুলোর রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে থাকা লালমনিরহাট রেল বিভাগীয় উর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম স্বপনের সাথে কথা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, এখানে যোগদান করার পর পরই রেলওয়ের কোয়ার্টার গুলোর বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে ও রেলওয়ের জনবল তেমন না থাকায় কোয়ার্টার গুলো অবৈধ দখলে ছিল। এছাড়াও কোয়ার্টার গুলো বসবাসের অযোগ্য হওয়ায় কর্মকর্তা কর্মচারীরা সেখানে বসবাস করতে চান না। এখন রেলের জনবল বৃদ্ধি পাওয়ায় কোয়ার্টার গুলো সংস্কার করে চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও খোঁজ নিয়ে অবৈধ দখলদারের হাত থেকে কোয়ার্টাগুলো উদ্ধারসহ মেরামত করা হবে।

এ ছাড়াও অভিযোগ আছে স্থানীয় প্রভাবশলীরা এসব কোয়ার্টার দখল করে গড়ে তুলছেন বসত বাড়ি, মার্কেট ও মাছের খামার। এছাড়াও লালমনিরহাট থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ট্রেনে যাত্রী সেবার মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close