মো.সবুজ হোসেন, নওগাঁ

  ১০ আগস্ট, ২০২২

শতবর্ষী আখের হাট নওগাঁর ‘ত্রিমোহনী’

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

ছোট-বড় আখগুলো বিভিন্ন উপায়ে আঁটি বেঁধে হাটে নিয়ে এসেছেন আখ চাষিরা। এরপর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সেসবের দাম নির্ধারিত হয়। আকার অনুযায়ী ১০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫ টাকা পর্যন্ত আসে প্রতি পিস আখের দাম। হাটে খুচরা ও পাইকারি বিক্রি হয় আখ। ২৫টি আখ একত্রিত করে একটি আঁটি বানানো হয়েছে। ক্রেতাদের চাহিদা ও পছন্দমতো আখ ক্রয় করে। এরপর কেউ নসিমনে, কেউ ভ্যানে, কেউ পিকাপে করে নিয়ে যায় আখ ক্রয় করে।

বলছি, নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার ত্রিমোহনী আখের হাটের কথা। প্রায় ১০২ বছরের এই হাটে জমে উঠেছে আখ বেচাকেনা। প্রতিদিনই এই হাট থেকে দেশি জাতের আখ কিনে রাণীনগর ও তার আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে বিক্রি করছেন খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। আর রাণীনগর উপজেলায় উৎপাদিত দেশি জাতের (আঁচাফারাম জাত) আখের চাহিদা অনেকটাই বেশি। কারণ এই জাতের আখ শুধুমাত্র রাণীনগর ও তার আশে-পাশের কিছু এলাকাতেই চাষ হয়ে থাকে। অন্যান্য আখের চেয়ে বেশি মিষ্টি এই জাতের আখ। এছাড়া বর্তমান সময় আখের মৌসুম হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে ফেরি করেও আখ বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া ভ্রাম্যমাণ ভ্যান গাড়িতে মেশিনের মাধ্যমে বের করা আখের রসের চাহিদাতো রয়েছেই। গরম মৌসুমে এর চাহিদা আরও বেড়ে যায়। মেশিন দিয়ে বের করা প্রতি গ্লাস আখের রস ১০টাকা করে বিক্রি করা হয়ে থাকে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১০ হেক্টর জমিতে আখের চাষ করা হয়েছে। উপজেলার বাহাদুরপুর, চকমনু, চকাদিন, ত্রিমোহনীসহ বেশ কিছু গ্রাম একসময় আখ চাষের গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এই গ্রামগুলোতে হাতেগোনা কয়েকজন চাষী আখের আবাদ ধরে রেখেছেন। তবে প্রতি বছরই চাষের পরিমাণ কমছে। আখের জমিতে বিকল্প আবাদ হিসেবে অধিক লাভজনক ফসলের বাগান ও ভুট্টা আবাদের পরিমাণ বেশি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে উপজেলায় আখের চাষ কমছে। এছাড়া আখ চাষে খরচ ও দাম বেশি হওয়ার কারণে ক্রেতা-উৎপাদনকারীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে, যার কারণে আখের চাষও কমে যাচ্ছে। জেলার আখের সবচেয়ে বড় হাট বসে রাণীনগর উপজেলার ত্রিমোহনী হাটে। এখান থেকে জেলাসহ বিভিন্ন জেলায় ব্যবসায়ীরা এসে আখ কিনে নিয়ে যায়।

রাণীনগর উপজেলার চকমুনু গ্রামের আখ চাষি রবিউল ইসলাম বলেন, এবার আখের ফলন ভালো হয়েছে। আমি ৩ বিঘা জমিতে আখ চাষ করেছি। ইতিমধ্যেই ৪০ হাজার টাকার আখ বিক্রি করেছি ত্রিমোহনী হাটে। খেতের সব আখ বিক্রি করে আরও অন্তত ৪০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। তবে গত বছর আখে পোকার আক্রমণ বেশি হওয়ায় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলাম।

উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের আখ চাষি সামাদ আলী বলেন, আমরা খেত থেকে আখ তুলে উপজেলার ত্রিমোহনী আখের বাজারে নিয়ে যাই। সেখানে খুচরা ও ব্যবসায়ীরা আকার অনুযায়ী দাম দিয়ে আখ কিনে নিয়ে যায়। জয়পুরহাট, বগুড়া, নীনফামারিসহ বেশ কয়েকটি জেলা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আখ নিকে নিয়ে যায়।

