বেনাপোল প্রতিনিধি

  ০৭ জুলাই, ২০২২

বেনাপোল কাস্টমসে রাজস্ব ঘাটতি ৫৫৮ কোটি টাকা

ছবি : সংগৃহীত

বেনাপোল কাস্টমস হাউসে গত ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় বিদায়ী অর্থবছরে (২০২১-২২) প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে। আদায় প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছর এই কাস্টমস হাউসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ হাজার ৫৯৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। আর গত অর্থবছর আদায় হয়েছিলো ৪ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বেশি আদায় হয়েছে ৪৫৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা। তবে বিদায়ী অর্থবছর এই কাস্টমস হাউস লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।

কাস্টমস বলছে, দেশের এই বৃহৎ স্থলবন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় বিভিন্ন রাসায়নিক ও খাদ্য দ্রব্য। কিন্তু এই বন্দরে বিএসটিআই ও বিএসআইআর এর অফিস নেই। পণ্য পরীক্ষা বিলম্বিত হওয়ায় রাজস্ব কম আদায় হচ্ছে। এ ছাড়া খাদ্য দ্রব্য ও রাসায়নিক পণ্য খালাসে জটিলতা ও অধিক শুল্কের পণ্য আমদানি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায় কম হয়েছে।

বেনাপোল কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল ১৭৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এদিকে, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে ৪ লাখ ৩০ হাজার টন পণ্য আমদানি কম হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে পণ্য আমদানি হয়েছে ২১ লাখ ১৪ হাজার টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছিল ২৬ লাখ ৪৪ হাজার টন পণ্য। এনিয়ে টানা পাঁচ বছর এনবিআরের রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বেনাপোল কাস্টমস হাউজ।

যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের এ পথে বাণিজ্যে আগ্রহ বেশি। তবে বন্দরের দুর্বল অবকাঠামো, কাস্টমসে পণ্য খালাসে জটিলতা ও অধিক শুল্ক আয়ের পণ্য আমদানি কমে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক নাসির উদ্দিন বলেন, বেনাপোল কাস্টমস অন্য শুল্ক স্টেশনের তুলনায় বেশি শুল্ক আদায় করছে। আবার বন্দরে তীব্র জায়গা সংকট। পণ্য ওঠানামার ক্রেন ফর্কলিফট নষ্টের কারণে সঠিক সময়ে আমদানিকারকরা পণ্য নিতে পারেন না। এছাড়াও ভারতের কালিতলায় অবৈধভাবে পার্কিংয়ের নামে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে। এ কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। অনেক ব্যবসায়ী এ বন্দর ছেড়ে চলে যাওয়ায় রাজস্ব আদায় কমে গেছে। তবে বেনাপোল বন্দর উন্নয়ন, ভারতে হয়রানি বন্ধ হলে এ বন্দর থেকে লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ রাজস্ব আয় কাস্টমসের পক্ষে সম্ভব।

যশোরের আমদানিকারক এজাজ উদ্দিন টিপু বলেন, ভারত থেকে একটি ট্রাক দেশে প্রবেশে করতে এক মাস সময় লেগে যাচ্ছে। একে তো পণ্য আসতে দেরি হচ্ছে, আবার ওপারে প্রতিদিন ট্রাক প্রতি ২ হাজার রুপি দিতে হয়। এতে বেনাপোল দিয়ে আমদানি কমিয়ে অন্য বন্দরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া বেনাপোল বন্দরে রয়েছে জায়গা সংকট। এতে চাহিদা অনুযায়ী পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে পারছে না। যে কারণে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাচ্ছে।

রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় কারণগুলো সম্পর্কে যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান খান বলেন, বেনাপোল বন্দরে আমদানি পণ্যের গুণগত মান পরীক্ষণের প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেই। খুলনা ও ঢাকা থেকে এসব পরীক্ষা করাতে মাসের অধিক সময় লেগে যায়। এতে যেমন প্রচুর সময় অপচয় হয় তেমনি বন্দরে আটকে থাকা পণ্যের গুনগতমান নষ্ট হয়ে ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বেনাপোল বন্দরে বিএসটিআই ও বিএসআইরের শাখা স্থাপনের দাবি আজও বাস্তবায়ন হয়নি। এতে অনেক ব্যবসায়ী এ বন্দর ছেড়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটিও একটি বড় কারণ বলে মন্তব্য করেন এ ব্যবসায়ী।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ¦ শামছুর রহমান বেনাপোল শুল্কভবনে রাজস্ব আয় কম হওয়ার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, বেনাপোল কাস্টমসে অন্য সমস্যা আছে। এখানে নতুন নতুন আইন তৈরিকরণ, পণ্যের এইচএসকোড পরিবর্তনের নামে ২০০ পারসেন্ট জরিমানা করা, ডাটাসিট বা পূর্বমূল্য না মানা ও পণ্য পরীক্ষণে জটিলতার কারণে একটি পণ্য বন্দর থেকে খালাস নিতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগছে। এর সাথে ভারতের বনগাঁ কালীতলায় পার্কিং জটিলতা রয়েছে।

তিনি বলেন, দেশটির সরকারি ওই পার্কিংয়ে প্রবেশের পর বেনাপোলে আসার অপেক্ষায় পণ্যবাহী ট্রাকের সময় লাগে এক মাসের ও অধিক সময়। প্রতিদিন যেখানে ৫শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ পণ্যবাহী ট্রাক ভারত থেকে বন্দরে ঢোকার কথা, সেখানে জায়গা সংকটের কারণে ঢুকছে ৩শ থেকে সাড়ে ৩শ ট্রাক। ফলে ভারত থেকে আসা ট্রাকগুলো পণ্য খালাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে ৮ থেকে ১০ দিন। বন্দরের সক্ষমতা না বাড়ালে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের সুফল পাওয়া যাবে না। আমরা বারবার বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য চিঠি দিলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে কর্ণপাত করছেন না বলেও মন্তব্য এই ব্যবসায়ীর।

বেনাপোল কাস্টমস হাউজের কমিশনার মো. আজিজুর রহমান বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় গত বছর আমাদের রাজস্ব আয় বেশি হয়েছে। গত বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আয় কম হয়েছে। এর কারণ ৪ লাখ ৩০ হাজার টন পণ্য আমদানি কমেছে। বেনাপোল বন্দরে জায়গার সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য আমদানি করতে পারছেন না। আবার ভারতের কালিতলায় অবৈধভাবে আমদানিবাহী গাড়ি আটকিয়ে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে আমদানিকারকরা অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছেন। বন্দরের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সাথে ব্যবসায়ীদের বৈধ সুবিধা বাড়ানোর পক্ষে শুল্ক কর্তৃপক্ষ কাজ করছেন। যারা অনিয়ম করার চেষ্টা করেছেন তাদের জরিমানা, লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কারনে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও গত বছরের চেয়ে ৪৫৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা বেশি আদায় হয়েছে বলে তিনি জানান।

বেনাপোল বন্দরের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবীর তরফদার বলেন, বেনাপোল বন্দরের উন্নয়নকাজ চলমান। এরই মধ্যে বন্দরে ৩৬৫টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এতে নিরাপত্তা বাড়বে। জমি অধিগ্রহণ, নতুন পণ্যাগার নির্মাণ ও বন্দর এলাকায় রাস্তাঘাটের অনেকটা উন্নয়নকাজ করা হয়েছে। উন্নয়নকাজ সমাপ্ত হলে এ বন্দরে বাণিজ্য আরো গতি পাবে।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
বেনাপোল,কাস্টমস,রাজস্ব আয়
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close