পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ বেড়েছে, দায় কার?

প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২৫ | আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৩:০৬

হাসান ইমন

পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ভারত রফতানি বন্ধ করায় অস্থির হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের পেঁয়াজের বাজার। গত বছরও এই অস্থিরতায় প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ৩০০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। এ বছরও একই আশঙ্কায় অনেকে বেশি করে পেঁয়াজ কিনতে শুরু করেন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই নিত্যপণ্যের দাম দ্বিগুণ বেড়ে সর্বোচ্চ ১০০ টাকায় গিয়ে পৌঁছে। অবশ্য ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসার আগেই টিসিবি প্রতি কেজি ৩০ টাকা দরে ট্রাক সেলের ঘোষণা দিয়েছিল। বাজারের অস্থিরতা নিয়ে চিন্তিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। রফতানি বন্ধ ঘোষণা করার দিনেই এভাবে দাম বৃদ্ধিকে ব্যবসায়ীদের কারসাজি বলে দুষছেন অনেকে।

বাংলাদেশের বাজারে ভারতের পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা মাত্রই ক্রেতারাও নড়েচড়ে বসতে থাকেন। গত বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে ক্রেতাদের। তাই সময় থাকতে বাজারমুখী হন। গত সোমবার সন্ধ্যা থেকেই ৩ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত পেঁয়াজ কিনতে দেখা যায় অনেককে। আর এই সুযোগে ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়িয়ে দেন ধাপে ধাপে। রাত গড়াতেই ভারতীয় আমদানি করা পেঁয়াজের দাম ঠেকেছে ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকায়। আর দেশি পেঁয়াজ ৯০-১০০ টাকায়। বিক্রেতারা বলেন, সংকটের মধ্যে সবাই যদি বেশি বেশি কেনে তাহলে দাম বাড়াটাই স্বাভাবিক। আর ক্রেতারা বলছেন, এখন পেঁয়াজ না নিলে দাম আরো বাড়িয়ে দেবেন বিক্রেতারা। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর রামপুরা ও মহাখালী কাঁচাবাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।

বর্তমানে এসব বাজারে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০-১০০ টাকা কেজিতে। আর আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজে দাম বেড়েছে কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে আমদানি করা পেঁয়াজ এসব বাজারে বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকা কেজি দরে।

দাম বাড়ার কথা শুনে রামপুরা বাজারে পেঁয়াজ কিনতে এসেছেন হামিদা। পরিবারে তিন সদস্য হলেও তিনি ৮ কেজি পেঁয়াজ কিনেছেন। তিনি বলেন, এর আগে দাম বাড়তে বাড়তে ২০০ পেরিয়ে যায়। এবারও হতে পারে তেমন। মহাখালী বাজার থেকে ৫ কেজি পেঁয়াজ কেনেন পপি। তিনি বলেন, বাসায় কিছুটা রয়েছে। আর এগুলো দিয়ে এখন দুই মাস চলে যাবে। কেন এত পেঁয়াজ একসঙ্গে কিনলেন, এমন প্রশ্ন করতেই হেসে উত্তর তার, যদি দাম বাড়ে তাই কিনছি। এক দিনেই ৩০ টাকা বেড়েছে। সপ্তাহ পার হলে না জানি কত টাকা বাড়ে। এ আশঙ্কা শুধু আমার একা না, দেখছেন না অনেকেই পেঁয়াজ কিনতে বাজারে এসেছেন। গত বছর তো ৩০০ টাকা হয়ে গেছিল।

তবে পেঁয়াজের দাম বাড়ার জন্য ক্রেতাকে দুষছেন বিক্রেতারা। হাফিজুল নামে ব্যবসায়ী বলেন, এবার আমাদের পেঁয়াজ আমদানি চাহিদার তুলনায় কম হয়েছে। আবার খাতুনগঞ্জে জোয়ারের পানিতে পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এর মধ্যে দেশের বাজারে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা ভারতের। আবার ক্রেতারাও হুজুগে বেশি বেশি পেঁয়াজ কিনছেন, বাজারে এর প্রভাব পড়েছে।

তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে বিকল্প তিন পদক্ষেপ নিয়ে এগোচ্ছে মন্ত্রণালয়।

সরকারিভাবে কম দামে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। পাশাপাশি ভারত ছাড়াও বিকল্প বাজারের খোঁজ নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্শি বলেন, ‘আমরা বিকল্প বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করার চেষ্টা করব। গত বছর থেকে আমাদের তো কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে। মিয়ানমার, টার্কি, ইজিপ্ট, চায়না থেকে। বাইরে থেকে আমদানি করা সম্ভব হলে পরিস্থিতি ভালো হবে।’

‘তবে গত বছরের মতো পরিস্থিতি এবার হবে না। কারণ দেশে তো পর্যাপ্ত পেঁয়াজ রয়েছে। হয়তো ৩০/৪০ টাকা হবে না কিন্তু গত বছরের মতো অত দামেও বিক্রি হবে না। আমরা বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিচ্ছি। আশা করছি, অন্যান্য জায়গা থেকে পেঁয়াজ এনে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারব।’

সরকারি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবির) মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই ২৮৫টি পয়েন্টে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছি। সেই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকেও পেঁয়াজ আমদানির যে নিয়মিত প্রক্রিয়া সেটাও অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেওয়ার পর রাজধানীর পাশাপাশি দেশের সব জেলাতে এর প্রভাব পরে। ব্যবসায়ীরা বাড়াতে থাকে পেঁয়াজের দাম। জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টে রয়েছে বিস্তারিত—

