বাড়ি থেকে পালিয়ে আসি আত্মহত্যার উদ্দেশে, বললেন করোনা রোগী

প্রকাশ | ১৯ এপ্রিল ২০২০, ১৭:৩০

মো. দুলাল মিয়া, নাঙ্গলকোট(কুমিল্লা)

করোনা ভাইরাসের কথা শুনে আশ-পাশের লোকজনের চাপ সহিতে  না পেরে বাড়ি থেকে পালিয়ে আসি আত্মহত্যা করার উদ্দেশ্যে।

রোববার বিকেলে প্রতিদিনের সংবাদকে মুঠোফোনে এসব কথা বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন করোনা আক্রান্ত কার্তিক দাস (৩৮)। বর্তমানে স্ত্রী লাকি রানী ও দুই ছেলেকে নিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ পৌরসভার ভাঙ্গাপাড়া গ্রামে গত এক বছর ধরে ভাড়া বাড়িতে বসবাস করে আসছেন। 

কার্তিক চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার ৯নং উত্তর গোবিন্দপুর ইউপির দানোয়া গ্রামের মৃত. সাহদেব দাসের ছেলে। ঘর-বাড়ি সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই তার। বাকী জীবন পার করছেন অন্যের বাড়িতে ভাড়া থেকে।

তিনি আরও জানালেন,  নয় মাস পূর্বে কক্সবাজার এলাকায় একটি শপিং ব্যাগের কারখানায় ১৫ হাজার টাকায় বেতনে চাকরি নেন । এ নিয়ে সুখে শান্তি চলছিল তার সংসার। 

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার গত ২৬-মার্চ রাত থেকে সারাদেশে সরকারি ছুটি শুরু হয়। এরপর থেকে বন্ধ হয়ে যায় সকল অফিস-আদালত, কল-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই থেকে বাদ যায়নি কার্তিকের শপিং ব্যাগের কারখানাও।

কার্তিক বলেন, এর কিছুদিন পরে লকডাউন ঘোষণা করে পুরো কক্সবাজার জেলা। নেমে আসে তার জীবনে অশুভ ছায়া। ওখানে কিছু দিন অপেক্ষা করার পর গত শনিবার (১১-এপ্রিল) কক্সবাজার এলাকা থেকে কখনো রিক্সা আবার কখনো পায়ে হেঁটে প্রায় ৩০ ঘণ্টা সময় লাগিয়ে রামগঞ্জ পৌরসভার ভাড়া বাড়িতে গিয়েও উপস্থিত হই।

কার্তিকে ভাষ্যমতে, বাড়িতে আসার পর স্বেচ্ছায় কয়েকদিন হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন। যখন তার জ্বর-সর্দি হয় এবং শরীর অসুস্থ অনুভব হয় তখন রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে নমুনা দিয়ে আসেন। পরে গত বৃহস্পতিবার (১৬- এপ্রিল) রাতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে পারেন তার রিপোর্টে পজেটিভ তার। পাশাপাশি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারগণ তাকে বাড়ি থেকে বাহির হতে বারণ করেন। সে অনুযায়ী কার্তিক বাড়িতে রয়েছেন।

করোনা রোগের খবরটি এলাকার লোকজনের মধ্যো জানাজানি হলে ওই ভাঙ্গাপাড়া এলাকার পৌর কাউন্সিলর ফোন দিয়ে বাড়ি থেকে বাহির হতে বারণ করেন। পরে শুক্রবার সকালে বাড়ির পাশের লোকজন অকাট্য ভাষায় গাল মন্দ করতে থাকে।পাশাপাশি তাকে বাড়ি ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। এক পর্যায়ে শনিবার সূর্য উঠার আগে লোকজন এসে বাড়ি থেকে বাহির হওয়ার জন্য বলেন। তখন তিনি তাদের বলেন, আমাকে একটু সময় দেন। আমার মোবাইলে চার্জ নেই।  একটু চার্জ দিয়ে নিই।  তারা বলে, তোমাকে আর কোনও সুযোগ দেয়া হবে না। এখনি বাহির হতে হবে। এখানে আর থাকা যাবে না। সে কোনো উপায় না পেয়ে বাড়ি থেকে বাহির হয়।  আর মনে মনে চিন্তা করে এটা তার শেষ আসা।  তার বৌ লাকি রানী থেকে শেষ বিদাই নিয়ে চলে আসেন। আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন দূরে কোথাও গিয়ে আত্মহত্যা করবেন।

কার্তিক কাঁদতে কাঁদতে প্রতিদিনের সংবাদকে আরও বলেন, এ জীবন আর বাঁচিয়ে রাখতে চাইনা। সবাই শুধু অবহেলা করে।আর যেহেতু এ রোগের কোনও চিকিৎসা নেই।  তাহলে আমার বেঁচে থেকে লাভ কী। আজ না কাল আমাকে মরতে হবে। তাই শনিবার সকালে বাড়ি থেকে পালিয়ে চালের ট্রাকে করে কুমিল্লার  লাকসামে আসি। পরে সেখান থেকে রেললাইনের পথ ধরে পায়ে হেঁটে রাত ১০ টার সময়  নাঙ্গলকোট রেল স্টেশনে যাই। এতক্ষণে মোবাইলের চার্জ নিবো নিবো। প্রায় বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে। আশেপাশের দোকান খোঁজ করি একটু মোবাইলে চার্জ দেয়ার জন্য। কিন্তু কোথাও কিছু পাইনি। অবশেষে রেল স্টেশন একটি সকেট থেকে চার্জ দিয়ে ৯৯৯ এ কল দিলাম। আমার পরিচয় দিলাম। তারা আমাকে  থানার একটি নাম্বার দেন। এবং আমি যেখানে আছি সেখানে অবস্থান করার জন্য বলেন।

কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর এর নির্দেশ পাওয়া মাত্র রাতে এএসপি সার্কেল (চৌদ্দগ্রাম) সাইফুল ইসলাম সাইফ, নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লামইয়া সাইফুল ও নাঙ্গলকোট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী মিলে ওই রোগীকে উদ্ধার করে।  পরবর্তীতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সহায়তায় উপজেলার গোহারুয়া ২০ শয্যার পরিত্যাক্ত হাসপাাতাল সেন্টার এ পাঠানো হয়েছে।

রোববার দুপুরে কার্তিক দাসের সাথে কথা হলে তিনি আরো বলেন, বর্তমানে খুব ভালো আছি। এখানে আামকে সময় মতোন খাবার ওষুধ দিচ্ছেন। আমি এখন খুব ভালো আছি।  রামগঞ্জ থাকলে এতক্ষণে আমাকে লাশ হতে হতো। আমি বাঁচতে চাই। আমাকে প্রয়োজনীয় সেবা দিতে সরকারের কাছে দাবি জানেই।

এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট থানার অফিসার ইনচার্জ বখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কার্তিককে উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে রোববার বিকালে লক্ষ্মীপুর জেলা আইসোলেশান সেন্টারে পাঠানো হবে।        

পিডিএসও/মা