গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী, সিরাজগঞ্জ

  ২৮ নভেম্বর, ২০২১

জমে উঠেছে মানুষ বিক্রির হাট

ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

সাধারণ নিয়মে টাকার বিনিময়ে পণ্য বিক্রি হলেও সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল, কান্দাপাড়া, কাজিপুরের নাটুয়ারপাড়াসহ জেলা বিভিন্ন এলাকার হাটের বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষ নিজেই পণ্য। নির্ধারিত একটি সময়ের জন্য একজন আরেকজনের কাছে বিক্রি হয়ে যান। সিরাজগঞ্জের শিয়ালকোল, কান্দাপাড়া, কাজিপুরের নাটুয়ারপাড়া, আলমপুর, কুমারিয়াবাড়ি, পানাগাড়ি, রতনকান্দি ও সোনামুখী এলাকায় এই মানুষ বিক্রির হাট এখন জমজমাট। প্রতিদিন সকালে হাট শুরু হয়। ৮টার মধ্যে এই শ্রমজীবী মানুষদের ক্রয় করে নিয়ে যায়। বতর্মানে ধান কাটার মৌসুমে মাঠে পাকা ধান রয়েঠে কাটার অপেক্ষায়। কর্মজীবী দিনমুজরদের প্রয়োজন কাজ। এ কারণে কৃষকদের কাছে শ্রমীকের চাহিদা রয়েছে অনেক। তাছাড়াও অন্যান্য কাজেও শ্রমিকদের চাহিদা রয়েছে। তাই শ্রমিকের দামও থাকে বেশ চড়া। প্রতিটি শ্রমিকের মূল্য ৫শত থেকে ৬ শত টাকার নিচে কোন শ্রমিক পাওয়া যায় না। এ সকল হাটে ১৫ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সে কৃষি শ্রমিক দেখা যায় বেশি।

সরেজমিনে বিভিন্ন হাটে গিয়ে দেখা যায়, কারো হাতে বাঁশের তৈরি বাইং, কারো হাতে ব্যাগ। ব্যাগে হালকা কাপড়-চোপর আর কাঁচি। কেউ বসে আছে, কেউ দাঁড়িয়ে। হাটের ভেতরে ঢুকতেই কতিপয় শ্রমিক বলেন ‘মামা কামলা লাগবো? কত দিবেন?’

সদর উপজেলার শিয়ালকোল গ্রামের শ্রমিক আবদুর রশিদ (৪৫) সহ সাতজনের একটি দল হাটে আসেন। এ সময় তাকে জিজ্ঞাস করলে সে জানায়, সংসারে বিধবা মা, ৩টি বোন সহ স্ত্রী ও ছেলে মেয়ে রয়েছে। তাদের ভরণপোষণের জন্য তাকে কর্মের পথ বেচে নিতে হয়েছে। ১৭ বছরের কিশোর জেলহক জানায়, আমার বাড়ীতে বিধবা মা রয়েছে। তাকে ভরণপোষনের জন্য এই কর্মের পথ বেচে নিতে হয়েছে। ছোট বলে কেউ আমাকে কিনতে চায় না। অল্প দামে বিক্রি হতে হয়।

অন্য ছয়জন ৬০০ টাকা করে বিক্রি হয়েছেন। তিনি আরো বেশি দামে বিক্রি হওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে আছেন। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এখন কোনো কাজ নাই। বইসা থাইকা কি করমু? তাই এহনে আমনধান ও মাটি কাটার জন্য আইছি। কিছু টাকা জমিয়ে চইলা যামু।’

নাটুয়াপাড়ার চরাঞ্চলের রহমত আলী (৪০) জানান, ‘তার আট বিঘা জমি ছিল। ১৬ বছর আগে রাক্ষষী যমুনা নদী তা কাইড়া নিছে। পরিবারের লোকজন নিয়ে এখন অন্যের জায়গায় থাকি। এজন্য নিজেকে ভাড়া দিতে হয়।’

৬০ বয়সের বৃদ্ধ সিরাজ মিয়া জানায়, ছেলেরা যার যার মতো সংসার পেতে নিয়েছে। আমাদের ভরণপোষনের সময় তাদের নেই। তাই বৃদ্ধ বয়সে বাড়ী থেকে বের হয়ে বিক্রির জন্য কান্দাপাড়া হাটে এসেছি।

জানা যায়, বগুড়ার ধুনুটের বাঁশপাতা গ্রাম থেকে আসা ফললুল হকসহ একাধিক শ্রমিক বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আরো অনেকেই বিক্রি হওয়ার আশায় রোদ, বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নাটুয়ারপাড়া হাটে দাঁড়িয়ে ও বসে থাকে। বিক্রি না হতে পারলে নাটুয়ারপাড়া স্কুল, মাদরাসা ও কলেজ মাঠে রাতে থাকে। তাছাড়াও জামালপুর থেকেও শ্রমিক আসেন এখানে।’

বিভিন্ন এলাকায় খবর নিয়ে জানা গেছে, এখন একজন শ্রমিকের দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। তাতে তিনবেলা খাবারসহ এক কামলার দাম পড়ে কমপক্ষে ৮০০ টাকা। আর এখন বাজারে এক মণ ধানের দামও সাড়ে ৯ শত থেকে ১ হাজার টাকা মন।

নাটুয়ারপাড়া গ্রামের জনৈক আব্দুস সালাম নামক গৃহস্থ জানান, ‘কামলার দাম গত বছরের চেয়ে এবার বেশি। তবু কিছু করার নেই। তাই বেশি দাম দিয়েই কামলা কিনতে হচ্ছে।’ কাজিপুর উপজেলার মাজনাবাড়ি গ্রামের কৃষক আমির হোসেন বলেন, ‘আমি নাটুয়ারপাড়া থেকে ৬০০ টাকা দরে পাঁচজন কামলা (শ্রমিক) কিনছি। উত্তরবঙ্গের কামলাদের কাজের মান ভালো। কাজে কোনো ফাঁকি দেয় না। তাদের তিনবেলা খাবার দিতে হয়। আর কাজ করে ভোর থেকে একটানা সন্ধ্যা পর্যন্ত।’

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
সিরাজগঞ্জ,মানুষ বিক্রির হাট,জমে উঠেছে
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close