দিলরুবা খাতুন, মেহেরপুর

  ০৭ অক্টোবর, ২০২২

আউট অব স্কুল চিলড্রেন 

মেহেরপুরে দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের পত্রযুদ্ধ

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

চৌদ্দ কোটি টাকার আউট অব স্কুল চিলড্রেন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পত্র চালাচালি যুদ্ধ হয়েছে সরকারের দুটি বিভাগে। মেহেরপুরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান নিয়ে স্থানীয় শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মধ্যে পত্র চালাচালি যুদ্ধ চলেছে। এই পত্রযুদ্ধে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর কাছে হার মেনেছে জেলা শিক্ষা বিভাগ।

জেলা শিক্ষা বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মেহেরপুরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ১ দশমিক ৫ হিসাবে মোট ২৪৩ জন। কিন্তু এই পরিসংখ্যান মেনে নিতে পারেনি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। তারা তাদের নিজস্ব লোকবল দিয়ে শুমারি চালায়। এতে তাদের যে পরিসংখ্যান দাঁড়ায় তাতে দেখা যায় মেহেরপুর জেলায় ঝরে পড়েছে ৮ হাজার ১২৮ জন শিক্ষার্থী। জেলা শিক্ষা বিভাগের পরিসংখ্যানে মেহেরপুর জেলায় সরকারি প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে এবং মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হিসাবে মোট শিক্ষার্থী ৭ হাজার ৬২৮ জন। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী মেহেরপুর জেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর চেয়ে অতিরিক্ত ৫০০ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর চেয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী বেশি। বিষয়টি সচেতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আউট অব স্কুল চিলড্রেন (সাব-কম্পোনেন্ট ২.৫) প্রকল্প বাস্তাবায়ন করছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দুই বিভাগের স্নায়ুযুদ্ধে এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। যা ভাবিয়ে তুলেছে মেহেরপুরের শিক্ষা সচেতন মানুষকে। প্রকল্পের কোন স্কুলেই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর তেমন দেখা মেলেনি।

মেহেরপুরে ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর থেকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রকল্প শুরু হয়। ঝরে পড়া শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ২১০টি কেন্দ্রে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমে স্কুলে শিক্ষার্থী নেওয়া হয়েছে নিকটবর্তী সরকারি বেসরকারি স্কুলগুলো থেকে। জেলা শিক্ষা বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জেলায় ২০২১ সালে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ১ দশমিক ৫। সে হিসাবে ঝরে পড়েছে মোট ২৪৩ জন। এই রিপোর্ট উপেক্ষা করে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো ঝরে পড়া শিক্ষার্থী দেখিয়েছে ৮ হাজার ১২৮ জন। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ওই পরিসংখ্যানের প্রতি জেলা শিক্ষা বিভাগের আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি প্রকল্প বাস্তবায়নে।

মেহেরপুর জেলায় ২১০টি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রে ৬ হাজার ৩০০ জনকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। যা জেলার শিক্ষা বিভাগকে ভাবিয়ে তুলেছে। এ শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য মানব উন্নয়ন কেন্দ্র (মউক) নির্বাচিত হয়।

ঝরে পড়েনি এমন শিক্ষার্থীদের দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে উপস্থিতি দেখিয়ে উপজেলার ২০টি ইউনিয়নে ২১০টি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিকটবর্তী সরকারি বেসরকারি ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া শিক্ষার্থী হিসেবে দেখিয়ে সরকারি অর্থ লোপাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলছে বিভিন্ন বাড়ির বারান্দায়, বাড়ির ছাদে, গাছের নিচে। এসব উপানুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রে সিকিভাগ শিক্ষার্থীও উপস্থিত থাকে না। শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে ৩টি করে খাতা দেওয়ার কথা থাকলেও গত ৯ মাসের ছয় মাসই কোনো খাতা দেওয়া হয়নি। প্রতিটি খাতার দাম ২৫ টাকা হিসাবে না দেওয়া খাতার মূল্য দাঁড়ায় ২৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। প্রতি কেন্দ্রে বসার জন্য ৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি করে ম্যাট থাকার কথা। ২১০ কেন্দ্রের ম্যাটের দাম পড়ে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু ম্যাটের বদলে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ ১০০ টাকা দামের পাটি পেড়ে বসতে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে বৈদ্যুতিক পাখা থাকার কথা থাকলেও কোনো স্কুলে পাখা ঝুলতে দেখা যায়নি। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পতাকা স্ট্যান্ড নেই। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বছর ড্রেস দেওয়ার কথা। বছরের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও দেওয়া হয়নি কোনো ড্রেস। নানা সুযোগ-সুবিধার মধ্যে ছাত্রছাত্রীদের মাসিক ভাতা জনপ্রতি ১২০ টাকা করে। এ পর্যন্ত কোনো ভাতা দেওয়া হয়নি।

মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলায় ঝড়ে পড়া শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে ২৫-৩০ জন করে শিক্ষার্থী নিয়ে ২১০ কেন্দ্রে ৬ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী থাকার কথা। দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত স্কুল চালু রাখার নিয়ম করা হলেও সেই নিয়ম মানা হয় না। সরেজমিনে কোনো কেন্দ্রেই ১০ থেকে ১৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী দেখা যায়নি। যে কজন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে তাদের অনেকেই নিকটবর্তী স্কুল কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তাদেরই ডেকে নিয়ে এসে এখানে বসিয়ে দেখানো হয় কেন্দ্রের শিক্ষার্থী হিসেবে।

সদর উপজেলার বাজিতপুর উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রটি করা হয়েছে শালিকা গ্রামে মনিরুল ইসলামের বাড়িতে। দুদিন ওই স্কুলে গিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহানাজ পারভিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার বাবার অসুস্থতার কারণে তিনি দুদিনের ছুটিতে আছেন। সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের শোলমারি গ্রামে উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ১৪ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকলেও কেন্দ্রের শিক্ষক তানিয়া খাতুনের দেখা মেলেনি। তানিয়া ওই গ্রামের গৃহবধূ।

সাংবাদিকদের উপস্থিতির খবর পেয়ে কেন্দ্রে ছুটে এসে জানান, বাড়িতে একটু কাজের কারণে আসতে দেরি হয়ে গেল। তিনি বিদ্যালয় প্রসঙ্গে কোনো কথা বলতে চাননি।

জেলা শহরের উপকণ্ঠে বামনপাড়া উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কেন্দ্রটি করা হয়েছে জেসমিন আহমেদ বুলুর বাড়ির একচিলতে বারান্দায়। সেখানে সাকুল্যে ১০ জন শিক্ষার্থী বসতে পারবেন। সরেজমিনে গিয়ে উপস্থিত দেখা যায় ৯ জন। এর মধ্যে সাব্বির হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী পাশের বামনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এবং নুর হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী শিশুশিক্ষা স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র বলে স্বীকার করেছে। অন্যরা বিদ্যালয়ের শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে। স্কুলের শিক্ষক আফসানা ফেরদৌস জানান ওরা দুজন পাশের স্কুলের ছাত্র। এখানে অতিরিক্ত শিক্ষা পেতে প্রতিদিন আসে।

মানব উন্নয়ন কেন্দ্রের (মউক) নির্বাহী কর্মকর্তা আশাদুজ্জামান সেলিম জানান, প্রতিটি কেন্দ্র নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি কোনো স্কুলের শিক্ষার্থী তাদের কেন্দ্রে নেই।

মেহেরপুর সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আপিল উদ্দীন বলেন, আমরা মন্ত্রণালয়ে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর যে পরিসংখ্যান দিয়েছিলাম সে পরিসংখ্যান উপেক্ষা করা হয়েছে। এর বাইরে তিনি কথা বলতে চাননি।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তর মেহেরপুরের সহকারী পরিচালক কবির উদ্দীন মোল্লা বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি-জালিয়াতির মাধ্যমে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার নামে সরকারি অর্থ লোপাটের অভিযোগ উঠেছে। অনেক স্কুলে শিক্ষার্থী কম- এমন অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ সত্য হলে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হবে।

জেলা শিক্ষা অফিসার ভূপেষ রঞ্জন রায় বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বইসহ আনুষঙ্গিক সুবিধার কারণে ঝরে পড়া কমেছে। কিন্তু উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর নিজস্ব পরিসংখ্যানে ঝরে পড়া বেশি দেখানো হয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নবার উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিসংখ্যানে আপত্তি দিয়েছি। আমাদের আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি। এই কারণেই সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থী উপানুষ্ঠানিক কেন্দ্রে গেলে আমরা আপত্তি করি না। সত্যি কথা বলা ঝুঁকি হয়ে পড়েছে।

মানব উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক আশাদুজ্জামান সেলিম বলেন, বর্তমানে যেকোনো প্রকল্প পেতে গেলে আগেই অনেক টাকা খরচ করতে হয়। আমাদের মন্ত্রী এলাকার নিরক্ষর দূরীকরণে বিনা খরচে প্রকল্পটি পেতে সহায়তা করেছেন। আমরা সততার সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছি।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মেহেরপুর,দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠান,পত্রযুদ্ধ
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close