সখীপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি

  ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সখীপুরে জমি লিজ নিয়ে বিপাকে কৃষক

বাগানেই নষ্ট হচ্ছে লাখ টাকার লেবু!

টাঙ্গাইলের সখীপুরে ২১০ শতাংশ জায়গা লিজ নিয়ে লেবুর বাগান করে বিপাকে পড়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কৃষক মোফাজ্জল হোসেন। জমির মালিক জায়গা দখলে নিয়ে বাউন্ডারি করায় লেবু ও লেবুর চারা বিক্রি করতে পারছেন তিনি। ফলে লেবু পেঁকে বাগানেই নষ্ট হচ্ছে। এতে লাখ লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন ওই কৃষক। 

ক্ষতিগ্রস্ত মোফাজ্জল হোসেন উপজেলার কচুয়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত আব্দুল বাছেদের ছেলে।

জানা গেছে, তিনি ওই গ্রামের দেওয়ান সুজাত আলীসহ তার পাঁচ ভাইয়ের কাছ থেকে জমি লিজ নিয়ে জান্নাতুল লেমন গার্ডেন নামে একটি লেবুর বাগান করেন। এতে তার বাগান করতে খরচ হয়  প্রায় ১৫ লাখ টাকা। বাগানের লাগানো লেবুর চারা বড় হয়ে ফল দেয়া শুরু করেছে। সম্প্রতি তিনি বাগান থেকে লেবু ও কলম চারা বিক্রি শুরু করেন। এরমধ্যে তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় পুনরায় লিজ চুক্তি দেয়ার জন্য দেওয়ান বাড়ির পাচঁ ভাইকে জানান।

এরমধ্যে দুই ভাই দেওয়ান সুজাত আলী ও মোজাম্মেল হক ৯০ শতাংশ লিজ চুক্তি করে দিলেও বাকি তিন ভাই দেওয়ান আব্দুল জব্বার, হযরত আলী ও শওকত জমি লিজ চুক্তি করে দেননি। পরে ওই তিন ভাই তাদের জমি মোফাজ্জলকে না জানিয়েই স্থানীয় দুই ব্যক্তির কাছে ৬০ হাজার টাকায় প্রতি শতাংশ জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। পরে তারা লেবুর বাগানে প্রবেশের রাস্তা আটকিয়ে দিয়েছে। এতে লেবু পেঁকে বাগানে পড়েই নষ্ট হচ্ছে।

এছাড়া বাগানের মালিক মোফাজ্জল হোসেনের লাগানো সাইন বোর্ড ভেঙে দিয়ে সেখানে দেওয়ান লেমন গার্ডেনের সাইন ঝুলিয়ে দিয়েছে। ফলে বাগানের লেবু ও চারা বিক্রি করতে পারছে মোফাজ্জল। ফলে লাখ লাখ টাকার লেবু ও চারা নষ্ট হচ্ছে।

কচুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর বলেন, মোফাজ্জল দেওয়ান বাড়িদের কাছ থেকে জমি লিজ নিয়ে লেবুর বাগান করেছিল। পাঁচ বছর যাওয়ার পর লিজের নবায়ন না করে উল্টো বাগানের লেবুর গাছ কেটে ফেলতে বলছে। এতে তার লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হবে। এছাড়া সে বাগানেও প্রবেশ করতে পারছে না। 

রফিকুল ইসলাম নামের আরেকজন বলেন, বনের জমি মোফাজ্জলকে লিজ দিয়েছে কচুয়ার দেওয়ান বাড়ির সন্তানরা। না জেনে সেই জমিতে মোফাজ্জল লেবুর বাগান করেছে। এতে পরবর্তিতে তাকে পুনরায় লিজ না দিয়ে বনের জায়গা দখলকারীরা অন্য ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এতে কৃষক মোফাজ্জলের লাখ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়েছে। 

লেবু বাগানের মালিক মোফাজ্জল হোসেন বলেন, তিন লাখ টাকা দিয়ে ১০ বছরের জন্য ২১০ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে লেবুর বাগান করি। এর মধ্যে লিজ চুক্তিতে পাঁচ বছর উল্লেখ করা হয়। কিন্তু চুক্তিনামায় বলা হয়, পুনরায় লিজ আমাকে দেয়া হবে। কিন্তু ৯০ শতাংশ পেলেও বাকি জমি আমাকে লিজ না দিয়ে অন্য লোকদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। লেবুর বাগানে আমার ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

এছাড়া কয়েক লাখ টাকার কলম চারা করেছি। যখন লাভের মুখ দেখবো সেই সময় আমার লিজ বাতিল করে দিয়ে জমিতে বাউন্ডারি দিয়েছে। এছাড়া আমার বাগানের সাইন বোর্ড ভেঙে তাদের নামের সাইন বোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে। জমিতে গেলে আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে। এতে লেবু না পাড়তে পারায় লেবু নষ্ট হয়ে বাগানেই পরে রয়েছে।

এঘটনার পরই জানতে পারি জমিটি আসলে দেওয়ান বাড়িদের না এটা বনের জায়গা। এতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। এনিয়ে কোর্টে দুটি মামলা দায়ের করেছি। পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয়নি। দেওয়ান বাড়িরা স্থানীয় প্রভাবশালী, তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পান না। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে কোন বিচার পেলাম না। 

জমির মালিকের চাচাতো ভাই সাখাওয়াত জানান, লেবুর বাগানের জমি তার চাচাতো ভাইদের। বাপ-দাদার জমি বনের নামে রেকর্ড থাকলেও দখলে রয়েছি আমরা। লেবুর বাগানের মালিক মোফাজ্জলকে পাঁচ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়েছিল। পরবর্তিতে জমি ৬০ হাজার টাকা শতাংশ দামে দুই ব্যক্তির কাছে ১১০ শতাংশ জমি বিক্রি করা হয়েছে। 

জমির মালিক দেওয়ান সুজাত আলী বলেন, জমিটি আমাদের বাপ-দাদার নামে ছিল। ৬২ সনের রেকর্ডে আমাদের নাম রয়েছে। পরবর্তিতে জমি বন বিভাগের নামে রেকর্ড হয়েছে। জমি দখলেও আমরা রয়েছি। যেহেতু আমাদের জমি তাই বিক্রি করা হয়েছে। 

বন বিভাগের কচুয়া বিট কর্মকর্তা শাহ আহমেদ বলেন, কচুয়ার দেওয়ান বাড়িরা বনবিভাগের কিছু জায়গা দখল করে আছে। তবে সরকারি জমি লিজ বা বিক্রি করার কোন নিয়ম নেই। তারপরও যদি বিক্রি করে থাকে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলার কালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম কামরুল হাসান বলেন, ‘শোনা যাচ্ছে দেওয়ানবাড়িদের লিজ দেয়া জমিটি বন বিভাগসহ খাস জায়গা। জমিটি ২১০ শতাংশ এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের কাছে লিজ দিয়েছিল দেওয়ানবাড়িরা। এনিয়ে দরবার সালিশও হয়েছে। কিন্তু কোন পক্ষই মেনে নেয়নি। এরমধ্যে ওই জমির ১২০ শতাংশ বিক্রি করে দিয়েছে।

সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একে সাইদুল হক ভূইয়া বলেন, জমি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পুলিশের কিছু করার নেই। দেওয়ানি বিষয় নিয়ে আমরা কিছু করি না। আর অভিযোগকারী থানায় কোন যোগাযোগ করেনি।

পিডিএসও/এসএমএস

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
সখীপুর,টাঙ্গাইল
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close