ব্রেকিং নিউজ

আবার কারসাজির পাঁয়তারা

প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০৯:১৮

হাসান ইমন

বাজারে আলুর দাম কিছুটা কমলেও সরকারিভাবে বেঁধে দেওয়া দামে আলু বিক্রি হচ্ছে না দেশের কোথাও। খোদ সরকারেরই বিপণন প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গত শুক্রবারের বাজার দর তালিকায় দেখা যায়, ওই দিন আলু বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা কেজি দরে। নির্ধারিত দামের চেয়ে এটি কেজিপ্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি। এর কারণ জানতে চাইলে খুচরা ব্যবসায়ীরা পাইকারদের ওপর, পাইকাররা এই দোষারোপের মাশুল দিচ্ছেন ভোক্তারা। অভিযোগ রয়েছে, হিমাগারের মালিক ও আড়তদাররা মিলে দুষ্টচক্র তৈরি করছেন।

গতকাল শনিবার রাজধানীর রামপুরা ও কারওয়ানবাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা বাজারে আলুর দাম ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। আর পাইকারি পর্যায়ে বিক্রি হয় ৩৪ থেকে ৩৫ টাকায়। রামপুরা বাজারের খুচরা বিক্রেতা আহম্মদ আলী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘পাইকারি বাজারে আলুর দাম ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা রাখা হয়। পাইকারি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত এক কেজি আলু নিয়ে আসতে পাঁচ টাকা খরচ অতিরিক্ত পড়ে যায়। এতে কিভাবে আমরা ৩৫ টাকায় বিক্রি করব? পাইকারি বাজারে দাম কমলে আমাদের এখানে দাম কমে আসবে।’

এ ব্যাপারে কাওয়ানবাজারে বিসমিল্লাহ বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী আফজাল প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আমরা কমিশনে আলু বিক্রি করি। আলুর দাম বাড়ানোতে আমাদের হাত নেই। আমরা যে দামে পাব সেই দামে বিক্রি করব। তিনি আরো বলেন, আমাদের হাতে আলু নেই। বাজারে আলুর সরবরাহ কম। তাই আলু বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। আজ (শনিবার) বস্তা প্রতি (৫০ কেজি) ১ হাজার ৭০০-১ হাজার ৭৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে; যা কেজিতে ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা। বেশি দামে বিক্রি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত বাজারে আলুর সরবরাহ কম। কারওয়ানবাজারে দৈনিক ১৫ ট্রাক আলুর প্রয়োজন। এই ১৫ ট্রাক আলু এলে বাজার স্বাভাবিক। এর কম হলে বাজারে ঘাটতি, দাম বাড়বে। আর এর বেশি হলে দাম কমে যাবে। দ্বিতীয়ত ময়মনসিংহ ও বগুড়া থেকে যে আলু নিয়ে আসি তাতে দাম বেশি পড়ে। ওইখান থেকে আলু আনলে বস্তা প্রতি দাম পড়ে ১ হাজার ৬০০-১ হাজার ৬৫০ টাকা; যা কেজিপ্রতি পড়ে যায় ৩২ থেকে ৩৩ টাকা বেশি। আর ঢাকায় নিয়ে আসতে খরচ হয় কেজিপ্রতি দুই টাকা। সবমিলিয়ে খরচ পড়ে ৩৪ থেকে ৩৫ টাকা। সে হিসাবে আমাদের লাভ হয় না। এজন্য গত দুই দিন আলু আনিনি।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ মোকামের পাইকারি ব্যবসায়ী ফরহাদ ব্যাপারী প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এখন বাজারে আলুর সংকট চলছে। কৃষকরা বাজারে আলু নিয়ে আসছে না। আর হিমাগারে রাখা ব্যবসায়ীরাও আনছে না। সব মিলিয়ে বাজারে এখন সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যে কয়েকজন আলু নিয়ে আসছে তারা আবার সরকারি নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি করছে না। সরবরাহ কম থাকায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জের দেওয়ান কোল্ড স্টোরেজের স্বত্বাধিকারী আলী আহম্মেদ দেওয়ান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এই কোল্ড স্টোরেজে ১ লাখ ১৫ থেকে ২০ হাজার বস্তা আলু আছে। যদি নিয়মিত সরবরাহ হয় তাহলে এক মাস চলবে। এরপর সংকটের সৃষ্টি হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সমান ভাগ আলু রয়েছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ি আমরাও আলু ছাড়ছি।

