সৌরবিদ্যুতে লক্ষ্য পূরণ সহজ নেট মিটারিংয়ে

প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৩২

মিজান রহমান

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ উৎপাদন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় চলতি বছরের মধ্যে দেশে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ এ উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল। ২০২০ সাল শেষ হতে চললেও লক্ষ্যমাত্রার ধারে-কাছেও পৌঁছাতে পারেনি নবায়নযোগ্য খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন। গবেষকরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য মেগাওয়াট আকারের ব্যয়বহুল প্লান্ট স্থাপনের চেয়ে সহজ উপায় হলো শহরাঞ্চলে নেট মিটারিং পদ্ধতির দ্রুত সম্প্রসারণ।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা যায়, বাস্তবে ১০ শতাংশের স্থলে মাত্র ২-৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। তাও আবার প্রায় ৫৫ বছর আগে কাপ্তাইয়ে স্থাপিত দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা হিসাবে ধরে।

বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলাউদ্দিন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, খুব দ্রুতই এই অবস্থার উন্নতি হবে। বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পথে। তাছাড়া সৌরবিদ্যুৎ অ্যাকশন প্ল্যান ২০২১-৪১ প্রণয়ন করা হচ্ছে নবায়নযোগ্য খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। হালনাগাদ করা হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিও।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সর্বশেষ তথ্য মতে, দেশে এখন বিদ্যুতের সর্বমোট স্থাপিত উৎপাদনক্ষমতা ২১ হাজার ৮৭৫ মেগাওয়াট। সে অনুযায়ী, সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য চলতি বছরের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কথা প্রায় ২ হাজার ১৮৮ মেগাওয়াট (১০ শতাংশ)। স্রেডার ওয়েবসাইটের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বর্তমানে ৭০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি, যা সর্বমোট উৎপাদনক্ষমতার ৩ শতাংশের কিছু বেশি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল হক বলেন, আগামী কয়েক মাসে মেগাওয়াট আকারের কয়েকটি প্রকল্প সম্পন্ন হতে পারে। তবে যে গতিতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের কাজ হচ্ছে তাতে সময়মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। কাজের গতি অবশ্যই বাড়াতে হবে। কেন সরকারের পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুৎ উৎপাদন তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

তবে টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন একজন সাংবাদিক বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের জন্য মেগাওয়াট আকারের ব্যয়বহুল প্লান্ট স্থাপনের চেয়ে সহজ উপায় হলো শহরাঞ্চলে নেট মিটারিং পদ্ধতির দ্রুত সম্প্রসারণ। তিনি জানান, নেট মিটারিং পদ্ধতিতে গ্রাহক নিজ বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল লাগিয়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন তা ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিশেষ ধরনের মিটারের মাধ্যমে চলে যায় জাতীয় গ্রিডে। দিনের বেলা নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর বাড়তি সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন উদ্যোক্তা। রাতে বিদ্যুতের বিতরণ লাইন থেকে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ নেবেন তিনি। এ বিষয়ে সরকার ও উদ্যোক্তা চুক্তিবদ্ধ হবেন। মাস শেষে গ্রাহক গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন তা থেকে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের দাম বাদ দিয়ে বিল করা হবে। এতে বিদ্যুৎ বিলে সাশ্রয় হয় গ্রাহকের। আবার সরকারের তহবিল থেকেও তেমন কোনো অর্থ খরচ হয় না। উন্নত দেশগুলো ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশে এই পদ্ধতি চালু আছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশেও বছর দুয়েক আগে প্রতিটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিকে বছরের মাঝামাঝি সময়ে দুই মাসের টার্গেট দিয়ে ২০ জন করে নেট মিটারিং গ্রাহক সৃষ্টি করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ছাড়া সবাই এই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। পরে আবার নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। নেট মিটারিং পদ্ধতির জন্য একটি খসড়া বিধিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে শেষ দিকে বিদ্যুৎ ভবনে ওই বিধিমালার ওপর একটি সভাও অনুষ্ঠিত হয়।

নবায়নযোগ্য খাতের প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতার অবস্থা স্থাপিত ক্ষমতার চেয়েও শোচনীয়। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, এখন দেশে বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা ১৫ হাজার মেগাওয়াট। সে অনুযায়ী নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কথা ১৫০০ মেগাওয়াট (১০ শতাংশ)। কিন্তু স্রেডার তথ্য মতে, দেশে এখন নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুতের প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা ৩১৭ মেগাওয়াটের কাছাকাছি যা পরিকল্পনার ২ শতাংশের কিছু বেশি।

অবশ্য ময়মনসিংহের সুতিয়াখালীতে ৫০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছে। অচিরেই সেটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে। তখন প্রকৃত উৎপাদনের হার কিছুটা বাড়বে।

জানা যায়, ২০১৮ সালে নবায়নযোগ্য বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বছরভিত্তিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০২১ সাল পর্যন্ত ব্যাপ্ত সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়নের ধারে কাছে পৌঁছাতে পারেনি। ওই পরিকল্পনায় ২০১৮ সালকে ভিত্তি বছর ধরে পরবর্তী তিন বছরের সম্ভাব্য অর্জনের একটি হিসাব করা হয়েছিল। সে অনুসারে ২০১৮ সালে নবায়নযোগ্য বিভিন্ন উৎস থেকে মোট ৫৮৪ দশমিক ৭২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কথা। এরপর ২০১৯ সালে নতুন ৪৩২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট; ২০২০ সালে ৬০৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট এবং ২০২১ সালে ৫৫৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নবায়নযোগ্য বিভিন্ন উৎস থেকে এ বছরের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট এবং আগামী বছর (২০২১ সাল) মোট ২১৭৭ দশমিক ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

স্রেডার ওয়েবসাইটে মোট ৩৬টি নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে চারটি সমাপ্ত হয়েছে বলে উল্লেখ আছে। এ চারটি হচ্ছে কাপ্তাইয়ে ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট, পঞ্চগড়ে ৮ মেগাওয়াট, টেকনাফে ২০ মেগাওয়াট এবং সরিষাবাড়ীতে ৩ মেগাওয়াট। এ ছাড়া ১১টি প্রকল্পের কাজ চলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্রেডার সূত্রের দাবি, এর মধ্যে কয়েকটির কাজ শেষ পর্যায়ে। এই ১১টি প্রকল্পের মোট উৎপাদনক্ষমতা ৬১৫ মেগাওয়াট। অবশিষ্ট ২১টি প্রকল্পের মধ্যে দুটি বাতিল করা হয়েছে। আর ১৯টিকে বলা হয়েছে ‘পরিকল্পনাধীন’। এই ১৯টি প্রকল্পের মোট উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২১০ মেগাওয়াট।

পিডিএসও/হেলাল