টঙ্গী(গাজীপুর)প্রতিনিধি

  ০৮ জুলাই, ২০২৪

টঙ্গীতে ছাত্রলীগের বিতর্কিত কমিটি, পদবঞ্চিতদের ক্ষোভ

স্বেচ্ছায় অব্যাহতি

ছবি: প্রতিদিনের সংবাদ

গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন ৫২নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণার পর শুরু হয়েছে সমালোচনার ঝড়। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমী কর্মীদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে বিএনপির অনুপ্রবেশকারী, বিবাহিত ও অছাত্রদের কমিটিতে পদ দেওয়া হয়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন পরিশ্রম করা কর্মীদের কমিটিতে সঠিক মূল্যায়ন না করায় কমিটি ঘোষণার পরপরই অব্যাহতি নিয়েছেন নতুন কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পাওয়া ইসমাঈল হোসেন মৃধা।

শুক্রবার (৫ জুলাই) সকালে টঙ্গী পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শফিকুল তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক দীন মোহাম্মদ নিরব আগামী এক বছরের জন্য নতুন এই কমিটির অনুমোদন দেয়।

নবগঠিত কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় ফাহিম সরকারকে ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় ইসরাফিল হোসেন সোহানকে। এ ছাড়াও কমিটিতে ১১ জন সহ-সভাপতি, ১০ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ৯ জন সাংগঠনিক সম্পাদক ও একজন দপ্তর সম্পাদক পদ পেয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদকের নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রত্ব। যেখানে ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্রে বলা আছে, ছাত্রলীগের রাজনীতি করবেন তারাই, যারা ছাত্র, বয়স সর্বোচ্চ ২৯ এবং অবিবাহিত। এর বাইরে কেউ ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে পারবেন না। সেখানে গঠনতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ৫২নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন একজন অছাত্রকে।

এ ছাড়াও ইসরাফিল হোসেন সোহানের নেই অতীতের রাজনৈতিক কোনো সংশ্লিষ্টতা। গত তিন-চার মাসে থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শফিক তালুকদারের কাছে দেনদরবার করে অর্থের বিনিময়ে কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদ বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগ পদবঞ্চিত নেতাকর্মীদের।

পদবঞ্চিতরা জানায়, ইসরাফিল হোসেন সোহান ৫২নং ওয়ার্ডের একজন বালু ব্যবসায়ী ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাবেক কাউন্সিলর প্রার্থী মাসুদ রানার মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করে বাগিয়ে নেন এই কমিটি পদ।

এ ছাড়াও কমিটির এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবির হোসেন রাজও অছাত্র ও অনুপ্রবেশকারী। গেল বেশ কিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজের যুবদলের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচার হতে দেখা গেছে। জানা গেছে, রাজ তার চাচা টঙ্গী পশ্চিম থানা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক আলমগীর হোসেন ভাসানীর সাথে প্রায়ই যুবদলের মিছিল-মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতেন।

কমিটিতে স্থান পাওয়া অনেকেই বিবাহিত এবং বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। কমিটিতে জায়গা পাওয়া সহ-সভাপতি শাহীন আলম, মো. বাইজিদ হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জান্নাতুল ফেরদৌস শিপু বিবাহিত। তাদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া ও স্ত্রীর সঙ্গে তোলা বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হতে দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাংগঠনিক সম্পাদক শিপুর পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

এদিকে, কমিটি গঠনের দুই ঘণ্টা পর নতুন কমিটির প্রতি অনাস্থা জানিয়ে নিজ পদ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইসমাঈল হোসেন মৃধা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি এর সুষ্ঠু বিচারও দাবি করেন।

এ বিষয়ে ইসমাঈল হোসেন মৃধার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রায় ৯ বছর ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। অতীতে যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামে উপস্থিত ছিলাম। কিন্তু টাকার কাছে হেরে গিয়েছে আমার পরিশ্রম। গত বছর অনুষ্ঠিত হওয়া কর্মী সম্মেলনে মহানগর ছাত্রলীগের নিকট যারা সিভি জমা দেয়নি তারাই সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হয়েছে। মাত্র দুই থেকে তিন মাসের ব্যবধানে কমিটির সাধারণ সম্পাদক পথ পেয়েছে একজন।

ইসমাইল মৃধা আরো বলেন, কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হওয়ার জন্য ১০ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু সেই টাকা আমরা দিতে পারিনি।

আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি বলেন, যারা কখনো রাজনীতির মাঠেই ছিল না তারা যদি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ পায়, বিবাহিত ও অছাত্ররা যদি গুরুত্বপূর্ণ পদ পায় তাহলে বোঝা-ই যায় এখানে অনৈতিক সুবিধা আদানপ্রদান হয়েছে।

নবনির্বাচিত ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসরাফিল হোসেন সোহানের কাছে তার ছাত্রত্বের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হাজী কছিম উদ্দিন কলেজ থেকে ২০১৯ সালে পড়াশোনা শেষ করে বের হয়েছেন তিনি । এর পর আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হননি। প্রায় সাত-আট বছর ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতি করে আসছেন দাবি করলেও তিনি বিগত দিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে টঙ্গী পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক দীন মোহাম্মদ নীরবের সাথে যোগাযোগ করা হলে বলেন, যে অব্যাহতি নিয়েছে সে অনেক সিনিয়র ছিল। আমরা বলেছি, থানার পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে তাকে রাখবো।

নিরব আরো বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের পরামর্শে কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদি কমিটিতে বিতর্কিত কেউ থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

টঙ্গী পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সভাপতি শফিক তালুকদার বলেন, ‘কেডা কেডা বিএনপি করছে আপনি আমারে তাগো ছবিগুলো দেখান। কে বিবাহিত তাদের ছবিগুলোও দেন। আমি দেহি।’ তার চাহিদামতো তথ্য প্রমান তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলে এরপর আর তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও তিনি সুকৌশলে এড়িয়ে যান।

গাজীপুর মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি মোশিউর রহমান সরকার বাবু বলেন, এসব অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্ত করে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সাংগঠনিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
ছাত্রলীগ কমিটি,টঙ্গী
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close