আবদুল আলীম, নারায়ণগঞ্জ

  ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

বছরে রপ্তানি হচ্ছে প্রায় ৫০ কোটি টাকার মশারি

রূপগঞ্জের মশারির সুনাম দেশ পেরিয়ে বিদেশে

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন মশারিপল্লীর তৈরি মশারির সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিদেশেও। এই সুবাদে রূপগঞ্জের মশারি ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। মশারিপল্লী ঘিরে গড়ে উঠেছে মশারি তৈরির কারখানা। অনেকেই এ ব্যবসা করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন। কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক মানুষের। ১৯৬৪ সাল থেকে রূপগঞ্জে মশারি তৈরি শুরু হয়।

জামদানি তৈরির কারিগররা চিকন সুতা দিয়ে বাতাস আসা-যাওয়ার ফাঁক রেখে প্রথমে মশারি তৈরি শুরু করেন। তখন থেকেই রূপগঞ্জের মশারি সারা বাংলাদেশে সমৃদ্ধ। প্রথম অবস্থায় সুতি ও পপলিন, টেট্রন সুতা দিয়ে মশারি তৈরি শুরু হয়। ধীরে ধীরে এ মশারি আধুনিক রূপ নেয়। একসময় এ মশারি চলে আসে তাঁতশিল্পের অধীনে। রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তাঁতশিল্প সমৃদ্ধ হওয়ার পর থেকে বাড়তে থাকে মশারির চাহিদা। তাঁতিরা কাপড় বোনা ছেড়ে যুক্ত হন মশারি তৈরিতে। এখন এই মশারির কদর সারা দেশে।

দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে রূপগঞ্জের তৈরি মশারি। রূপগঞ্জে প্রথম মশারি উৎপাদন শুরু হয় কাঞ্চনের রানীপুরা এলাকায়। এরপর ধীরে ধীরে নোয়াপাড়া, কেন্দুয়া, কলাতলী, কালাদী, চৌধুরীপাড়া, পেরাব, ভুলতা, গোলাকান্দাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন মশারি তৈরির কারিগররা। স্বাধীনতার আগেই ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুধারে শত শত লোক মশারি ব্যবসায় যুক্ত হন।

তাঁতশিল্পে মশারির বুনন শুরু হলে রূপগঞ্জের তাঁত-সমৃদ্ধ এলাকাগুলো কাপড় বুনন বাদ দিয়ে চলে যায় মশারি বুননে। এতে লাভের পরিমাণও বেশি। নারায়ণগঞ্জ একসময় বাংলাদেশের সুতা বিক্রয়ের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাঁতিরা এখান থেকে সুতা কিনে নৌকায় নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে তৈরি করতেন মশারি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই তাঁতের মশারি এখন প্রায় বিলুপ্ত। স্থানীয় তাঁতিরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন নেট মশারি তৈরি করছেন। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ দশকে রূপগঞ্জের মশারি সারা দেশে ব্যবহার হতো। সেসময় থেকেই মশারি তৈরির কারখানা গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক রূপগঞ্জের আনাচে-কানাচে।

বর্তমানে রূপগঞ্জে দেড় শতাধিক মশারি উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ পিস মশারি তৈরির কাপড় উৎপাদন করে মশারি তৈরি হচ্ছে। গত অর্থবছরে রূপগঞ্জের ভুলতা-গাউছিয়া এলাকা থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকার মশারি ভারতসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছে। রূপগঞ্জের মশারির কদর ভারতে ব্যাপক। প্রতি বছর শত শত ভারতীয় ব্যবসায়ী ভুলতা গাউছিয়া মার্কেটের মশারিপট্টি থেকে হাজার হাজার পিস মশারি কিনে ভারতে নিয়ে বিক্রি করছেন। একদিকে যেমন বেড়েছে সরকারের রাজস্ব, অন্যদিকে মশারিশিল্পে এসেছে সুদিন। রূপগঞ্জের মশারি তৈরির কারখানাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, তাদের রমরমা অবস্থা। দিন-রাত শ্রমিকরা কাজ করে মশারির নেট কাপড় তৈরি করছেন। এসব কাপড় স্থানীয় কারিগরদের দিয়ে ৩ হাত, ৪ হাত, ৫ হাতসহ বিভিন্ন সাইজের মশারি তৈরি করে গুদামজাত করছেন।

মশারি তৈরির প্রক্রিয়া জানতে গিয়ে জানা যায়, একটি মশারি তৈরি করতে ৫ থেকে ৮ পাউন্ড সুতার প্রয়োজন হয়। যার মূল্য ৬০-৬৫ টাকা। একটি মশারি তৈরির কারিগরকে দিতে হয় ৮ টাকা। সেলাইয়ের সুতা, লেসসহ বিভিন্ন ডায়িং ফ্যাক্টরিতে ডায়িং করে নানা রঙের ছাপা দিয়ে একটি মশারি তৈরি করতে খরচ হয় ১৪০-১৫০ টাকা। ৩, ৪ কিংবা ৫ হাত একটি মশারি বাজারে বিক্রি হয় ২০০-২২০ টাকায়।

মশারি বিক্রি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হওয়ায় বিভিন্ন শিল্প মালিক এখানে স্থাপন করছেন মশারির কারখানা। একসময় রূপগঞ্জে মশারির তাঁতিরা নরসিংদী, শেখেরচর, ঢাকার সদরঘাট, বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনায় মশারি বিক্রি করলেও রূপগঞ্জে মশারি শিল্প কারখানা বাড়তে থাকায় রূপগঞ্জেই তৈরি হয় মশারির বাজার। ভুলতা গাউছিয়া মার্কেটে মশারি ব্যবসায়ীরা ৬০০ দোকান নিয়ে তৈরি করেছেন মশারির হাট। প্রতি মঙ্গলবারের পাশাপাশি সপ্তাহের প্রতিদিনই এখান থেকে ট্রাকবোঝাই করে ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে মশারি সরবরাহ করছেন।

মাজেদা নিটিং-এর মালিক নজরুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন ব্যবসার পাশাপাশি রূপগঞ্জে মশারি ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় তৈরি করি মশারির কারখানা। দেশের শীর্ষস্থানীয় কেয়া গ্রুপের কেয়া নিটিং নামে মশারি কাপড়ের কারখানাটি তৈরি হয়।

থ্রিস্টার মিলের মালিক আবদুল করিম জানান, রূপগঞ্জের এ মশারি দেশসহ ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রূপগঞ্জের গাউছিয়া মার্কেট থেকে রপ্তানি হচ্ছে। লাভও হচ্ছে প্রচুর। প্রতি বছর রূপগঞ্জ থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকার মশারি বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মশারি
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close