মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি

  ১০ অক্টোবর, ২০২১

পানগুছি নদীর ভাঙনে বদলে যাচ্ছে মোরেলগঞ্জের মানচিত্র

পানগুছি নদীর অব্যাহত ভাঙনে প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে উপকূলীয় উপজেলা বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের মানচিত্র। প্রতিদিন ভাঙছে নতুন নতুন এলাকা। বসতবাড়িসহ বহু প্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট চলে গেছে নদীগর্ভে। গত ৫০ বছরে পানগুছি নদীর আয়তন বেড়েছে তিনগুন। এক কিলোমিটারের বেশি এখন নদীটির প্রশস্ততা। এই নদীর তীরে উপজেলার ৩ লাখ লোকের বসতি। দেশ স্বাধীনের আগে থেকেই এই নদীর তীরে বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। যার পোল্ডার নং ৩৫/২। কিন্তু দীর্ঘ ৫০ বছরেও সেই স্বপ্নের বেড়িবাঁধের দেখা মেলেনি। বিভিন্ন সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী আন্দোলন, মানববন্ধন করেছেন। মন্ত্রী, এমপি ও পাউবোর কর্মকর্তারা পরিদর্শনও করেছেন বহুবার। বেড়িবাঁধের দাবিতে ডিও লেটারসহ দৌঁড়ঝাপও করেছেন তারা। কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোন কিছুই দেখতে পারেননি এলাকাবাসী।

৫০ বছরে শুধু উপজেলা সদর থেকে নদীগর্ভে চলে গেছে, খাদ্যগুদাম, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, টেলিফোন অফিস, আব্দুল আজিজ মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, এসিলাহা উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ভবন, ডাকবাংলো, বারইখালী ইউনিয়ন পরিষদ, পুলিশ কোয়াটার, আনছার ময়দান, বারইখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পোস্ট অফিস, স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের অফিস, কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, থানা জামে মসজিদ, সার্বজনীন হরিসভা মন্দির, শ্মশান ঘাটসহ বহু প্রতিষ্ঠান ও রাস্তা ঘাট। বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে গাবতলা, কাঠালতলা, বারইখালী, ফেরিঘাট, কুমারখালী, সন্নাসী, শ্রেণিখালী, ঘষিয়াখালী, সোনাখালী, ফুলহাতাসহ ২০টি গ্রাম। কয়েক বছর ধরে পানগুছি নদীর ভাঙনে শুধু মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৩টি গ্রামের কমপক্ষে ৪ শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। গাবতলা গ্রামের ২৫ একর জমি ধসে গেছে নদীতে। সিডর, আইলা, ইয়াসের পরও ভেঙে যাওয়া বাঁধ স্থায়ীভাবে রক্ষার জন্য কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে স্থানীয় সংদস্য সদস্য ডা. মোজাম্মেল হোসেন ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। ওই সময় তিনি গাবতলা হতে পশুরবুনিয়া অভিমুখে আড়াই কিলোমিটার বেড়িবাঁধের জন্য ডিও লেটার দেন। ডিও লেটারে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পূর্বে বেড়িবাঁধ নির্মাণের লক্ষে পোল্ডার নং-৩৫/২ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল যা অদ্যাবধি বাস্তবায়িত হয়নি। ডিও লেটারের ভিত্তিতে পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম গত বছরের ১২ জুলাই পাউবো মহাপরিচলকেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু অদ্যাবধি কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

২০২১সালের মে মাসে বর্তমান সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট আমিরুল আলম মিলন ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। ওই সময় মোরেলগঞ্জ উপজেলার বারইখালী, বহরবুনিয়া, বলইবুনিয়া ও পঞ্চকরণ ইউনিয়নের নদীর তীরবর্তী এলাকা পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে নদী শাসন কার্যক্রম শুরু হবে। রাস্তা-ঘাট পুনঃনির্মাণ করা হবে। সন্ন্যাসী থেকে ঘষিয়াখালী পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে।

সংসদ সদস্যের পরিদর্শনকালে নদীর তীরবর্তী হাজার হাজার নারী-পুরুষ শ্লোগান দেন- ত্রাণ চাই না, চাই টেকসই বেড়িবাঁধ চাই'। এসময় পানি উন্নয়ন বোর্ড বাগেরহাটের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহামুদুন্নবী,উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো.রোকনুজ্জামানসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 

সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এইচএম মাহমুদ আলী ও খাউলিয়া ইউনিয়নের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান মো. আলমগীর হোসেন বলেন, পানগুছি নদীর অব্যাহত ভাঙন প্রতিরোধে জরুরি ভিত্তিতে সন্ন্যাসী লঞ্চঘাট হতে মোরেলগঞ্জ শহর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার স্থায়ী বেড়িবাঁধ হলে এ সমস্যা সমাধান হতে পারে।  

সরেজমিনে এ এলাকায় দেখা গেছে, পানগুছি নদীর তীরবর্তী গ্রামের শত শত বিঘা ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। ভাঙনের মুখে গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকটি পরিত্যক্ত হয়েছে। বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, কাঁচা-পাকা রাস্তা। অনেক পরিবার ভাঙনের কবলে বাড়িঘর হারিয়ে শহরমুখী কিংবা অন্যত্র বসবাস করছে। কমিউনিটি ক্লিনিকটিও ভাঙনের মুখে। আতংকে রয়েছে নদীর তীরবর্তী ৩০টি পরিবার। গাবতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টার, মসজিদ, খাউলিয়া ও গাবতলা ব্রিজ এখন হুমকির মুখে।  

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ইতোপূর্বে নদী ভাঙনের বিষয়টি ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। নতুন করে ভাঙনের বিষয়টিও অবহিত করবো। যাতে করে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মানচিত্র,মোরেলগঞ্জ,পানগুছি নদী
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close