সাতক্ষীরা : ভারতীয় পেয়াজ রফতানি বন্ধের খবরে প্রতি কেজি পেঁয়াজের মূল্য বেড়েছে ১৫-২০ টাকা। সাতক্ষীরার বড় বাজারে পেঁয়াজের দাম নেওয়া হচ্ছে ইচ্ছামতো। প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকায় আর দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭৫-৮০ টাকায়। অথচ গতকাল প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজের মূল্য ছিল ৩৮-৪০ টাকা আর দেশি পেঁয়াজের মূল্য ছিল ৫৫-৬০ টাকা। রাতের ব্যবধানে মঙ্গলবার পেঁয়াজের মূল্য বাড়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন ক্রেতারা।

সাতক্ষীরার সুলতানপুর বড় বাজারের খুচরা পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মেসার্স আবির ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী আবদুল আজিজ বাবু। তিনি প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি করছেন ৬০ টাকায়। আর দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করছেন ৮০ টাকায়। তিনি জানান, ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। কিছু করার নেই।

বেনাপোল (যশোর) : ভারতীয় কৃষিপণ্য মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা ‘ন্যাপেড’ গতকাল সোমবার থেকে হঠাৎ করে পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়িয়ে ৭৫০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করায় তার প্রভাব পড়েছে বেনাপোল বন্দরে। আগে প্রতি মেট্রিক টন ৩৫০ মার্কিন ডলারে রফতানি করলেও পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গতকাল সোমবার থেকে প্রতি মেট্রিক টন পেঁয়াজ ৭৫০ মার্কিন ডলারে ব্যবসায়ীদের আমদানি করতে হবে। যদি ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয় তাহলে আগের এলসিগুলো পুনরায় মূল্য বাড়িয়ে (অ্যামানমেন্ড করে) পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে। ভারত থেকে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ থাকায় বেনাপোল বন্দরের বিপরীতে পেট্রাপোল বন্দরে আটকে আছে দেড় শতাধিক পেঁয়াজের ট্রাক ও ৪২টি ওয়াগানযুক্ত তিনটি পেঁয়াজের ট্রেন।

ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হওয়ার পরই দেশি বাজারে এর প্রভাব পড়েছে। গতকাল সোমবার যে ভারতীয় পেঁয়াজ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল সে পেঁয়াজ মঙ্গলবার সকাল থেকে ৬০ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা বলেন, বাজার মনিটরিং না থাকার কারণে দেশে যথেষ্ট পেঁয়াজ মজুত থাকলেও আড়ৎদাররা সিন্ডিকেট করে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছেন।

বেনাপোলের বিপরীতে ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মা সরস্বতি এজেন্সির স্বত্বাধিকারী বাপ্পা মজুমদার জানান, বন্যার কারণে ভারতে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এর আগে পেঁয়াজ রফতানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় ভারতের বাজারে পেঁয়াজের মূল্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন বাজারে পেঁয়াজের মূল্য সহনশীল রাখতেই ভারত সরকারের কৃষিপণ্য মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা ন্যাপেড রফতানি মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট রয়েল এন্টারপ্রাইজের মালিক রফিকুল ইসলাম রয়েল বলেন, ভারত সরকার বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করতেই কৌশল হিসেবে রফতানি মূল্য দ্বিগুণ করেছে। এমন চলতে থাকলে দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়তে থাকবে। আমদানি মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়বে দেশের বাজারে। দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন এলসিতে পেঁয়াজ আমদানি করে ব্যবসায়ীরা লাভ করতে পারবে না বলে জানান তিনি।

হিলি : দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত সরকার। এক দিনের ব্যবধানে হিলি স্থলবন্দরের খুচরা ও পাইকারি বাজারে কেজি প্রতি প্রকারভেদে বেড়েছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। যে পেঁয়াজগুলো গতকাল বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, গতকাল তা বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকা।

পেঁয়াজ কিনতে আসা কয়েকজন ক্রেতা জানান, গতকাল পেঁয়াজ কিনেছে ৩৫ টাকা কেজি দরে। আজ সেই একই পেঁয়াজের দাম চাচ্ছে ৭৫ টাকা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এমনটা বাড়বে কোনো দিন ভাবতেও পারিনি। আমাদের দাবি সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং করার জন্য।

এদিকে হিলি স্থলবন্দরের আমদানি রফতানি গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর রশিদ হারুন জানান, আমরা দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজের এলসি করেছি। ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ২ শতাধিক পেঁয়াজ বোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। সেই পেঁয়াজগুলো যদি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করত তবে পেঁয়াজের দাম এতটা বৃদ্ধি পেত না।

তিনি আরো জানান, হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারকরা এরই মধ্যে পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি করেছে। সেসব পেঁয়াজ বাংলাদেশে এলে ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে আবারও পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক হবে।

আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) : জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে হঠাৎ করে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ উপজেলা প্রশাসনের। এক লাফে দাম কমল অর্ধেকে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে আক্কেলপুর কলেজ বাজারের পৌর হাটে নিত্যপণ্য পেঁয়াজ ৮০ টাকা থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে থাকে ব্যবসায়ীরা। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম হাবিবুল হাসান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজানুর রহমান বিভিন্ন বাজারে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় কলেজ বাজারের ভাই ভাই আড়তে মূল্য তালিকা না থাকায় ৫ হাজার টাকা, ভ্রাম্যমাণ আদালতকে অবমাননার দায়ে এক হোটেল মালিককে ৫০০ টাকা জরিমানা করেছেন। একই সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণে পাইকারি পেঁয়াজ বাজারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য পেঁয়াজ, চিনি, তেলও ডাল বিক্রির উদ্বোধন করেছেন ইউএনও।

পিডিএসও/হেলাল