বেতগাড়ী গ্রামের আখ চাষি মুঞ্জুর হোসেন বলেন, ক্ষেতে উৎপাদিত আখ ছোট-বড় আখগুলো বিভিন্ন উপায়ে আঁটি বেঁধে হাটে নিয়ে নিয়ে আসি আমরা। তারপর আখের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নির্ধারিত হয় দাম। আখের আকার অনুযায়ী ১০ টাকা থেকে শুরু করে ২৫ টাকা পর্যন্ত দাম আসে প্রতি পিস আখের। এই হাটে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি হয় আখ। ২৫টি আখ একত্রিত করে একটি আঁটি বানানো হয়। ক্রেতাদের চাহিদা ও পছন্দমত আখ ক্রয় করে। তবে কৃষি অফিস থেকে যদি আখ চাষে আরো সহযোগিতা পাওয়া যেত তবে লাভজনক এ ফসলের চাষ কমত না। কারণ এটি অত্যন্ত লাভজনক আবাদ। আখের সবকিছুই ব্যবহারযোগ্য বলে জানান এই চাষি।

জয়পুরহাট থেকে আখ কিনতে আসা পাইকারি ব্যবসায়ী দিদারুল দেওয়ান বলেন, গত প্রায় ৫বছর থেকে ত্রিমোহনী হাট থেকে আখ কিনে নিয়ে যাই। এর পর রাজধানী ঢাকাসহ কয়েকটি স্থানে আখগুলো বিক্রি করে থাকি। ভালো মানের ও দামের কারনেই এখানে আসা।

কালাম হোসেন নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আমি প্রতি বছরই ত্রিমোহনী হাট থেকে আখ কিনে নিয়ে বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করি। রাণীনগর উপজেলায় উৎপাদিত আখ অনেক মিষ্টি। সেগুলোর আকারও মানসম্মত। চাষিদের কাছ থেকে এসব আখ কিনে পিকাপে করে নিয়ে যাই। এক্ষেত্রে চাষিদের চাহিদা অনুযায়ী দাম সমন্বয় করেই আখ ক্রয় করে থাকি। প্রায় ৭ বছর যাবৎ এই হাট থেকে আখ কিনছি।

স্থানীয় কাশিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মকলেছুর রহমান (বাবু) বলেন, ত্রিমোহনী হাট একটি ঐতিহ্যবাহী হাট। ১৯২০ সালে এই হাট যাত্রা শুরু করে। এখানে গবাদিপশুসহ নিত্যপণ্যের কেনাবেচা হয়। এছাড়া মৌসুমে চাষিরা জমি থেকে আখ নিয়ে এসে এখানে খুচরা ও পাইকারি দরে বিক্রি করেন। আশপাশের অনেক এলাকা থেকে ক্রেতারা এখানে আসেন তাদের পছন্দের পণ্যগুলো ক্রয় করতে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শহীদুল ইসলাম বলেন, আখ চাষ পুরোটাই লাভজনক। আখের পাতা গবাদিপশুর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত উন্নত মানের খাদ্য, আখের ছাল শুকানোর পর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সীমিত পরিমাণ সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়, জমিতে আখ চাষ করলে সেই জমির উর্বরতা শক্তিও বাড়ে। এক কথায়, আখ চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি ফসল। কিন্তু বিগত কয়েক বছর আখে পোকার আক্রমণ বেশি হওয়া ও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় আখের চাষ চলতি মৌসুমে কিছুটা কমেছে। তবে এ কাজে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি অফিসের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, চলতি বছর আবহাওয়া আখ চাষের অনুকূলে থাকায়, দক্ষতা, পরিচর্যা, সঠিকভাবে সার ও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে এবার উপজেলায় আখের ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকরা বাজারে আখের দাম ভালো পাচ্ছেন। আমি আশাবাদী, আগামী বছর উপজেলায় আখের চাষ আরো বৃদ্ধি পাবে।

নওগাঁ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডাঃ আশিষ কুমার সরকার বলেন, আখের রস মানব শরীরের জন্য অনেক উপকারী। আখের রসের ১২টি গুণাগুণ ও উপকারিতা রয়েছে। এর মধ্যে পলিফেনলস একটি শক্তিশালী পলি নিউট্রিয়েন্টস, যাতে এন্টিঅক্সিডেন্টের গুণাবলি রয়েছে। আখের রসে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন এবং মিনারেলস। যেমন- পটাশিয়াম ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ এবং লৌহসহ প্রয়োজনীয় এমাইনো এসিড রয়েছে। বিশেষ করে আখ মেশিন দিয়ে রস করে না খেয়ে মুখের মাধ্যমে আখের ছাল ছেড়ে রস খাওয়াটা অনেক উপকারী। কারণ মুখের মাধ্যমে আখের ছাল ছাড়িয়ে রস খেলে দাঁত ও মুখ অনেক পরিষ্কার হয়। আখের রস ক্ষারীয় প্রকৃতির হওয়ায় শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষায় সাহায্য করে। জন্ডিসে আক্রান্ত হলে প্রতিদিন দুই বেলা আখের রস পান করা উচিত। এছাড়া আরো অসংখ্য গুণ রয়েছে আখের রসে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
নওগাঁ,ত্রিমোহনী,আখের বাজার,রস,ভিটামিন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close