সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি

  ০৮ জুলাই, ২০২৪

নাটোরের সিংড়ার উপজেলা পরিষদ

সিংড়ায় হলফনামায় প্রকৃত সম্পদের ৮ গুণ উপজেলা চেয়ারম্যানের

নাটোরের সিংড়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন হলফনামায় প্রকৃত সম্পদের আট গুন বেশি তথ্য দেওয়া অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি জানাজানি হলে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

হলফনামায় চেয়ারম্যান দেলোয়ার পৈতৃক জমি ১০ একর দেখালেও ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের রেকর্ডে পাওয়া গেছে মাত্র ১ দশমিক ৩১৫ একর। ফলে হলফনামায় তিনি প্রকৃত জমির চেয়ে প্রায় ৮ গুণ বেশি দেখিয়েছেন।

এদিকে তথ্য গোপন ও মনোনয়নপত্রে অসঙ্গতি তুলে ধরে গত ৫ মে জেলা নির্বাচন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার বরাবর অভিযোগ দেন

আবেদন জমা দেন উপজেলার তিনজন। এর আগে গত ২২ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবরও আবেদন করেছেন ওই তিনজন।

এসব অভিযোগ ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে চেয়ারম্যান পদে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রকাশিত গেজেট ও শপথ বাতিলের জন্য আবেদন করেছেন তারা। সেই সঙ্গে পুনর্তফসিলের দাবি করেন তারা।

দেলোয়ার হোসেন সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়নের পারসাঐল এলাকার শের আলীর ছেলে। মনোনয়নপত্রে তথ্যের অসঙ্গতি থাকার পরেও চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল তাকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করেন নাটোর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটানিং কর্মকর্তা। গত ৮ মে ওই ভোটগ্রহণের দিন ধার্য ছিল।

এদিকে নির্বাচন কমিশনে আবেদনকারী তিনজন হলেন উপজেলার ছাতারবাড়িয়া এলাকার বাবুল হোসেন, চক দূর্গাপুর এলাকার রাজু আহম্মেদ ও সিংড়া বাজার এলাকার আক্তার হোসেন।

নির্বাচন কমিশনে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে (প্রথম ধাপে) সিংড়ায় চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে ১৭ এপ্রিল দেলোয়ার হোসেন ও লুৎফুল হাবিবের মনোনয়নপত্র বৈধ মনোনীত করে তালিকা প্রকাশ করেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রির্টানিং কর্মকর্তা।


  • ভূমি কার্যালয়ের রেকর্ডে ১ দশমিক ৩১৫ একর, হলফনামায় ১০ একর
  • নির্বাচিত ঘোষণা করে প্রকাশিত গেজেট ও শপথ বাতিল চেয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন
  • গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, ভুল তথ্যে জয়ি প্রার্থীও সদস্যপদ হারাতে পারেন
  • অভিযোগ অস্বীকার বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের

অভিযোগ বিষয়ে অনুসন্ধানে কলম ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে গিয়ে জানা গেছে, দেলোয়ারের বাবার নামে ২৪৭, ২৫১, ২৫২, ২৫৩ মৌজায় ৫ দাগে মোট জমির পরিমাণ ১ দশমিক ৩১৫ একর। এর মধ্যে পুকুর ৪০ শতাংশ, বাড়ি ২৭ শতাংশ, ভিটা ৩০ শতাংশ ও দুই দাগে ধানী জমি রয়েছে ৯৫ ও ২৫ শতাংশ। ওই জমির ১৪২৮ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ রয়েছে। সর্বশেষ খাজনাদী পরিশোধ করা হয়েছে ৬ হাজার ৬ শত ২০ টাকা।

ওই জমির বর্তমান মালিকরা হলেন দেলোয়ারের মা আংগুর বালা, ভাই এমদাদুল হক, মজিবর রহমান, দেলোয়ার নিজে ও অপর ভাই জুয়েল হোসেন।

এদিকে হলফনামা অনুযায়ী, দেলোয়ার হোসেনের মায়ের নাম লায়লা জেসমিন ও মো. লুৎফুল হাবিবের মায়ের নাম মোছা. আংগুর বালা। কিন্তু দুজন প্রার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) সঙ্গে হলফনামা ও মনোনয়নপত্র বৈধপ্রার্থীর তালিকায় থাকা মায়ের নাম কোনো মিল নেই।

এছাড়া দেলোয়ার হোসেনের হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্বশিক্ষিত’ লিখেন, তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা’ কলামে ‘মাধ্যমিক’ উল্লেখ রয়েছে। দেলোয়ার হোসেন হলফনামায় স্বাক্ষর করেন ১৩ এপ্রিল ও মনোনয়নপত্র জমা দেন ১৫ এপ্রিল। অথচ তার এনআইডি ইস্যু তারিখ ১৬ এপ্রিল।

অভিযোগকারীদের দাবি, দেলোয়ার হোসেন হলফনামায় থানা স্বাক্ষর তার এনআইডি কার্ডের স্বাক্ষরের কোনো মিল নাই। আবেদনকারীদের দাবী, আবেদন বিষয়ে গত ১২ মে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললেও তিনি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর দেলোয়ারকে সিংড়া উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি শপথ গ্রহণ করে বর্তমানে দায়িত্বও পালন করছেন।

জানতে চাইলে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে জমির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

উপজেলার আইনজীবী মো. হাসান উজ জামান বাপ্পি জানান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (আরপিও) অনুযায়ী, হলফনামার তথ্য ভুল বা মিথ্যা প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। এমনকি নির্বাচিত হওয়ার পরও প্রার্থী সদস্যপদ হারাবেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ শেখকে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে বার বার কল ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ না করা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন কমিশনের এত জনবল নেই যে, সব প্রার্থীর হলফনামা যাচাই করবে বা খতিয়ে দেখবে।

জানতে চাইলে নাটোর কোর্টের সরকারি কৌঁসূলি (জিপি) মালেক শেখ জানান, ‘কোনো প্রার্থী যদি হলফনামায় প্রকৃত স¤পদের চেয়ে বেশি সম্পদ দেখায়, তবে তা প্রশ্নের জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষের মাঝে এমন মনে হয় যে, নির্বাচিত হলে ওই অতিরিক্ত সম্পদ যে করেই হোক অর্জন করবেন, এমন ইনটেনশন থেকেই বেশি সম্পদ দেখানো হয়েছে কি না?’

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close