রাষ্ট্রপতির স্বপ্নের সড়কে অনেকের ভাগ্য খুলেছে

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৭:৩৭

আকিব হৃদয়, কিশোরগঞ্জ

হাওর এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় বর্ষাকাল ও শুষ্ক মৌসুমে তিনটি উপজেলার জনগণকে অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হতে হত। হাওরবাসীর এই কষ্ট লাঘবে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ হাওরের বুক চিরে অলওয়েদার সড়ক নির্মাণের স্বপ্ন দেখেন।

তার অভিপ্রায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সায় দিয়ে উদ্যোগ নেন বিশাল এই কর্মযজ্ঞের। হাওরবাসীর কষ্ট লাঘবে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এর অভিপ্রায় অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার মধ্যে সারা বছর চলাচলের লক্ষ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কর্তৃক ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক নির্মাণ প্রকল্প গৃহীত হয়।

হাওর বৈচিত্রময় ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে অনন্য এক স্বতন্ত্র সত্তা। এমন বিচিত্র প্রকৃতি ও জীবনধারা বাংলাদেশের আর কোথাও দেখা যায় না। শুকনো মৌসুমে দিগন্তবিস্তৃত মাঠের পর মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ আর অতিথি পাখির মেলা। বর্ষায় চারদিক থৈ থৈ করা পানি। যেন সৌন্দর্যের বিপুল পসরা সাজিয়ে বসে আছে কিশোরগঞ্জের হাওরের প্রকৃতি।

হাওরের এই সৌন্দর্যে এখন এক ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে নান্দনিক এক সড়ক। হাওরের বিশাল জলরাশির বুক চিরে বাস্তবায়িত হয়েছে ২৯.৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি। সড়কের দু’পাশে থৈ থৈ পানি, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। মেঘ আর জলের এই মনোরম মিতালির সামনে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকা। সড়কের পাশে বসে বুকভরে নির্মল বাতাস উপভোগ আর হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না।

গভীর হাওরের তিন উপজেলা ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের জন্য তৈরি করা নান্দনিক এই সড়কটি এখন সৌন্দর্যপিপাসুদের কাছে হয়ে ওঠেছে এক দুর্নিবার আকর্ষণের নাম। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এরই মাঝে আগামীর পর্যটন ঠিকানা হিসেবে দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে সড়কটি।

এর মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় পর্যটন সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। একটি মাত্র সড়ক বদলে দিয়েছে হাওরের সামগ্রিক দৃশ্যপট। সড়কটি নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন ‘ভাটির শার্দুল’ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা কিশোরগঞ্জের পূর্ব প্রান্তে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা নিয়ে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার অবস্থান। হাওর অধ্যুষিত এই তিনটি উপজেলা বছরে অর্ধেকের বেশি সময় জলমগ্ন থাকায় এলাকাটি অনগ্রসর ও দুর্গম হিসেবে পরিচিত। বছরে ৬ মাস যে হাওরবাসী অলস বসে থাকতো এখন তারা পর্যটকদের সেবায় মহাব্যস্ত।

ইটনা থেকে মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের সড়ক দেখতে যেতে হয় পানি পথ পাড়ি দিয়ে। ফলে মাঝিরা খুঁজে পেয়েছেন আয়ের উৎস। সবাই ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সড়ক দেখতে আসছেন। একটি মাত্র রাস্তা কীভাবে একটি জনপদের অর্থনৈতিক অবস্থা বদলে দিচ্ছে তা বিষ্ময়কর। দিগন্তবিস্তৃৃত জলরাশি, নয়নাভিরাম সড়ক ও হাওরের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকদের ঢল নামে সেখানে।

সরেজমিনে দেখা যায়, হাওরের মানুষ নানা পেশায় জড়িত। করিমগঞ্জের বালিখোলার মাঝি মোবারক হোসেন। শ্যালো ইঞ্জিনের ট্রলার তার। অন্যান্য সময় ট্রলার দিয়ে মাছ ধরতেন। কিন্তু এখন মানুষ পারাপার করে দৈনিক ৭০০০ থেকে ৮০০০ হাজার টাকা আয় করেন। মাত্র ১৫ মিনিটে অটোরিকশা চালিয়ে অনেকে আয় করেন ৫০০ টাকা। মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম সড়কের বড় সেতুর কাছে যেতে ১৫ মিনিটের একটি অটোরিকশার ভাড়া ৫০০ টাকা। এতে করে অটোচালক কাজল মিয়ার প্রতিদিন গড়ে আয় ৩০০০ টাকা।

রমেন বিশ্বাস অলওয়েদার সড়কে বোতলজাত পানি বিক্রি করে প্রত্যেহ আয় করেন ৫০০ টাকা। রিকশাচালক আলমগীরের আয় ১৫০০ টাকা। রতিচন্দ্র বর্মন সড়কে সকালে আচার আর বিকেলে মুড়ি বিক্রি করে আয় করেন ২০০০ টাকা।

