নিজস্ব প্রতিবেদক

  ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

লোকসানে নিঃস্ব অনেক প্রান্তিক খামারি

দুধের উৎপাদন বাড়লেও সুফল মিলছে না!  

ফাইল ছবি

সংকট ও বাধা-বিপত্তির মধ্যেও দেশে বাড়ছে দুধের উৎপাদন। এক দশকে উৎপাদন বেড়েছে পাঁচগুণ। তবে দুধের ‘সেলফ লাইফ’ কম হওয়ার পাশাপাশি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা ভালো না থাকায় নষ্ট হচ্ছে অনেক দুধ। ফলে ছোট খামারিরা বাধ্য হয়ে মিষ্টির দোকাননির্ভর হয়ে পড়ছেন। এতে লোকসান দিতে দিতে নিঃস্ব হচ্ছে অনেক প্রান্তিক খামারি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুধ পানের পরিমাণ বাড়াতে উৎপাদনে নজর দিতে হবে। এর জন্য খামারিদের উন্নয়ন দরকার। গো-খাদ্য সহজলভ্য করতে হবে। খামার থেকে ভোক্তা পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীর তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। মনোযোগ দিতে হবে দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত করা ও প্রক্রিয়াজাতকরণে। যদিও দুধের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে গবাদি পশুর জাত উন্নয়ন, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার ব্যবস্থা জোরদারকরণ, দুগ্ধজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণসহ স্কুলফিডিংয়ের মাধ্যমে দুধপানের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশকে দুধ উৎপাদনে স্ব^য়ংসম্পূর্ণ, সুষ্ঠু সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন প্রকল্প নিলেও এর সুফল প্রান্তিক খামারিদের দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি।

খামারিরা জানান, সরকারের উদ্যোগ থাকলেও সুবিধাগুলো প্রান্তিক পর্যায়ে সঠিকভাবে পৌঁছায় না। এজন্য কর্মকর্তাদের খামারগুলোতে নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। খামারিদের ঘোষণা দিয়ে প্রণোদনা দিতে হবে। সুদবিহীন ঋণ দিতে হবে।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থানার ইমামপুরের ক্ষুদ্র খামারি মো. রাজিব খান বলেন, ১০ বছর আগে ৪টি গরু দিয়ে খামার শুরু করি। ১০ বছরে খামারে ছোট-বড় ২৬টি গরু হয়েছে। কিন্তু করোনার সময় নানা সমস্যায় ঋণগ্রস্ত হয়ে ১০টি গরু বিক্রি করে দিয়েছি। বর্তমানে ১৩টি গরু আছে। ৩টি গরু ৩০ লিটার দুধ দেয়। দুধের বাজার না থাকায় এলাকায় মিষ্টির দোকান ও চায়ের দোকানে দুধ বিক্রি করি।

ফরিদপুরের পশ্চিম খাবাশপুরের খামারি কাজী কামরুল হাসান বলেন, তার খামারে ৭০টি গরু রয়েছে। ১৮টি গরু থেকে প্রতিদিন ২৬০ লিটার দুধ উৎপাদন হয়। নিজ উদ্যোগে স্থানীয় বাজারে একটি দুধ বিক্রয় কেন্দ্র বা মিল্ক সেলস সেন্টার তৈরি করে ৭০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করি। কিছু দুধ ৬০ টাকা দরে মিষ্টির দোকানে চলে যায়। তবে গো-খাদ্যের যে দাম বেড়েছে এ দামে দুধ বিক্রি করলেও লাভ হয় না। কারণ আমার খামারে সাতজন কর্মচারী রয়েছে। তাদের থাকা-খাওয়ার খরচও বেশি।

মানিকগঞ্জ ফ্রেন্ডস ডেইরি ফার্মের মালিক ও মানিকগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মহিনুর রহমান বলেন, বর্তমানে খামারে ৩৯টি গরু রয়েছে। রাখাল রয়েছে ৬ জন। এর মধ্যে ২৬টি গরু দুধ দেয়। গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ লিটার দুধ উৎপাদন হয় প্রতিদিন। এর মধ্যে বাসা থেকে ৫৫ টাকা দরে ৪০ শতাংশ ও ৫০ টাকা লিটার দরে বাকি দুধ মিষ্টির দোকানে বিক্রি করি। স্থানীয় বাজারে আরে কম গড় দামে ৫০ টাকা লিটার বিক্রি হয়। যারা এক/দুটি গরু পোষে তাদের জন্য দাম ঠিক আছে। কিন্তু আমাদের খরচ অনেক বেশি পড়ে। ফলে আমাদের কোনো লাভ হয় না।

প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) চিফ টেকনিক্যাল কো-অর্ডিনেটর ড. মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের খামারিরা যাতে সারা বছর দুধ বিপণন করতে পারে সেজন্য তাদের সংগঠিত করতে প্রোভাইডার গ্রুপ করা হচ্ছে। প্রকল্প থেকে উদ্যোক্তাদের প্রস্তাবনা বিবেচনা করে কালেকশন সেন্টার তৈরিতে মোট খরচের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ সহায়তা করা হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহজাদা বলেন, আমরা চাই খামারিরা যেন তাদের উৎপাদিত দুধ তারা নিজেরাই বিক্রি করতে পারে। সে সুযোগ তৈরি হলে তারা উৎপাদনও বাড়াবে। সেজন্য আমরা পাঁচ হাজার পাঁচশটি গ্রুপ তৈরি করেছি, যার মাধ্যমে আমাদের এ প্রক্রিয়া শুরু হবে। আমরা কাজ করছি ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে। দুধ পাওয়া যায় না, এমন পরিস্থিতি তো আমাদের সৃষ্টি হয়নি। ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায় ক্রেতা বাড়ছে, মানুষ সচেতন হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সামনের দিনগুলোর কথা মাথায় রেখেই আমরা কাজ করছি।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
দুধ,খামারি
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close