ব্রেকিং নিউজ

অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি ১২ দেশে

প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৩৬

শাহজাহান সাজু
প্রতীকী ছবি

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় ১২ দেশে। এখন এই অর্থ ফেরত আনতে চায় সরকার। এজন্য তথ্য আদান-প্রদানসহ কার্যকর উদ্যোগ নিতে সম্প্রতি একটি কমিটিও করা হয়েছে। ওই কমিটি বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার সম্পর্কিত মামলা, বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, তথ্য বিনিময়ের বিভিন্ন জটিলতা, বিভিন্ন দেশের আইনকানুন পর্যালোচনা করে কার্যকর অর্থ উদ্ধার কার্যক্রমের কৌশল নির্ধারণে প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। এ লক্ষ্যে ওইসব দেশের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রতিবেদনের এই সুপারিশ করা হয়েছে। তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

বিএফআইইউয়ের প্রতিবেদন অনুমোদন ও সুপারিশমালার বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলামের সভাপতিত্বে মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা এবং নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওয়ার্কিং কমিটির ১৮তম সভা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হয়। ওই সভায় প্রতিবেদনটি অনুমোদন দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, সুইস ব্যাংকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য তথ্য আদান-প্রদানসহ একটি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সম্প্রতি বিএফআইইউ প্রধান কর্মকর্তা আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনআরবি), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের প্রতিনিধিও ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিবেদনে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, হংকং, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কেইম্যান আইল্যান্ডস ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসহ ১২ দেশে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। এ অর্থ ফেরত আনতে এসব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সমোঝতা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি করার কথাও বলা হয়েছে।

সূত্র জানায়, পাচার অর্থ ফেরত আনতে বৈঠকে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দেশে কী পরিমাণ অর্থ ইতোমধ্যে পাচার হয়েছে, তা নির্ধারণে একটি ডেটাবেইজ তৈরি করতে করতে হবে, পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করতে এবং আগামীতে পাচার রোধে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়। চলতি বছর এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) বার্ষিক সম্মেলন বাংলাদেশে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণে সেটা হয়নি। তবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেটা মালয়েশিয়ায় হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সম্মেলনে অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে সহযোগিতা কামনা করা হবে।

বৈঠকে আরো বলা হয়, যেসব দেশে অবৈধভাবে টাকা যায়, সে দেশেরও নৈতিক দায়িত্ব এর উৎস জানতে চাওয়া। তাহলে টাকা পাচারটা কমে যায়। কিন্তু ওইসব দেশের সঙ্গে চুক্তি না থাকলে তারা নিজে থেকে এই কাজগুলো করে না। কারণ তাদের অর্থনীতিতে তো টাকা ঢুকছে। এ বিষয়ে এপিজির কাছে সহযোগিতা চাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নতুন এপিজির সহযোগিতা কামনা করা হলে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মানি লন্ডারিং ইস্যু জানতে চাইবে। দেশের অভ্যন্তরীণ মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করার সুপারিশও করা হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল অব বাংলাদেশ, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, দুদক, এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ এ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

বৈঠকে বলা হয়, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত এবং পাচার রোধে দূতাবাসগুলোতে গোয়েন্দা কার্যক্রম রাখতে হবে। আর্থিক কর এবং দুদকের প্রতিনিধিদের ওইসব জায়গায় কিছু সময়ের জন্য পদায়ন করা যেতে পারে। অ্যাসেট রিকভারি এবং ট্যাক্স রিকভারি দুই পদ্ধতি অবলম্বন করা। অ্যাসেট রিকভারি যদি কঠিন হয়, তাহলে ট্যাক্স রিকভারি করতে হবে। অর্থ পাচার রোধে আমদানি-রফতানিতে পণ্য ও সেবার ওপর ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিং করা, শিপমেন্টের ওপর আন্ডার ও ওভার ইনভয়েসিং করা, আমদানি-রফতানিতে বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং করা এবং রফতানি পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা দেওয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন যথাযথভাবে দেশের ব্যাংকগুলোকে মেনে চলতে বাধ্য করারও সুপারিশ করা হয়েছে।

জানা যায়, গত ২ মে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) অর্থ পাচারের যে তথ্য প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। এতে বলা হয়েছে, আমদানি-রফতানিতে আন্ডার ইন ভয়েস এবং ওভার ইন ভয়েসের মাধ্যমেই প্রধানত অর্থ পাচার করা হয়। এবারের প্রতিবেদনে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা।

এ ছাড়া সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বছর যে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে সেখানে ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা, যা এর আগের বছর থেকে ১৫০ কোটি টাকা কমেছে।

পিডিএসও/হেলাল