নওয়াব মিয়া মিঠামইনের ইসলামপুর ঘাটে অস্থায়ী দোকান বসিয়ে সকালে চা আর বিকেলে বুট-মুড়ি বিক্রিতে গড়ে আয় করেন ২০০০ টাকা। হাওরে পর্যটকের ভিড় লেগে থাকায় বর্ষা মৌসুমে বেকার বসে থাকা এমন অনেকের ভাগ্য খুলেছে। মিঠামইনে অনেক হোটেল গড়ে উঠেছে। শুক্রবার ও শনিবার মিঠামইনে যেন মেলা বসে। এ সময় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মাছ-ভাত বিক্রি হয়। অধিকাংশ মানুষকে হোটেলে খাওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

এদিকে ভ্রমণে আসা লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মিঠামইন সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতির ভাতিজা অ্যাডভোকেট শরীফ কামাল পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য অটোরিকশা-মিশুকের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়াসহ খাবার হোটেলগুলোতে মূল্য ঠিক করে দিয়েছেন।

সড়কটি ইটনা উপজেলা সদর হতে শুরু হয়ে ধনু ও বাউলাই নদীর সমান্তরালে সম্পূর্ণভাবে বিস্তীর্ণ হাওরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে মিঠাইন উপজেলা সদর হয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা সদরে সমাপ্ত হয়েছে। বর্ষাকালে হাওরের পানির প্রচণ্ড স্রোতে যেন নির্মিত সড়ক বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য সড়কের সম্পূর্ণ দৈর্ঘ্যে সড়ক বাঁধের উভয় পাশের স্লোপে সিসি ব্লক দিয়ে প্রতিরক্ষা কাজ ও সড়ক বাঁধের স্থায়িত্বের জন্য টো-ওয়াল বরাবর সিসি ব্লক দ্বারা ফলিং এপ্রোনের কাজ করা হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ায় ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম তিন উপজেলার মধ্যে সারা বছর চলাচলের উপযোগী সড়ক নেটওর্য়াক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অদূর ভবিষ্যতে মিঠামইন উপজেলার সাথে একটি ফ্লাইওভারের মাধ্যমে করিমগঞ্জ উপজেলার সাথে এবং অষ্টগ্রাম উপজেলার মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার সাথে তথা ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য জেলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে।

হাওরের বিস্ময়খ্যাত এই সড়কটি এখন পরিণত হয়েছে পর্যটনের তীর্থক্ষেত্রে। সড়কটি দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন সৌন্দর্য্য আর ভ্রমণপিপাসুরা। হাজারো পর্যটকের পদচারণায় এখন মুখরিত হাওরের একসময়ের অবহেলিত আর প্রত্যন্ত এই জনপদ।

সমুদ্রে সূর্য ডোবার দৃশ্যের সঙ্গে অদ্ভুত মিল এখানে। সূর্যের সময় লালচে আকাশে ফুটে উঠে ভিন্ন রূপ। হাওরের ঢেউ আর বাতাসের শ-শ শব্দের দিগন্তবিস্তৃত এ সড়কের সৌন্দর্য ধরে রাখতে চান স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। এ জন্য প্রশাসন ইতোমধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।

মিঠামইনের ইউএনও প্রভাংশু সোম মহান বলেন, অলওয়েদার সড়ক হাওরের সৌন্দর্য্যকে বৃদ্ধি করেছে। সড়কের কাজ এখনো শেষ হয়নি। এরই মধ্যে প্রতিদিন কোনো না কোনো ভিআইপি আসছেন মহামান্যের বাড়ি ও দৃষ্টিনন্দন সড়কটি দেখতে। মাঝে মাঝে পুলিশের প্রটোকল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এছাড়া সড়কটি নির্মিত হওয়ায় হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে এখানকার অনেক মানুষ দিনে ৫০০ টাকা আয় করতে পারতো না। অথচ এখন একই ব্যক্তি দিনে কমপক্ষে ২০০০ হাজার টাকা আয় করছেন। তার মতে, মিঠামইনে ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। একইভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অষ্টগ্রাম ও ইটনায়ও। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এত দ্রুত বদলে যাবে তা কল্পনাও করেনি। সবই সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এর কল্যাণে।

কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য ও রাষ্ট্রপতির বড় ছেলে রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক বলেন, সড়কটি নির্মাণের ফলে পর্যটকরা এভাবে ভিড় করবেন প্রথমে আমরাও সেটি বুঝতে পারিনি। রাস্তাটি সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এ সড়কটি হওয়ার ফলে তিন উপজেলার মানুষের যোগাযোগসহ পরস্পরের প্রতি সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হয়েছে।

ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের জন্য আগামীতে হোটেল-মোটেল নির্মাণ করাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন আর কুয়াকাটা সমুদ্র বন্দর যেতে চায় না। হানিমুনের জন্য এটাই উপযুক্ত স্থান বলে মনে করি। হাওর তথা দেশের এ সম্পদকে রক্ষা করার জন্য তিনি সকলে প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

পিডিএসও/এসএম শামীম