তবে নাম প্রকাশ করা না শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, পাইকারি ব্যবসায়ী ও কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসায়ীরা মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে নতুন আলু আসার সম্ভাবনা কম থাকায় তারা সিন্ডিকেট করে আলু বিক্রি করছে না।

পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও অস্বাভাবিক দামে আলু বিক্রি হওয়ায় গত ৭ অক্টোবর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কেজিপ্রতি ৩০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। এরপর দেশের বিভিন্ন হিমাগার ও পাইকারি দোকানে অভিযান চালায় প্রশাসন। প্রতিবাদে ১৯ ও ২০ অক্টোবর বাজারে আলু সরবরাহ বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা। বাধ্য হয়ে সরকার ২০ অক্টোবর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে আলুর দাম খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গত বুধবার থেকে সেই দাম কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গতকালও ব্যবসায়ীরা তা মানেননি।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সম্মতিতে আলুসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ, অভিযান, মন্ত্রীদের অনুরোধ কোনো কিছুকেই পাত্তা দিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। বাজারজুড়ে চলছে অস্বাভাবিক দামের প্রতিযোগিতা! বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন অভিযানে নামলে সবাই সঠিক দামে পণ্য বিক্রি করেন। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার পরপরই আবার আগের অবস্থা ফিরে আসে।

প্রশাসন-ব্যবসায়ীদের এই ‘ইঁদুর-বিড়াল’ খেলার মাশুল গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ ও দিনমজুরদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাজারে এ অস্থিরতার জন্য প্রশাসনের দুর্বল বাজার পর্যবেক্ষণকে দায়ী করছেন ক্রেতারা। তারা গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো এবং ভোক্তা আইনের কঠোর প্রয়োগ করার দাবি জানান। তবে জনবল সংকটের কারণে বাজার পর্যবেক্ষণ ঠিকমতো করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে প্রশাসন।

ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বাজারে চলমান অস্থিরতা নিরসনে প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ। শুধু জরিমানা বা অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে জরিমানার পাশাপাশি জেলও দিতে হবে। তাহলেই সমস্যা অনেকটা সমাধান হবে।

আমাদের সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি জানান, ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করার নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না সৈয়দপুরে। বাজারে আগের দামেই আলু বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায় আলু ব্যবসায়ীরা ভোক্তা পর্যায়ে ৪৮ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকার আলুর দাম কেজি প্রতি খুচরা পর্যায়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, পাইকারি ২৫ থেকে ৩০ টাকা ও হিমাগার পর্যায়ে ২৩ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে চিঠি দেয়। সরকার নির্ধারিত দামে আলু বিক্রি না হলে প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয় ওই চিঠিতে। বিষয়টি জানতে পেরে ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে আলু অন্যত্র সরাতে শুরু করেন।

এ বিষয়ে সবজি আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক তোফায়েল হোসেন জানান, সরকারের নির্দেশ মানতে তিনি প্রস্তুত কিন্তু হিমাগারে মজুদ করা আড়ত ব্যবসায়ীরা সরকারের নির্দেশ মানছেন না। সেখানে আলুর দাম চড়া বলে ব্যবসায়ীসহ কৃষকরা তাদের আলু আড়তে খুব একটা আনছেন না বলে দাম কিছুটা চড়া। সৈয়দপুরের ইউএনও নাসিম আহম্মেদ জানান, সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে তিনি বদ্ধ পরিকর। সংকট ও চড়া দাম মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন।

পিডিএসও/হেলাল