শঙ্কা কাটছে না পর্যটনশিল্পে

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ১২:০৭ | আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ১২:২১

মিজান রহমান

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে একটি হোটেল পরিচালনা করেন শেখ ইমরুল ইসলাম সিদ্দিকী রুমি। নভেল করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত মার্চের পর থেকে আয় নেই তেমন। এখন সামনের মৌসুম নিয়েও আছেন দুশ্চিন্তায়। হোটেলের রক্ষণাবেক্ষণ, সাজসজ্জা ও কর্মচারীদের বেতন মিলে বিনিয়োগ আছে মোটা অঙ্কের অর্থ। কিন্তু আসছে মৌসুমে পর্যটকের আনাগোনা কেমন হবে, অন্য বছরের মতো চাহিদা থাকবে কি না, বিনিয়োগ উঠে আসবে কি নাÑ এসব নিয়ে শঙ্কা কাটছে না তার। একই রকম শঙ্কায় আছেন দেশের বেশির ভাগ পর্যটন ব্যবসায়ী।

কক্সবাজারে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল, প্রায় ৬০০ রেস্তোরাঁ, বার্মিজ মার্কেটসহ হাজার পাঁচেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল প্রায় পাঁচ মাস। এতে কর্মহীন হয়ে পড়ে লক্ষাধিক মানুষ। সম্প্রতি পর্যটনের জন্য বিভিন্ন শর্তে সীমিত পরিসরে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে কক্সবাজার। তবে এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি দেশের সবচেয়ে বড় এ সমুদ্রসৈকত। ছুটির দিন ছাড়া অন্যান্য দিন পর্যটক থাকে হাতেগোনা। মহামারির পাশাপাশি ভরা মৌসুম না হওয়ায় বেকায়দায় আছেন ব্যবসায়ীরা। তবে পরিস্থিতির আরো উন্নতি হলে আসন্ন পর্যটন মৌসুমে দেশি পর্যটকে ব্যবসা চাঙা হওয়ার আশায় বুক বাঁধছেন তারা।
 
ট্যুরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সূত্রে জানা গেছে, ভরা মৌসুমে কক্সবাজারে প্রতি বছর দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে। কয়েক মাসের অচলাবস্থার পর কম হলেও কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকের আনাগোনা শুরু হয়েছে। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পর্যটন স্পটগুলোতেও পা পড়ছে পর্যটকদের। সামনের মৌসুমে মহামারির প্রাদুর্ভাব আরো কমে গেলে পর্যটকও বাড়বে।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি তৌফিক উদ্দিন আহমেদ প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, গেল কয়েক মাসে পর্যটন খাত প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী। ছোট ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হওয়ার পথে। কারণ তাদের কাছে জমানো মূলধন তেমন থাকে না। এখন বিভিন্ন স্পট খুলে গেছে। সবাই নতুন বিনিয়োগ করে ব্যবসায় নেমেছেন। নভেম্বর থেকে শুরু হবে প্রধান মৌসুম। সবাই নতুন মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আশা ও আশঙ্কা দুই-ই রয়েছে। বিশেষ করে করোনার কারণে মানুষ বিদেশে ঘুরতে যেতে পারছে না। তাই অভ্যন্তরীণ পর্যটক বাড়বে। কিন্তু করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা লাগলে বা মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ভ্রমণ কমিয়ে দিলে ব্যবসায়ীরা পথে বসবেন। এজন্য অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাতে সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক টানতে ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুত সহজ করা উচিত।

সম্প্রতি ট্যুরিজম বোর্ডের এক কর্মশালায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, কোভিড-১৯-এর কারণে বন্ধ থাকা দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটক ও পর্যটনশিল্পে জড়িত সবাই যাতে স্বাস্থ্যবিধি ও অন্যান্য নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, সে ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসনকে সজাগ থাকতে হবে। পর্যটক ও জনসাধারণ যাতে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যগত হুমকিতে না পড়ে, সে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন কঠোরভাবে মনিটরিং করবে। পর্যটনকেন্দ্রে সবাইকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে নতুন বছরে পর্যটন আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন পর্যটন খাতের বিশ্লেষক কামরুল ইসলাম। তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, কক্সবাজারের পাশাপাশি সেন্টমার্টিন, হিমছড়ি, ইনানী বিচসহ সিলেটের চা বাগান, জাফলং, রাতারগুল জলাবন, হাকালুকি হাওর, লালাখাল, ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, তামাবিল, মাধবকুন্ডের জলপ্রপাত, পাহাড়, ঝরনা সব মিলিয়ে নানা বৈচিত্র্যের সম্ভার আছে সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ সবুজ লীলাভূমিতে। ঐতিহ্যময় বাংলার সৌন্দর্য সুন্দরবন, বগুড়ার মহাস্থানগড়, দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির, রামসাগরসহ সারা দেশের আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলো পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। পর্যটকদের সামনেও দেশকে চেনা-জানার একটি সুযোগ চলে এসেছে করোনা মহামারির কারণে।

বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে, তা অবহিত করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। তাছাড়া পর্যটন-সংক্রান্ত একটি মহাপরিকল্পনা নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সংক্রমণের ভয় : পর্যটকবাহী পরিবহন থেকে শুরু করে পর্যটন এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারিভাবে হোটেল-মোটেল চালু করা হলেও পর্যটকদের ভিড়ে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে পারে। এতে আসতে পারে বড় বিপর্যয়। এ কথা মাথায় রেখেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যটন স্পটগুলো কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) বা আদর্শ পরিচালনা পদ্ধতি জারি করেছে পর্যটন মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন পরিবহন, হোটেল, মার্কেট, রেস্তোরাঁয় পাঠানো হয়েছে সেটি। বিষয়টি নজরদারির জন্য জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করা হয়েছে।

পর্যটনের ক্ষতি : এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, মহামারির কারণে দেশে পর্যটন খাতে ক্ষতি হয়েছে ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বেকার হয়ে পড়েছে এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত ৪০ লাখ মানুষ। তাদের ওপর নির্ভরশীল কমপক্ষে দেড় কোটি মানুষ কঠিন সময় পার করেছে।

প্যাসিফিক এশিয়া ট্রাভেলস অ্যাসোসিয়েশনের (পাটা) রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হারিয়েছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে পর্যটন খাতসংশ্লিষ্ট ৩ লাখ ৯ হাজার মানুষের চাকরি। গেল তিন মাসে তা আরো বেড়েছে।

পিডিএসও/ জিজাক